(মঙ্গলবার প্রথম কিস্তির পর)
প্রফেসর সত্যেন বসুর পিএইচডি ডিগ্রি ছিল না কিন্তু তার অধীনস্ত শিক্ষকদের অনেকেই পিএইচডি ডিগ্রিধারীএস আর খাস্তগীর, কেদারেশ্বর ব্যানার্জী, শচীন মিত্র, সূর্য মুখার্জি। ফেরদৌস খান তার চেয়ে তিন বছরের সিনিয়র একজন গবেষক ছাত্রকে এ নিয়ে বলতেই তিনি জানিয়ে দিলেন সত্যেন বসুর পিএইচডি-র জন্য কোনো মোহ নেই, তিনি জ্ঞানতাপস। তার তত্ত্বাবধানে অনেক ছাত্র গবেষণা করেছেন পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন, এমনকি রসায়নেও দুজন পিএইচডি পেয়েছেন। সত্যেন বসুর ছাত্র মোহাম্মদ ফেরদাউস খান (পরবর্তী সময়ে ডিপিআই) তার জীবনস্মৃতি জীবনের ঘাটে ঘাটে -তে লিখেছেন : ‘কলকাতা থাকতেই সত্যেন বসুর সুখ্যাতি শুনেছিলাম, এবার চোখে দেখলাম। মধ্যম ধরনের দৈহিক গড়ন, গায়ের রং শ্যামলা তবে মাথার চুল অনেকটা সাদা আর চেহারায় অসাধারণ দীপ্তি, কিন্তু সর্বাপেক্ষা দর্শনীয় ছিল তার চোখ দুটো। গভীর দৃষ্টি দিয়ে তিনি সব কিছু তলিয়ে দেখেছেন।... আমি ভেবেছিলাম এই প্রতিভাধর ব্যক্তিটি বেশ গুরুগম্ভীর ও কড়া মেজাজেরই হবেন এবং তার সান্নিধ্য লাভ সুকঠিন হবে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমার ধারণা পাল্টে গেল। টের পেলাম তিনি সহজেই আমাকে তার কাছে টেনে নিয়েছেন। বুঝলাম শিশুর মতো কোমল সংবেদনশীল দরদী তার মন।... আমি তাকে ভালোবেসে ফেললাম।’
১৯৩৪ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে উচ্চমাধ্যমিক ডিঙিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক ও বিজ্ঞানী জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের কথায় পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন বীরেন্দ্র কুমার সাহা। ভর্তির ইন্টারভিউয়ের সময় ডক্টর জ্ঞান ঘোষকে দেখেছেন কিন্তু পদার্থ বিজ্ঞানের সত্যেন্দ্রনাথ বসুর যে দেখা পাননি। ‘বসু সংখ্যায়নের উদ্ভাবকের নামে তখন আমাদের কাছে জাদু খেলে। তাকে দেখবার প্রবল আগ্রহে কার্জন হলের অফিসের এদিকে সেদিকে দাঁড়িয়ে থেকেছি। পরে দেখেছি ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত এই মহান পুরুষ হাতে একটা সিগারেটের টিন, ধীর পদক্ষেপে কার্জন হলের অফিসঘরে আসছেন।’ এই বিজ্ঞানীকে প্রথম দর্শনেই তার বড় ভালো লেগেছিল ‘তার চেহারায় এমনই একটি স্নিগ্ধ মাধুর্যম-িত লালিত্য ছিল যা সবাইকেই অতি সহজে আকৃষ্ট করত... আত্মলোকে বিভোর হয়ে পদার্থ বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বসমূহ তিনি কত সহজভাবে আমাদের অতি সীমিত বিদ্যার গ-িতে এসে তুলে ধরতেন। সাময়িকভাবে আমরা ছাত্র ও শিক্ষক একমন একাত্মা হয়ে যেতাম।’
১৯২৮ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষক অমলেন্দু বসুর জগন্নাথ হলের একটি বসন্ত উৎসবের বর্ণনা : চেয়ার বেঞ্চ সরিয়ে হল ঘরে ফরাশ পাতা হয়েছে। ‘বুদ্ধদেব পরিমল, সুধাংশু এবং আমি একেবারে পেছনের সরিতে দরজার অতি নিকটে বসেছি, উদ্দেশ্য নির্বিঘেœ ধূম্রপান করা। ধোঁয়া যখন বেশ উড়ছে অকস্মাৎ পেছন থেকে কে যেন বললেন, ওহে আমাকে একটা সিগারেট দাও তো! তাকিয়ে দেখি সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সেই শিবতুল্য শিশুতুল্য মনীষী আমাদের সঙ্গে সৌহার্য্য ও সমত্ব দাবি করে আমাদের ধূম্রপান সংস্কার দূর করলেন।’
প্রথমনাথ সেনগুপ্তকে রসায়নের জ্ঞান চন্দ্র ঘোষের কাছ থেকে অনেকটা টেনে নিজের বিভাগে পদার্থ বিজ্ঞানের অনার্সে নিয়ে নিলেন সত্যেন বসু।
প্রথমনাথ লিখেছেন : ‘প্রফেসর বোস ছিলেন জ্ঞানতপস্বী, আত্মভোলা, মানবদরদী এক বিরাট পুরুষ। তিনি পৃথিবীর প্রথম সারির একজন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, তার অন্তরে যে মানুষটি বিরাজ করত তা ছিল তার চেয়েও বৃহত্তর।...তিনি ছিলেন সকলের পরমাত্মীয় ও পরম বন্ধু। প্রতিভা ও মনুষ্যত্বের এত অপরূপ সংযোগ জগতে বিরল, তাই তার গুণমুগ্ধ অনুরাগীর সংখ্যা ছিল অগণিত।’
সত্যেন্দ্রনাথ বসু তার তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য লিখে রেখে গেছেন :
মানুষ আজ যুগসন্ধির সংকটস্থানে পৌঁছেছে। পুরান দর্শন বিজ্ঞান বা নীতি আজ মানুষের সকল সংশয়ের সদুত্তর দিতে সমর্থ নয়। এই বৎসরের ইউরোপীয় মহাযুদ্ধ যেন মনোরাজ্যের সংশয় ও দ্বন্দ্বের প্রতীক মাত্র। মানুষ আদর্শবাদী হতে পারলেই বাঁচে, কিন্তু এখনো আদর্শকে সে পূজার বেদিতে বসাতে পারছে না। সব রংস-এরই মোহ ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ। এখন মানব জাতি তাই প্রত্যেক দেশের উদীয়মান তরুণদের মুখ চেয়ে আছে। এই সংকট থেকে উদ্ধার হতে তারাই একমাত্র ভরসা। শুধু তারা প্রচারযন্ত্র বা ধূর্ততার বুলির সম্মোহনে যেন নিজেদের চিন্তাশক্তি না হারিয়ে বসে। আজ প্রত্যেক আদি সত্যটিও নতুন করে যাচাই করে নেবার দিন।
জ্ঞানের রহস্যপুরীর রহস্যপুরুষ
সত্যেন বসু ছিলেন ‘জ্ঞানের রহস্যপুরীর রহস্যপুরুষ’। ১৯৪২ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ ক্লাসের ছাত্র সরদার ফজলুল করিম তাকে এভাবেই দেখেছেন। তিনি লিখেছেন :
হয়তো তখন বয়স ছিল তার চল্লিশের কোঠায়। কিন্তু পাতলা রেশমের মতো চুল কয়টি তখনই একেবারে সাদা হয়ে গিয়েছিল। চোখে পুরু কাচের চশমা। এই লোকটিকে আমরা সচরাচর দেখতে পেতাম না। তিনি রাস্তাঘাটে হাঁটতেন না। এই দুই রাস্তার যোগকেন্দ্রে তার বাসা হলেও তিনি সে বাড়িতে অল্পই থাকতেন। কার্জন হলের মূল দালানের পশ্চিম দিকে সিঁড়ির পশ্চিম পাশের ঘরটিতে তার ল্যাবরেটরি ছিল। সে ল্যাবরেটরিতে দিনরাত আলো জ¦লত। আমরা জানতাম এটা বোসের ল্যাবরেটরি। কতদিন সন্ধ্যায় গভীর রাতে কার্জন হলের ভেতরের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে আমরা কাচের শার্সি দিয়ে উঁকি দিয়েছি ল্যাবরেটরির ভেতরে বিজ্ঞানের এই রহস্যপুরুষকে দেখতে।’
অধ্যাপক শামসুল হক (পরবর্তী সময়ে ভাইন্স চ্যান্সেলর) তিনজন শিক্ষকের ছাত্র হিসেবে নিজেকে ভাগ্যবান বিবেচনা করেছেন: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশান্ত মহলানবিশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যেন্দ্রনাথ বসু এবং ম্যাক্স পিনল। তিনি সত্যেন বসুর কাছে পড়েছেন তড়িৎ বিদ্যা, এক্স-রে, বিশেষ আপেক্ষিকতত্ত্ব এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। তার কাছে অধ্যাপক বসুকে মনে হয়েছে এক অতল সমুদ্র। তার পড়ানোর কায়দা শামসুল হককে মুগ্ধ করেছে কারণ তিনি পা-িত্য ভারাক্রান্ত নন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বোধের স্তরে নেমে এসে তাদের পড়াতেন। ‘তিনি সাধারণ ছাত্রদের নাড়ি নক্ষত্র ভালোভাবেই বুঝতেন। তদুপরি তার বলার ভঙ্গি ছিল সুন্দর এবং পরিবেশন দক্ষতা ছিল অপূর্ব।’
অধ্যাপক হক লিখেছেন ‘... তার জ্ঞানের পরিধি বহু বিস্তৃত থাকলেও এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার মৌলিক অবদান থাকলেও প্রধানত কোয়ান্টাম তত্ত্বে তার ছিল প্রধান আকর্ষণ। আর এ তো সকলের জানা কোয়ান্টাম সংখ্যায়নে তার অবদানের জন্যই তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন। কতগুলো মৌলিক কণিকা বোস আইনস্টাইনের সংখ্যায়ন মেনে চলে বলে তার নিয়মানুসারে তাদের নামকরণ করা হয়েছে বোসনস।’ (প্রফেসর এস এন বোস-তাঁকে যেমন দেখেছিলাম, শামছুল হক, সত্যেন্দ্রনাথ বসু সংকলন)
তপন চক্রবর্তীর সম্পাদনায় ১৯৮৬ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘সত্যেন্দ্রনাথ বসু’ এই বিজ্ঞানী ও দরদী শিক্ষককে নিয়ে রচিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য রচনার একটি সংকলন।
সত্যেন বসুর জন্ম ১৮৯৪-র ১ জানুয়ারি কলকাতার গোয়াবাগানে, ১৯০৯ সালে হিন্দু স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন; ১৯২১-এ আইএসসিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে গণিতে অনার্সসহ বিজ্ঞান স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন ১৯১৩-তে এবং একই ফল ১৯১৫-তে এমএসসি পরীক্ষায়। অত্যন্ত ভালো ফলাফল প্রাথমিকভাবে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াল। ওভার কোয়ালিফায়েড বিবেচিত হওয়ায় চাকরির বাজারে প্রত্যাখ্যাত হতে শুরু করলেন। পাস করার পর পুরো বছর কাটল টিউশনি করে, অবশ্য বেতন ছিল অকর্ষণীয়। গৌরীপুরের জমিদারের ছেলেকে মাসিক দু’শ টাকা বেতন পড়াতে শুরু করেন। আর ছাত্রটি হয়ে ওঠেন সিনেমা জগতের দিকপাল প্রমথেশ বড়ুয়া। বেশ কয়েকটি কলেজ ও সরকারি অফিসে চেষ্টা করলেন। পাটনা কলেজেও দরখাস্ত পাঠালেন, সেখানে অধ্যাপনা করেন যদুনাথ সরকার, আর প্রিন্সিপাল উইলসন সাহেব। তারা জানিয়ে দিলেন কলেজের দরকার সেকেন্ড ক্লাস এমএসসি, ফার্স্ট ক্লাস ফাস্ট দিয়ে তাদের কাজ কী। বাবার এক বন্ধুর পরামর্শে আলিপুর আবহাওয়া অফিসে চাকরির দরখাস্ত করলে জবাব পেলেন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কৃতীছাত্রের উপযুক্ত কোনো চাকরি এখানে খালি নেই। প্রার্থী অন্য কোথাও দরখাস্ত করলে ভালো হবে।’ ১৯২১-এ চলে এলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞানের রিডার পদে, জ্ঞান ঘোষ এলেন রসায়নের পূর্ণাঙ্গ প্রফেসর হিসেবে।
‘ক্লেদাক্ত রাজনৈতিক আবহাওয়া’-র কারণে ১৯৪৫-র পর ইচ্ছে থাকার পরও তাকে উপযুক্ত সম্মান দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং কলকাতা থেকে তারিখহীন একটি এক লাইনের পত্রে সত্যেন বসু ‘১৯৪৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে পদার্থ বিজ্ঞানের প্রফেসর এবং ঢাকা হলের প্রভোস্ট পদে’ ইস্তফা দেন। এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন বসুর ২৪ বৎসরের কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। কিন্তু কী আশ্চর্য গৌরবময় চব্বিশটি বছর!’ (হারুন অর রশীদ)
সত্যেন বসুকে নিয়ে জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নিকট সত্যেন্দ্রনাথ ইউরোপে পড়াশোনার জন্য ১২ হাজার ৫০০ টাকার অনুদানের আবেদন করেন। ইউরোপের বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের সাথে কাজ করার জন্য এই টাকা চেয়েছেন। তার বিখ্যাত প্রবন্ধটি প্রকাশের পর তখনকার উপাচার্য স্যার পি জে হার্টগ তাকে ১৩ হাজার ৮০০ টাকার একটি অনুদান বরাদ্দ করেন এবং বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের সাথে কাজ করার সুপারিশ করেন। রাদারফোর্ড তখন ম্যানচেস্টারে তার ছাত্রদের নিয়ে গবেষণা করছেন। তার ল্যাবরেটরিতে আর জায়গা ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথ জার্মানি আর ফ্রান্সে দুই বছর গবেষণা করেন। এর মধ্যে তিনি হাইজেনবার্গের সান্নিধ্য পেয়েছেন। কাজ করেছেন দ্য ব্রগলির রঞ্জনরশ্মি গবেষণা কেন্দ্রে। মাদাম কুরির রেডিয়াম ইনস্টিটিউটেও কাজ করেন এই বিজ্ঞানী।
সত্যেন বসু ও শিল্পী দিলীপ কুমার রায়
‘সত্যেনদা চলে গেলে ঢাকা শহরটা আমার কাছে ফাঁকা মনে হতো, অচিরেই একখানা দু’পৃষ্ঠা জোড়া স্নেহমাখানো চিঠি পেয়ে মন শান্ত হতো। সত্যেনদার উৎকৃষ্ট বাংলা রচনার অনাড়ষ্ট ক্ষমতা আমাকে শিক্ষিত হতে সাহায্য করত।’এই সত্যেনদাই হচ্ছেন বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাকালের শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৯৪-১৯৭৪) আইনস্টাইনকে সঙ্গে নিয়ে যার উদ্ভাবন বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন, বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান। ১৯২১ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল তার নামে আলোকিত হতোদুর্ভাগ্য, আমরা তাকেও ধরে রাখিনি। আর যিনি এ কথা লিখছেন যে তার অবর্তমানে ঢাকা শহর ফাঁকা মনে হয় তিনি রানু সোমপ্রতিভা বসু।
দিলীপ কুমার রায় ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর সত্যেন্দ্রনাথ বসু হয়ে ওঠেন তার প্রেরণার উৎস। সত্যেন্দ্রনাথ বসু থাকতেন রমনায়, প্রতিভা নবগ্রাম। পথের দূরত্ব কম নয়, ঘোড়ার গাড়ি কিংবা সাইকেল চাই। একবার রমনার বাড়িতে গিয়ে দেখলেন কলাবতী ফুল তার বাগানটাকে আলোকিত করে রেখেছে, তার মুগ্ধতা বিজ্ঞানীকেও মুগ্ধ করল, বললেন, ‘তোমার চাই নাকি এরকম গাছ?’ বাবা বললেন, ‘আমাদের জায়গা কোথায়?’ সত্যেনদা বললেন, ‘কেন? রানু টবে ফুল করবে।’ তারপর সত্যিই একদিন গাছের বোঝা পিঠে বয়ে পায়ে হেঁটে বনগ্রামে রানুদের বাসায় এসে হাজির হলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু।
প্রতিভা বসুর লেখায় উঠে এসেছে : ‘যখন চার আনার বাজার করলেই একটি ছোট পরিবার ভালোভাবে মাছ-তরকারি খেয়ে বাঁচতে পারত, যখন পাঁচশ মাইনে পেলে গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়াত সেই সময়ে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বেতন ছিল বারশো টাকা।’ তার টাকায় যে কত পরিবার জীবনধারণ করেছে তিনি সে বর্ণনা দিয়েছেন, তার শান্তশিষ্ট ছোটখাটো ফুটফুটে স্ত্রীর কথা বলেছেন, তাদের তিনটি শিশুর দুষ্টুমির কথাও।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব নয় যারা এ যুক্তি দেখান তাদের সম্পর্কে সত্যেন বসুর মন্তব্য: হয় তারা বাংলা জানেন না অথবা বিজ্ঞান জানেন না। মাতৃভাষা না হলে কোনো শিক্ষারই সম্প্রসারণ ঘটবে না। তিনি তার জাপান সফরের অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন ১৯৬২ সালে। ইংরেজি হিন্দি দিয়ে নয় জাপানি ভাষায় ভর করেই ধ্বংসাবশেষের ভস্ম থেকে জাপান উঠে দাঁড়িয়েছে, জ্ঞানবিজ্ঞানে বহু দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। তারও ১০ বছর আগে ১৯৫২ সালে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে বিজ্ঞান শাখার সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছেন : ‘শত শত বৎসর দাসত্ব করে আমরা যে কিছু নিজেদের মতো করে ভেবে নিজেদের ভাষায় শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে পারি এবং সেই শিক্ষার ফল সুদূরপ্রসারী হয়ে দেশের লোককে উদ্বুদ্ধ করতে পারে এ ভরসাও হয় না আমাদের।’
‘বিজ্ঞানাচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে যেমন দেখেছি’ রচনায় কাজী মোতাহার হোসেন লিখেছেন, ‘১৯৩৬/৩৭ সাল থেকেই তিনি বাংলাভাষায় পদার্থবিদ্যা পড়াতেন। আমিও তার পন্থা অনুসরণ করেছিলাম। এতে কোনোদিন অসুবিধা বোধ করিনি।’ সত্যেন বসু তাকে বাংলায় পদার্থবিদ্যার ব্যবহারিক বই লিখতে বলেছেন, কারণ শিক্ষার্থীরা ‘ইংরেজি বই দেখে পরীক্ষণ বুঝতে চায়, কিন্তু সম্পূর্ণ বুঝে উঠতে পারে না বলে ভুল করে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ করে আমি ১৯২১ থেকে এ পর্যন্ত কর্মরত শিক্ষকদের সম্পর্কে যা কিছু লেখালেখি বিদ্যমান তার প্রায় সবই পড়েছি। বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি কত বড়, তার পরিমাপ আমার সামান্য পদার্থবিদ্যা জ্ঞানে নিরূপণ বরা সম্ভব নয়। কিন্তু তিনি যে শতবর্ষের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন এ কথা আমি জোর দিয়েই বলতে পরি। (সমাপ্ত)
লেখক : সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট