কুয়েট শিক্ষকের অস্বাভাবিক মৃত্যু

আজীবন বহিষ্কার ছাত্রলীগ নেতাসহ ৪ শিক্ষার্থী

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২২, ০২:০৮ এএম

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষক ড. মো. সেলিম হোসেনের ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যুর ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ ৪৪ শিক্ষার্থীকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে সেজানসহ চারজনকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার কুয়েট সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ছাত্রশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে তা জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। শাস্তি পাওয়া সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত।

কুয়েটের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান ভুঁইয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, সেজান ছাড়া আজীবন বহিষ্কার হওয়া অন্যরা হলেন হাসান আবদুল কাইয়ুম, মো. কামরুজ্জামান রাজ্জাক ও রিয়াজ খান নিলয়। অপরদিকে দুই শিক্ষাবর্ষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং হল থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে মো. তাহমিদুল হক ইশরাক, মাহমুদুল হাসান, মো. সাদমান সাকিব, মাহিন মুনতাসির,এ এস এম রাগিব আহসান মুন্না, মীর জামিউর রহমান ও রুদ্রনীল সিংহ শুভকে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক শিক্ষাবর্ষের জন্য ও হল থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে আনিকুর রহমানকে। এছাড়া ২২ শিক্ষার্থীকে এক শিক্ষাবর্ষের জন্য বহিষ্কার করা হয়। তবে তাদের এই শাস্তি আপাতত স্থগিত থাকবে। ভবিষ্যতে তাদের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ হলে তারা শাস্তির আওতায় আসবে। এ ছাড়া কুয়েটের আরও ১০ ছাত্রকে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

কুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী প্রতীকচন্দ্র বিশ্বাস বলেন, বৃহস্পতিবার শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা রয়েছে। এই সভার পর শিক্ষকদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করা হবে।

অপরদিকে শাস্তিপ্রাপ্ত কুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজান বলেন, ‘আমাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ আমাদের কোনো বিষয়ই আমলে নেয়নি। অযথা আমাদের ওপর মৃত্যুর দোষ চাপানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পর আমরা আইনী পদক্ষেপ নেব।’

গত মঙ্গলবার দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা শৃঙ্খলা কমিটির সভা চলার পর মুলতবি করা হয়। গতকাল বুধবার সকাল ৯টায় পুনরায় সভা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বেলা ১১টায় জরুরি সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এর আগে কুয়েট শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ ৪৪ শিক্ষার্থীর শোকজের জবাব এবং ৪৪ পৃষ্ঠার তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সভায় প্রদান করা হয়।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর বিকেলে কুয়েটের ইইই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সেলিম হোসেন মারা যান। তার মৃত্যুর পর সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে এই মৃত্যুর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ তার অনুগত ছাত্ররা দায়ী। এ ঘটনা তদন্তে দুই দফায় কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

অপরদিকে ড. সেলিমের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিসহ পাঁচ দফা দাবিতে গত ২ ডিসেম্বর দুপুরে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করে শিক্ষক সমিতি। প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে কুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধসহ দায়ী ছাত্রদের শাস্তির দাবি জানান শিক্ষকরা।

এদিকে কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী সাজ্জাদ জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ড. সেলিম প্রায় ৩৫ লাখ টাকা পাবেন। তাকে সেই টাকা দ্রুত দেওয়ার জন্য কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এছাড়া ড. সেলিমের স্ত্রী কুয়েটের চাকরির জন্য একটি আবেদন করেছেন। কিন্তু তার সরকারি চাকরির বয়সসীমা পেরিয়ে গেছে, তার বয়স ৩৭ বছর। তার চাকরির বিষয়টি পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় উত্থাপন করা হবে।

কুয়েট কর্র্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে পরিবারের ক্ষোভ : ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ড. সেলিমের স্ত্রী সাবিনা খাতুন। তার ভাষ্য, যাদের জন্য তার স্বামীর জীবন গেছে, এত অল্পতে তারা কেন ছাড় পাবে? সাবিনা বলেন, ‘এখন পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই। তার একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস আনিকা (৬) প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তার লেখাপড়া ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেছে। মামলা করার জন্য কুয়েট কর্র্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’

সাবিনা জানান, কুয়েট কর্র্তৃপক্ষ মামলা না করলে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত