ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে গভীর রাতে চলন্ত লঞ্চে আগুনের ঘটনায় আরও দুজনের লাশ উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিষখালী নদীর চর ভাটারকান্দা এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক কিশোরের লাশ উদ্ধার করেন কোস্টগার্ড সদস্যরা। এর আগে সকালে লঞ্চঘাট এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় ৩০ থেকে ৩২ বছরের অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে লঞ্চে আগুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যুর তথ্য মিলল।
এদিকে লঞ্চে আগুনের ঘটনায় নিখোঁজ চার যাত্রীর স্বজন মো. মনির হোসেন বাদী হয়ে গত সোমবার রাতে ঝালকাঠি সদর থানায় একটি মামলা করেছেন। এতে আগুন লাগা অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক, চালকসহ ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া লঞ্চটিতে প্রাণহানির ঘটনায় নৌপরিবহন অধিদপ্তরের করা মামলায় আত্মসমর্পণের পর ওই নৌযানের দুই মাস্টারকে গতকাল কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।
অন্যদিকে লঞ্চে আগুনের ঘটনায় নিখোঁজদের স্বজনদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ বরগুনা ও ঝালকাঠিতে চালিয়ে যাচ্ছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা।
লঞ্চে আগুনের ঘটনায় গতকাল উদ্ধার করা দুই মরদেহের মধ্যে কিশোরের পরনে ছিল নীল রঙের জ্যাকেট ও জিনস প্যান্ট। আনুমানিক ১২-১৩ বছর বয়সী ওই কিশোরের মরদেহ গতকাল দুপুর ২টার দিকে ঝালকাঠি লঞ্চঘাটে নিয়ে আসা হয়। আর সকালে লঞ্চঘাট এলাকায় সুগন্ধা নদীর মাঝামাঝি থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা যুবকের মরদেহে ছিল কালো রঙের গেঞ্জি ও কালো প্যান্ট। লাশের মুখমণ্ডল ছিল আগুনে ঝলসানো। দুটি মরদেহই উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এ নিয়ে দুই দিনে সুগন্ধা ও বিষখালী নদী থেকে আগুনে পোড়া লঞ্চটির তিন যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হলো। তিনটি মরদেহেই আগুনে পোড়ার চিহ্ন দেখে তারা অভিযান-১০ লঞ্চের যাত্রী ছিলেন বলে নিশ্চিত হয় উদ্ধারকারীরা।
ঝালকাঠি সদর থানার পরিদর্শক আ. মালেক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুটি লাশ উদ্ধার করে আমরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছি। পাঁচ দিন আগে মৃত্যু হওয়ায় লাশের চেহারা বিকৃত হয়ে গেছে। তার পরও যদি কেউ লাশ শনাক্ত করতে পারে তাহলে ময়নাতদন্তের পর তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’
লঞ্চে আগুনের ঘটনায় গতকাল পঞ্চম দিনের মতো উদ্ধার অভিযান চালিয়েছেন কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া যাত্রীদের খুঁজতে ফায়ার সার্ভিস ও কোস্টগার্ডকর্মীরা গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান চালান।
বিষখালী নদী থেকে উদ্ধার মরদেহের পরিচয় মিলেছে : গত সোমবার বিষখালী নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় পাওয়া গেছে। তার নাম মো. শাকিল (৩২)। তিনি অভিযান-১০ লঞ্চের বাবুর্চি ছিলেন। বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইসদাইর গ্রামে। ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে পাঠানো ছবি দেখে ঝালকাঠিতে এসে শাকিলের পরিবারের সদস্যরা লাশ শনাক্ত করে সোমবার রাতেই নারায়ণগঞ্জে নিয়ে গেছে।
নিখোঁজের স্বজনের মামলা : লঞ্চে আগুনের ঘটনায় ঝালকাঠি সদর থানায় গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নিখোঁজ যাত্রীর স্বজন মো. মনির হোসেন বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলায় অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক, চালকসহ ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদী ঢাকার ডেমরার বাসিন্দা মো. মনির হোসেন পেশায় ইট-বালু ব্যবসায়ী। লঞ্চে আগুনের ঘটনার পর থেকে মনির হোসেনের বোন, ভাগনিসহ চার স্বজন নিখোঁজ।
মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন অভিযান-১০ লঞ্চের মালিক হামজালাল শেখ, লঞ্চে থাকা দুই মাস্টার রিয়াজ সিকদার ও মো. খলিল, দুই চালক মো. মাসুম ও মো. কালাম, তত্ত্বাবধায়ক মো. আনোয়ার, সুকানি মো. আহসান ও কেরানি মো. কামরুল।
মামলার বাদী মনির হোসেন জানান, লঞ্চে আগুনের ঘটনায় তার বোন তাসলিমা আক্তার (৩২), দুই ভাগনি সুমাইয়া আক্তার (১৫) ও সুমনা আক্তার (১০) এবং ৭ বছর বয়সী ভাতিজা জোনায়েদ ইসলাম এখনো নিখোঁজ।
নৌযান আইনে দায়ের করা মামলায় বাদী অভিযোগ করেছেন, গাফিলতির মাধ্যমে তার স্বজনসহ অন্য যাত্রীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আরজিতে তিনি এর বিচার চেয়েছেন।
লঞ্চটির নানা অনিয়মের কথা সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ইতিমধ্যেই উদঘাটন করেছে। অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। লঞ্চের ইঞ্জিন পরিবর্তনের কথা সরকারি দপ্তরে জানানো হয়নি। এ ছাড়া চারজন মাসটার-ড্রাইভারের মধ্যে তিনজনেরই অনুমতি ছিল না।
এর আগে এ ঘটনায় আরও তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে ঢাকার নৌ আদালতে করা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর গত সোমবার লঞ্চটির মালিক হামজালাল শেখকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
ত্রুটি নেই বলে লঞ্চটি ছেড়ে দেওয়ারা কেন আসামি নয় : লঞ্চে অগ্নিকান্ড ও হতাহতের ঘটনায় করা মামলায় দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছে আদালত। গতকাল ঢাকার নৌ আদালতে অভিযান-১০ লঞ্চের ইনচার্জ মাস্টার রিয়াজ সিকদার ও দ্বিতীয় মাস্টার খলিলুর রহমান আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইলে বিচারক জয়নাব বেগম তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালতে আসামিদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটিং অফিসার বেল্লাল হোসাইন। বিআইডব্লিউটিএর যেসব কর্মকর্তা লঞ্চে ত্রুটি নেই বলে যাত্রার অনুমতি দিয়েছিলেন, তাদের কেন আসামি করা হয়নি সে প্রশ্ন শুনানিতে তুলে আসামিপক্ষের আইনজীবী জাহাঙ্গীর হোসেন তাদের জামিনের আরজি জানান। পাল্টা যুক্তিতে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বেল্লাল হোসাইন বলেন, লঞ্চের দায়িত্বরতরা তাদের কর্তব্যকাজে অবহেলা করে ইতিহাসের মর্মান্তিক নৌ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন। আগুন না নিভিয়ে তারা লঞ্চ থেকে সটকে পড়েন। এই দায় তাদের নিতে হবে।
বেল্লাল হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুনানিতে বলেছি, তাদের (আসামি) অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে দেশের ইতিহাসে একটি দুর্ভাগ্যজনক, ন্যক্কারজনক ও কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছে। যেখানে জাহাজ চলছে, সেখানে তারা কীভাবে যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত না করে জাহাজ ত্যাগ করল? তারা শুধু জাহাজ ত্যাগ করেনি। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা তো দূরে থাক এক বালতি পানির ব্যবস্থা তারা করেনি। আসামিপক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেখিয়েছেন যে যারা ওই দিন লঞ্চটি ছাড়ার অনুমতি দিয়েছে, তাদের কেন আসামি করা হয়নি। আমরা বলেছি, প্রাথমিক তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে এই মামলা দিয়েছি। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হবে। সেই তদন্তে যাদের নাম আসবে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’
২৩ মরদেহের পরিচয় শনাক্তে নমুনা সংগ্রহ শুরু : লঞ্চে আগুনের ঘটনায় পরিচয় শনাক্ত না হওয়া ২৩ জনের মরদেহ ইতিমধ্যে দাফন করা হয়েছে। এদের পরিচয় শনাক্ত করতে তাদের স্বজনদের এবং লঞ্চে আগুনের ঘটনায় নিখোঁজের স্বজনদের নমুনা সংগ্রহ করছেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবের সদস্যরা। বরগুনা ও ঝালকাঠিতে নমুনা সংগ্রহ করছে সিআইডির আলাদা দুটি দল। এর মধ্যে বরগুনায় নমুনা সংগ্রহের প্রথম দিন গত সোমবার ১৪ জনের স্বজনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এরপর গতকাল নতুন করে আরও ৩২ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নিখোঁজ সব স্বজনের নমুনা সংগ্রহ না করা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন সিআইডির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকা ডিএনএ ফরেনসিক ল্যাবের পরীক্ষক রবিউল ইসলাম।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতিরিক্ত আইজিপি মাহবুবুর রহমান স্যারের নির্দেশে এবং সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার রুমানা আক্তারের পরামর্শে আমরা নমুনা সংগ্রহ করতে এসেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত স্বজনরা উপস্থিত থাকবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হবে।’
গতকাল ঝালকাঠিতেও লঞ্চে আগুনের ঘটনায় নিখোঁজদের দুই স্বজনের নমুনা সংগ্রহ করেন সিআইডি সদস্যরা।
২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার সদরঘাট থেকে বরগুনার উদ্দেশে ছেড়ে যায় এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটি। রাত ৩টার দিকে ঝালকাঠির পোনাবালিয়া ইউনিয়নের দেউরী এলাকার সুগন্ধা নদী অতিক্রম করার সময় লঞ্চটিতে আগুন ধরে যায়। যাত্রীদের বেশিরভাগ তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। একপর্যায়ে মাঝনদীতে থাকা লঞ্চটির প্রায় পুরো অংশে আগুন জ্বলতে থাকে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। আগুনে দ্বগ্ধ হয়েছেন অন্তত ৮০ জন। এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
