একুশের পর বাইশ

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৩৮ পিএম

দুই হাজার বিশ-এর মতো একুশও করোনার বদনাম নিয়ে বিদায় নেবে আজ। কাল হবে বাইশের অভিষেক। সুস্বাগতম ২০২২। সবাই জানে করোনার কারণে অসম্ভব ঘটনাবহুল ছিল বিশ সাল। একুশ এসেছিল তারই ধারাবাহিকতায়, তিনশত পঁয়ষট্টি দিনের পর, আট হাজার সাতশত ঘণ্টার ঘনঘটা সাঙ্গ করে সে প্রস্থান করছে, আগামীকালই বাইশ এসে পাতবে সংসার। কিন্তু এই যে নিত্য চলে যাওয়া-আসা, দেখার বিষয় রেখেই যাওয়া যে কালের কপোলতলে কী রেখে গেল বা যাবে এইসব পঞ্জিকাবর্ষ প্রবরেরা? সমাজ সংসার দেশ ও দুনিয়ার অভিজ্ঞতার ভান্ডারে কী জমবে বা কেমন দাঁড়াবে তার যোগ-বিয়োগের জমা খরচের জের?

পৃথিবীর প্রায় তাবৎ দেশের মতো ২০২০ ও ২০২১ সাল বাংলাদেশেও অবশ্যই ছিল ঘটনাবহুল। এ বছর দুটিতে মানবিক বিপর্যয়, মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ভান্ডারে অনেক বিস্ময়, বৈপরীত্য ও বিতর্ক তুলনামূলকভাবে যেন বেশিই ঘটেছে, জমেছে। মার্কিন মুলুকে মাতবরের পরিবর্তন, বাংলাদেশে বুলবুল-আম্ফান-আয়াসদের আস্ফালন, বড় বন্যা, মিয়ানমারে মানবিক বিপর্যয়ে আপতিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থান ও ভাষানচরে স্থানান্তর, প্রতিবেশী দুই বড় ভাইয়ের ঠান্ডা যুদ্ধের মহড়া, উত্তপ্ত হওয়া, এসব নিয়ে বিশ-একুশ সাল ছিল নানান অঘটনঘটনপটিয়সী। বিশ ও একুশেতে অনেক মৃত্যু আমজনতার সঙ্গে, বর্ষীয়ান নেতা-রাজনীতিক, শিল্পপতি, আইনজ্ঞ, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, প্রজ্ঞাবান প্রকৌশলী, লেখক, শিল্পী, অভিনেতা, কলাকুশলী কে না ছিলেন মৃত্যুর মিছিলে!

২০২১-এও প্রতিষ্ঠিত অনেক সত্য, সার্বিক সুন্দর ও স্বাভাবিকের বাইরে ঘটেছে অনেক কিছুই। ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অব্যাহত অভিযাত্রা যেমন ছিল, অর্থনীতি ও রাজনীতিও তেমন প্রত্যক্ষ করেছে পটপরিবর্তনের নানান আকার ইঙ্গিত। দেশে বিদেশে সংক্ষুব্ধ উত্তাল উদ্দামের উন্মীলন সহসা স্তিমিত হয়েছে, সম্পূর্ণ বিপরীত বলয়ে চলে গিয়েছে যেমন বড় ঝড়ের পরে নেতিয়ে পড়ে প্রকৃতি। সে কি ক্লান্ত হয়ে, শ্রান্ত হয়ে না কোন সে জাদুবলে? নিশ্চয়ই না। তবে সেটি কি বৃহত্তর ব্যর্থতার মরা কাটালে বন্দি না অন্য কিছু। হয়তোবা সেটি একটি দূরবর্তী মন্দার আভাস দিয়ে, নিম্নচাপের আগে তাপমাত্রায় যেমন ঘটে অস্থিরমতিত্বের প্রভাব কিংবা ভালোভাবে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা উদগিরণের মতো নবউদ্যমের সর্বনাশের সংগঠনের প্রেরণা।

২০২২-এর জন্য ২০২১ বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে এই সত্যের ও তত্ত্বের জানান দিয়ে গিয়েছে যে অর্থনীতি রাজনীতিকে এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন বা অবলম্বনের বাস্তবতা তথাকথিত আবেগকে টপকিয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে। অন্যের গোষ্ঠীগত স্বার্থ উদ্ধারের সঙ্গে সবসময় থাকতে এখন দ্বিধান্বিত আমজনতা। যে আমজনতার কল্যাণের কথা বলে বারবার তাদের মাড়িয়ে সিঁড়ি ভাঙা হয়েছে এখন সে প্রবোধ ও উৎসাহে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। সুদূর ইতিহাসের আবেগ ও চেতনা বর্তমানের মহামারীমন্ডিত বিড়ম্বনাময় সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন সংগ্রামে মন্ত্র তন্ত্র হিসেবে যান্ত্রিক জীবনে যে আবেগ সৃষ্টি করতে চেয়েছে, নানান খিস্তি খেউড়ে তা অপাঙ্ক্তেয় নিস্পৃহভাবের বলয়ে চলে গিয়েছে, সে সব বিব্রতকর ব্যস্তসমস্ত জীবন ও তার কর্মপ্রক্রিয়ার প্রহরে। বিস্ময়ের পর বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটেছে ব্যক্তি পরিবার ও সমাজে। অন্তত শতাধিক সাজানো বা বানানো ঘটনা এসেছে আকস্মিকতায় বিব্রতকর পরিস্থিতিকে ধামাচাপা দিতে। সংবছরে জাতীয় দৈনিকে লাল অক্ষরের যত শিরোনাম হয়েছে সেগুলোর পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে অবারিত অশান্তি, করোনার কারণে করুণ প্রস্থান, বড় দাগের দুর্নীতি, অর্থপাচার, খেলাপি ঋণ, অর্থ আত্মসাৎ অপব্যয় অপচয়ে তহবিল তছরুপের অন্তর্ঘাতে রয়েছে অর্থনীতি। ফুরসত মেলার পথ পেয়েও যেন  পায়নি পুরনো ঘটনায় মনোনিবেশের।

ব্যষ্টি ও সমষ্টির প্রতি বিশ্বাস ও আস্থায় ফাটল ধরেছে বিশ-একুশেতে সবচেয়ে বেশি, শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশে^র ছোট-বড় বহু দেশে। অর্থনীতিতে এমন সব বিস্ময়কর উত্থান-পতন প্রত্যক্ষ করেছে সবাই যা প্রথাগত, প্রতিষ্ঠানগত, প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনের বাইরে ঘটেছে। নানান পথ পদ্ধতিতে অর্থের চোরাচালান বেড়েছে। বিদেশে পুঁজির উড়াল ঘটেছে এবারে বেশি। দেশে দক্ষ জনবলের সংকট দেখিয়ে বিদেশি বুদ্ধিদাতার কর্মসংস্থান অব্যাহত রয়েছে, বিদেশ প্রত্যাগতদের ভারে আরও কাহিল হতে চলেছে বেশি বেকারের ভারে ন্যুব্জ এই অর্থনীতিতে। ব্যক্তি খাতে সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ বাড়তির পথে তো নয়ই বরং সনাতন সামর্থ্য  ও ধ্রুপদ পুঁজির অস্তিত্ব রক্ষার ধারণা হোঁচট খেয়েছে বারবার। বারবার চাঙ্গা হতে চেয়েছে, হতে পারেনি পুরোপুরি পুঁজিবাজার, যদিও ঘাপটি মেরে বসেছিল প্রথাগত ষড়যন্ত্র।

বিদায়ী বছরে মানিটারি পলিসিগুলো সুশীল শব্দের সৌকর্যে ঐশ্বর্যে ভরপুর থাকলেও বাস্তবায়নতায় সেখানে যেন ‘কেউ কথা রাখেনি’। নিজস্ব নিয়মে যে যা পেরেছে সামাল দিতে চেষ্টা করেছে ঘাটতির, তারল্য সংকোচনের। আবার সেই অস্বাভাবিক অবস্থাকে স্বাভাবিকের তকমা পরিয়ে সাফল্য হিসেবে দেখার ভান করেছে অনেকে। স্বাস্থ্য খাতের দৈন্য দশা ও দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পড়াশুনার পাট চুকে গেছে শত সহস্র শিক্ষার্থীর। বিস্মিত হয়েছে সবাই। পাবলিক মানি মোটা দাগে উৎপাদন-অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ ও ব্যয়ে অব্যাহত থাকার বছর ছিল ২০২১।

যে প্রেক্ষাপটে এসেছে বাইশ, তাতে কেমন ধারা সূচিত হবে দেশ সমাজ ও অর্থনীতিতে? কাছের ও দূরের দিনগুলোর দিকে তাকাতেই হয়। ব্যাংকের তারল্যে ও তদউৎসারিত সংকট একদিকে ঋণপ্রবাহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে যেমন অপরদিকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের বলয়ে বন্দি হয়েছে অতি অলস তারল্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অস্বাভাবিক স্ফীতি যেমন অর্থনীতির রক্তে শর্করা বৃদ্ধির আলামত হিসেবে থাকছে, অর্থনৈতিক স্থবিরতায় এই অর্থের প্রায়োগিক প্রতিদান বা প্রতিফল বিপরীত কোনো অভিঘাত সৃষ্টি করছে কি না তা দেখার বিষয় থেকে যাচ্ছে। চাল রপ্তানি বছরেই বেড়েছিল, বছর শেষে চাল আমদানিও। সেই চালের হিসাব তামিল করা হয়েছে কি না, চালের সম্মানজনক প্রবেশ ঘটেছে কি না তা দেখভালের অবকাশ অনুভূত হয়। ক্যাপিটাল মেশিনারির আমদানির সঙ্গে উৎপাদনশীলতা এবং উৎপাদন উৎপ্রেক্ষার মেলবন্ধন ঘটার আবশ্যকতা অনিবার্য। এভাবে সেভাবে পুঁজি পাচারের দুর্ভাবনা নতুন বছরের মাথাব্যথা হিসেবে বিদ্যমান থাকবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য যা সহজাত, অ-আমদানিজাত তার উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, মূল্য সহনীয় রয়েছে এবং অব্যাহত থাকবে যদি প্রকৃতি সদয় থাকে এবং ওমিক্রন বাড়াভাতে ছাই না দেয়। স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য দ্রব্যমূল্যের ঘোড়াকে পোষ মানাতে পারবে, কিন্তু আমদানিনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে দর ও দাম পড়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে তার দাম কমার নাম যদি না থাকে তাহলে এটি এক ধরনের অ্যালার্জি হিসেবে গাত্রদাহের কারণ হবে। তেল বা জ্বালানি খাতের এমন কিছু উপাদান উৎপাদনে এবং তার সামষ্টিক ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করবে সামষ্টিক উৎপাদনশীলতা ও ব্যক্তি বিনিয়োগের আগ্রহ সামর্থ্য ইত্যাদি। এটি ধরে রাখতে না পারলে বেপথে চলে যাবে মহার্ঘ্য বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয়ে আমদানি করা সামগ্রী অন্যের সংসারে। ফিসক্যাল পলিসি কাগজ কলমে নয় বাস্তবে তার সদয় উপস্থিতি আবশ্যক হবে, অনিবার্য হবে তার সঠিক প্রয়োগ।

একুশ সাল ছিল ‘এসডিজি’ বাস্তবায়নের ষষ্ঠ বছর। করোনায় লন্ডভন্ড হয়ে গেছে বাস্তবায়ন ম্যাট্রিক্সের ম্যাপ। মিলেনিয়ামের দশটি গোলের বেশ কয়েকটি সামাজিক খাতে আমাদের অগ্রগতি ছিল সন্তোষজনক। তবে এটি একক কোনো সময় বা সরকারের কৃতিত্ব নয়, এ কৃতিত্ব আমজনতার। কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বৈষম্য দূরীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, বিকেন্দ্রীকরণগত সূচক বা শর্তগুলোতে বাংলাদেশের অগ্রগতি যৎসামান্য। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পরিবেশ সৃজনে, সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনো আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা পেরুতে হবে। আত্মতৃপ্তির ধোঁয়াশে পরিবেশে যেন অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহের প্রতি যত্নবান হওয়ার আগ্রহ তলিয়ে না যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে এই আশায় এ খাতে ভর্তুকির নামে অব্যাহত অপচয় অপ্রতিরোধ্য হতে পারে, গজিয়ে ওঠা বিশেষ শিল্প-পরিবারের কাছে এ খাত  জিম্মি হতে অনিচ্ছুক অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে পারে।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি নতুন বলয়ে প্রবেশ করছে। পূর্ব দিকে তাকানোর নীতি ‘তাকানো’ ও ‘দেখার’ মধ্যকার দূরত্ব ঘোচাতে না পারলে কিংবা ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ জাতীয় দোটানায় বুঁদ হয়ে থাকলে সৃজিত ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ সহযোগিতা সহায়তার সংসারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। বিদেশি বিনিয়োগ নানান কলাকৌশলে যাতে এদেশের বাজারকে কুক্ষিগত ও ক্ষতিগ্রস্ত করার পথে না থাকে সে ব্যাপারে নিজেদের মনোভঙ্গিকে অবশ্যই সতেজ ও সজীব হওয়ার অবকাশ থাকবে। আত্মস্বার্থ দেখার চেতনা শাণিত ও জাগ্রত থাকার আবশ্যকতা আরও বৃদ্ধি পাবে দেশীয় অর্থনীতি ও উন্নয়নের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রশ্নে।

শুধু বিশ-একুশেতে কেন সেই ষোল-সতেরো থেকেই তো রাজস্ব আহরণে নিম্নগতি টান টান উত্তেজনা সমালোচনা শুরু হয়েছে অনেক যৌক্তিক কারণে। উদ্যোগ উদ্যমের কাটতি ঘাটতি না থাকলেও কাক্সিক্ষত বাঞ্ছিত পর্বে নিয়ে যেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নানান উপায়ে রাজস্ব ফাঁকি, এড়িয়ে চলা, অদক্ষতা অপারগতাকে দোষারোপ অব্যাহত ছিল এবং আছে। ভ্যাট আইন প্রবর্তন নিয়ে যত বাক্যব্যয় ঘটেছে তাতে অর্থনীতিতে ভ্যালু এডিশন হয়নি তেমন কিছুই। এখনো চলছে এ প্রয়াসের অগ্নিপরীক্ষা। পরস্পর প্রযুক্ত অর্থনৈতিক জীবনযাত্রাকে নির্মল নিষ্কলুষ ও নিরপেক্ষকরণের প্রয়াস চলছে। কিন্তু কোথায় যেন বিশেষ প্রত্যয়ের অভাব অনুভব হওয়ার সুবাদে সব ঘাটে, সব মাঠে ও প্রান্তরে ‘কারও বলার কিছু ছিল না’ প্রকৃতির ব্যর্থতার সংগীত শুনতে হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আহরণে যেখানে দৃঢ় প্রত্যয়, সুচিন্তিত পদক্ষেপ এবং নেতৃত্ব প্রত্যাশিত সেখানে চোখ কান বন্ধ রাখার সন্ধ্যা সংগীত যেন বাজানো না হয় সময়ের সেতারে। প্রশাসন ও প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে সপ্রতিভ স্বদায়িত্বশীল হওয়ার প্রভাব সংগীত ভিন্ন সুরে ধ্বনিত হচ্ছে। বাইশেতে রাজস্ব আহরণ কর্মপ্রক্রিয়া ও অভীপ্সা অধিকতর অন্তর্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ বাড়বে।

লেখক সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান

[email protected]   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত