টেস্টে নিউজিল্যান্ড নিজেদের মাটিতে যে কোনো দলের জন্যই কঠিন প্রতিপক্ষ। এই ফরম্যাটে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন তারা। অথচ সেই কিউইদেরই তাদের মাটিতে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। যে জয়ের নায়ক এবাদত হোসেন।
দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট আদায় করে নিউজিল্যান্ডকে এক রকম গুঁড়িয়ে দেন এবাদত। ম্যাচে ৭ উইকেট নিয়ে হয়েছেন ম্যাচ সেরা। নিজের ২৮তম জন্মদিনের ঠিক দুদিন আগে এই অর্জন তার।
মজার ব্যাপার হলো, কিউই বধের নায়ক এবাদত ক্রিকেটার বা বোলার হিসাবে পরিচিতি পেলেও খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করেছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবে।
এবাদতের এই গল্পটা অবশ্য দেশের ক্রিকেট ভক্তদের প্রায় সবারই জানা। উইকেট নেওয়ার পর তার স্যালুট দিয়ে উদ্যাপনও দেশে পরিচিত দৃশ্য। তবে মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টের পর এবাদতের গল্পটা জানা হয়ে গেল বিশ্ব ক্রিকেটেরই।
নিউজিল্যান্ডকে হারানোর পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে এবাদত শুনিয়েছেন তার গল্প, ‘আমার ভলিবল থেকে ক্রিকেটে আসার গল্পটা অনেক লম্বা। তবে আমি ক্রিকেট উপভোগ করছি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ ও বিমানবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করাটাও।’
মৌলভিবাজারের ছেলে এবাদত হোসেন চৌধুরী ২০১২ সালে বিমানবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই চাকরির পাশাপাশি বিমানবাহিনীর নিয়মিত ভলিবল খেলতে শুরু করেন। ভলিবল দিয়ে খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি ক্রিকেট খেলার প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ২০১৪ সালে সিটি ক্লাবের হয়ে ঢাকায় প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলার সুযোগ পান।
এবাদত প্রথমে নজরে আসেন ২০১৬ সালে রবি পেসার হান্ট প্রতিযোগিতার মাধ্যম। সেই সময় তার দ্রুত গতির বলের জন্য তিনি ‘স্পিড স্টার’ পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের হাই পারফরম্যান্স ক্যাম্পে ডাক পান।
সেই বছর ওই ক্যাম্পে ডাক পাওয়াদের মধ্যে ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ, নাজমুল হোসেন শান্ত, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, সাদমান ইসলামের মতো তরুণেরা, যারা এখন জাতীয় দলে খেলছেন। সেই সময় হাই পারফরম্যান্স ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিতে আসা আকিব জাভেদের প্রশংসাও কুড়ান এবাদত হোসেন।
ওই সময়টায় বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের ন্যাশনাল ম্যানেজার ছিলেন নাজমুল আবেদীন ফাহিম। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘এবাদত দারুণ সমালোচনার মুখে ছিল অনেক দিন। কারণ ওর বোলিং এভারেজ ভালো একজন বোলারের সাথে যায় না। সেটা নিয়ে অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু সেটার পরেও ওর মধ্যে ভালো করার যে জেদ ছিল, ভালো করার চেষ্টা ছিল, সেটাই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ বলে আমার মনে হয়।’
এবাদত হোসেনের বোলিংয়ের অনেক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন ফাহিম, ‘রিসেন্টলি আমি দেখলাম, ওর বোলিংয়ের মধ্যে কিছু পরিবর্তন এসেছে। অনেক ডিসিপ্লিনড মনে হয়েছে, টেকটিক্যালি ইমপ্রুভড মনে হয়েছে ওকে। সেটার জন্য তাকে কঠোর অনুশীলন করতে হয়েছে।’
২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে বিসিবি একাদশের হয়ে খেলতে নেমে নয় ওভারে ১৯ রানে পাঁচ উইকেট নিয়েছিলেন এবাদত। তিনটি ওভার ছিল মেডেন। এরপর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) সিলেট সিক্সার্সের হয়ে মাঠে নেমে আলোচিত হয়ে ওঠেন এবাদত।
সিলেট সিক্সার্সের শেষ ম্যাচে মাত্র ১৭ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দলের জয়ের নায়কে পরিণত হন এবাদত। এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) পাঁচ ম্যাচে ২১ উইকেট নিয়ে তিনি নির্বাচকদের নজরে আসেন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এবাদত হোসেনের অভিষেক ঘটে ২০১৯ সালের মার্চ মাসে। তাসকিন আহমেদ ইনজুরিতে থাকায় নিউজিল্যান্ড সফরে তিনি জাতীয় টেস্ট দলের হয়ে খেলার ডাক পান। সেই সফরেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই তার আন্তর্জাতিক খেলা এবং টেস্টে অভিষেক হয়।
কিন্তু বোলিংয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে বরাবরই সমালোচনার মধ্যে থেকেছেন এবাদত হোসেন। ১০টি টেস্ট খেললেও তার বোলিং গড় ছিল প্রায় ১০০। মোট উইকেট ছিল ১১ টি।
কিন্তু বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডকে তাদের মাটিতেই হারিয়ে ম্যাচ সেরা হয়ে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে নিজের নাম খোদাই করে ফেললেন এবাদত।
নিউজিল্যান্ডকে হারানো নিয়ে যিনি বললেন, ‘আমরা এবার একটি লক্ষ্য নিয়ে এসেছিলাম। আমরা সবাই মিলে হাত তুলে প্রতিজ্ঞা করেছি, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে আমরা জয় করতে পারি। নিউজিল্যান্ডকে ওদের মাটিতে আমরা হারাতে পারি।’
এবাদত আরো বলেন, ‘আমরা জানি যে নিউজিল্যান্ড টেস্টের চ্যাম্পিয়ন। আমরা যদি ওদেরকে ওদের মাটিতে হারাতে পারি, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও জানবে যে তারাও হারাতে পারবে। এটাই ছিল মূল লক্ষ্য।’
আরো পড়ুন
