হতাশা নিয়েই শেষ হলো চলচ্চিত্রের ২০২১

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৭:৫৭ পিএম

২০২০ সালের শুরুতেই করোনা আঘাত হানে সারা বিশ্বে। ফলে সবকিছুর মতো স্থবির হয়ে পড়েছিল সিনে ইন্ডাস্ট্রিও। ফলে সে বছর মাত্র ২০টির মতো সিনেমা মুক্তি পেয়েছিল। সবাই ভেবেছিল ২০২১ সালে সবকিছু আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু আশায় গুঁড়েবালি। অনেকটা হতাশা নিয়েই শেষ হলো সিনে অঙ্গনের ২০২১ সাল।

২০২১ সালের প্রথম শুক্রবার ১ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছিল রবিউল ইসলাম রাজ পরিচালিত ‘কেন সন্ত্রাসী’। দাদা ফিল্মস প্রযোজিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন স্বাধীন শাহ, মেহরিমা, নাহিদ পারভেজ। এরপর পুরো মাস জুড়ে কোনো নতুন ছবি মুক্তি পায়নি। পরের মাস অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় কমল সরকার পরিচালিত ছবি ‘রংবাজি’। প্রিন্স মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন ইউসুফ, ববি, বিন্দিয়া ও অমিত হাসান। এরপর দুসপ্তাহের বিরতি দিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি সিনেমা হলে মুক্তি পায় ‘পাগলের মতো ভালোবাসি’। আতিকুর রহমান লাভলু পরিচালিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অধরা খান, সুমিত সেনগুপ্ত। প্রযোজনায় ছিল সিক্স ডি প্রোডাকশন। আবারও দুসপ্তাহের বিরতি। ১২ মার্চ মুক্তি পায় ‘তুমি আছো তুমি নেই’। দীঘি ও আসিফ ইমরোজ অভিনীত ছবিটি এ বছরের সবচেয়ে সমালোচিত ছবি। দেলোয়ার জাহান ঝন্টু পরিচালিত ছবিটি প্রযোজনা করেছিল এসকে ইন্টারন্যাশনাল।

এর পরের সপ্তাহ মুক্তি পায় দুটি ছবি—গন্তব্য ও অলাতচক্র। মো. পলাশ পরিচালিত ‘গন্তব্য-এ অভিনয় করেছিলেন আইরিন ও ফেরদৌস। প্রযোজনা করেছিল আনোয়ার আজাদ ফিল্মস। মিজ আমি প্রোডাকশন প্রযোজিত ‘অলাতচক্র’-এ অভিনয় করেন জয়া আহসান ও আহমেদ রুবেল। পরিচালনা করেছিলেন হাবিবুর রহমান।

২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে মুক্তি পায় তৌকির আহমেদের ‘স্ফুলিঙ্গ’ এবং শাহরিয়ার নাজিম জয়ের ‘প্রিয় কমলা’। নক্ষত্র চলচ্চিত্র প্রযোজিত ‘স্ফুলিঙ্গ’-এর প্রধান চরিত্রে ছিলেন পরীমণি ও শ্যামল মাওলা। অন্যদিকে মুমী ফিল্ম ইয়ার্ড প্রযোজিত ‘প্রিয় কমলা’র প্রধান চরিত্রে ছিলেন অপু বিশ্বাস ও বাপ্পী চৌধুরী।

এপ্রিলের প্রথম শুক্রবার মুক্তি পায় মো. সেলিম খান পরিচালিত ‘টুঙ্গিপাড়ার মিয়া ভাই’। স্টোরি ফ্ল্যাশ পরিচালিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন শান্ত খান ও দীঘি। একই দিন মুক্তি পেয়েছিল নার্গিস আক্তারের সরকারি অনুদানের ‘যৈবতী কন্যার মন’। ফেমকম বাংলাদেশের প্রযোজনায় ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন গাজী আবদুল নূর, সায়ন্তী দত্ত ও ছন্দা। এরপরই সারাদেশে করোনার প্রকোপ শুরু হয়। এর মধ্যেই ১৪ মে মুক্তি পায় ডিপজলের প্রতিষ্ঠান অমি বনি কথাচিত্রের ‘সৌভাগ্য’। এফ আই মানিক পরিচালিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন ডিপজল ও মৌসুমী। এ বছর রোজার ঈদে মুক্তি পায় নামমাত্র একটি ছবি— নারীর শক্তি। বিএইচ নিশান পরিচালিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মিমি ও আশিক চৌধুরী।

শাকিব খান ও মাহি অভিনীত ‘নবাব এলএলবি’ ছবিটি ২০২০ সালে প্রথম মুক্তি পেয়েছিল ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। এ ছবির জন্য পরিচালক অনন্য মামুনকে জেলে যেতেও হয়েছিল। সেলিব্রেটি প্রোডাকশন প্রযোজিত আলোচিত সমালোচিত ছবিটি সিনেমা হলে মুক্তি পায় ২৫ জুন।

দুই মাস সিনেমা হল ফাঁকা থাকার পর ২০ আগস্ট মুক্তি পায় মো. সেলিম খান পরিচালিত ‘আগস্ট ১৯৭৫’। শাপলা মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল প্রযোজিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন তৌকির আহমেদ, নাবিলা, ফজলুর রহমান বাবু। এরপর দেড় মাসের বিরতি নিয়ে ১ অক্টোবর মুক্তি পায় আসিফ ইকবাল জুয়েলের ‘চোখ’। নিপা এন্টারটেইনমেন্টের প্রযোজনায় ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন বুবলী, রোশান ও নীরব। পরের সপ্তাহে মুক্তি পায় রাশিদ পলাশের ‘পদ্মাপুরাণ’। পূণ্য ফিল্মসের প্রযোজনায় ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন প্রসূন আজাদ, সাদিয়া মাহি ও সুমিত। এর পরের সপ্তাহ থেকে দীর্ঘ দেড় বছরের অচলাবস্থার কিছুটা উন্নতি হতে শুরু করে। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো ছবি মুক্তি পায়।

১৫ অক্টোবর মুক্তি পায় সরকারি অনুদানের ছবি ‘চন্দ্রাবতী কথা’। এন রাশেদ চৌধুরীর পরিচালনায় ছবির প্রযোজক ছিল ম্যানগ্রোভ পিকচার্স। অভিনয় করেছিলেন নওশাবা, দিলরুবা দোয়েল ও গাজী রাকায়েত। একই দিন মুক্তি পায় আমদানীকৃত ভারতীয় বাংলা ছবি ‘বাজী’। তিতাস কথাচিত্র আমদানিকৃত ছবিটির পরিচালক অংশুমান। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিৎ ও মিমি চক্রবর্তী। প্রসূন রহমানের পরিচালনায় ‘ঢাকা ড্রিম’ মুক্তি পায় ২২ অক্টোবর। ইমোশন ক্রিয়েটরের প্রযোজনায় ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন ফজলুর রহমান বাবু, পূর্ণিমা বৃষ্টি, শাহাদাৎ হোসেন।

৫ নভেম্বর মুক্তি পায় অমি বনি কথাচিত্র প্রযোজিত ‘এ দেশ তোমার আমার’। কয়েক বছর সেন্সরসহ নানা জটিলতায় আটকে থাকার পর এফ আই মানিক পরিচালিত ছবিটি মুক্তি পায়। এর প্রধান চরিত্রে ছিলেন প্রয়াত দিতি, সোহেল রানা, রোমানা, ডিপজল।

এদিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বের মর্যাদাপূর্ণ ‘কান চলচ্চিত্র উৎসব’-এর অফিসিয়াল সিলেকশনে অংশ নেয় আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’। আজমেরি হক বাঁধন অভিনীত ছবিটি দেশের দর্শকরা দেখতে পায় ১২ নভেম্বর। এটির প্রযোজনায় ছিল মেট্রো ভিডিও। মো. আবুল কাশেম পরিচালিত ‘হৃদয়ের আঙ্গিনায়’ মুক্তি পায় ১৯ নভেম্বর। গঙ্গা মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন তানভির ও জান্নাত। প্রযোজক সমিতির ছবি মুক্তির তালিকায় না থাকলে ২৬ নভেম্বর মুক্তি পেয়েছিল রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের ‘নোনাজলের কাব্য’ ছবিটি। এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিতাস জিয়া ও তাসনুভা তামান্না। প্রযোজক ছিলো মাই পিক্সেল স্টোরি।

আলোচিত কপ ক্রিয়েশনের ‘মিশন এক্সট্রিম’ মুক্তি পায় ৩ ডিসেম্বর। ছবিটি পরিচালনা করেছিলেন সানী সানোয়ার ও ফয়সাল আহমেদ। অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ, ঐশী ও তাসকিন। প্রয়াত নির্মাতা সাইদুর রহমান টুটুলের শেষ ছবি ‘কালবেলা’ মুক্তি পায় ১০ ডিসেম্বর। আকার প্রযোজিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন তাহমিনা অথৈ ও শিশির। একই সপ্তাহে মুক্তি পায় নুরুল আলম আতিক পরিচালিত সরকারি অনুদানের ‘লাল মোরগের ঝুঁটি। পান্ডুলিপি কারখানা প্রযোজিত ছবিটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন আহমেদ রুবেল, আশনা হাবিব ভাবনা, জ্যোতিকা জ্যোতি, দোয়েল। মধ্যখানে এক শুক্রবার বাদ দিয়ে ২৪ ডিসেম্বর মুক্তি পায় রনি ভৌমিক পরিচালিত ‘মৃধা বনাম মৃধা’। টোস্টার প্রোডাকশন প্রযোজিত ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন সিয়াম আহমেদ, তারিক আনাম খান ও নোভা ফিরোজ।

বছর শেষ দিন মুক্তি পেয়েছে দুটি ছবি— ‘রাত জাগা ফুল’ ও ‘চিরঞ্জীব মুজিব’। অভিনেতা মীর সাব্বির পরিচালিত সরকারি অনুদানের ছবিটির প্রধান চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। এছাড়া ফজলুর রহমান বাবু, ঐশী। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী অবলম্বনে নজরুল ইসলাম পরিচালনা করেছেন ‘চিরঞ্জীব মুজিব’। এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন এস এম মহসীন, নরেশ ভুঁইয়া, একে আজাদ পাভেল, শতাব্দী ওয়াদুদ, মানস বন্দ্যোপাধ্যায়, আরমান পারভেজ মুরাদ, কায়েস চৌধুরী।

প্রায় ৩০টি সিনেমা মুক্তি পেলেও খুব একটা ব্যবসা করতে পারেনি কোনো ছবিই। হল মালিক সমিতির তথ্যমতে, বেশিরভাগ ছবিতেই লস গুনেছেন প্রযোজকেরা। এমনকি কিছু কিছু সিনেমা আছে যেগুলো সপ্তাহের মাঝামাঝিতেই হল থেকে নামিয়ে দিতে হয়েছে। এ বিষয়ে হল মালিক সমিতির উপদেষ্টা মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, ‘এ বছর আমাদের সিনেমা ঘুরে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলাম-সেটা পূরণ হয়নি। ভাল কনটেন্টের অভাবে হল মালিকরা তেমন ব্যবসা করতে পারেননি। হাতে গোনা কয়েকটা সিনেমা আলোচনার জন্ম দিলেও তেমন ব্যবসা করতে পারেনি। এখন আগামী বছরের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত