টিকা ছাড়া স্কুলে যেতে পারবে না শিক্ষার্থীরা

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২২, ০২:২৪ এএম

দেশে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের সংক্রমণ ঠেকাতে এখন থেকে ১২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীরা টিকা ছাড়া স্কুলে যেতে পারবে না বলে জানিয়েছে সরকার। এমনকি হোটেল, রেস্তোরাঁ বা শপিং মলে প্রবেশ করতে এবং ট্রেন, বিমান, লঞ্চে চড়তে হলে করোনা টিকার সনদ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও রয়েছে। আগের মতো বাইরে বেরোলেই মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এসব বিধিনিষেধ মানতে বাধ্য করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্য পরিদর্শক দল মাঠে থাকবেন। বিধিনিষেধ অমান্যকারীদের জেল-জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির মুখে পড়তে হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। বৈঠকে ওমিক্রন নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ৩ জানুয়ারি একটি সভা হয়েছে। সেখানে যে বিষয়টি পয়েন্ট আউট করা হয়েছে, সেটা হলো ভ্যাকসিনটা আরও জোরদার করতে হবে। বুস্টারটাকে আরও কীভাবে কমফোর্টেবল ও বিস্তৃত করা যায়, সেটা দেখতে হবে।’

এর আগে গত ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে নেওয়া কিছু বিধিনিষেধের সঙ্গে নতুন করে এসব বিধিনিষেধের কথা জানানো হয়। মন্ত্রিসভার বৈঠকে এসব বিধিনিষেধ কীভাবে ও কবে থেকে বাস্তবায়ন হবে, সে ব্যাপারেও কিছু দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়।

গত কয়েক দিন ধরেই দেশে আবার করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ৩ জানুয়ারি প্রথম আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। সে বৈঠকে নতুন বিধিনিষেধের মধ্যে হোটেল-রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে এখন থেকে করোনার টিকা সনদ রাখা বাধ্যতামূলক করার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি আবার আগের মতো যানবাহনে অর্ধেক যাত্রী ও মাস্ক বাধ্যতামূলক এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়। সেদিন বলা হয়, এবারও এসব বিধিনিষেধ মানতে আগের মতোই জরিমানা ও শাস্তিসহ নানা ধরনের কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।

গত সোমবার অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এসব বিধিনিষেধ আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে সরে তার পরদিন মঙ্গলবার এসব বিধিনিষেধ ১৫ দিনের পরিবর্তে সাত দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। এ ব্যাপারে গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, এসব বিষয়ে ১৫ দিন সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন সাত দিন সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তা মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বলা হয়েছে এবং তিনিও একমত হয়েছেন। কারণ ১৫ দিন অনেক লম্বা সময়। এজন্য সাত দিন পরে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যাবে। এখানে সবার সহযোগিতা দরকার।

এমনকি করোনা পরিস্থিতি জরুরি বিবেচনায় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পরদিনই তথ্য অধিদপ্তরের এক তথ্য বিবরণীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৫ দফা নির্দেশনার কথা জানানো হয়। তবে এসব নির্দেশনায় রেস্তোরাঁয় খাবারের সময় টিকা সনদ রাখা ও যানবাহনে ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী বহনসহ সরকারের নতুন বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ নেই। এমন অবস্থায় আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের দুদিনের মাথায় গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকেও ওমিক্রন নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে পুরনো বিধিনিষেধসহ নতুন বিধিনিষেধের বাস্তবায়নের নানা দিক উঠে আসে।

ওমিক্রন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের কভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি দুয়েক দিনের মধ্যে সভা করে তাদের সুপারিশ সরকারকে জানিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে। এ ব্যাপারে গতকাল কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহিদুল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূল কথা হলো সংক্রমণ আস্তে আস্তে বাড়ছে। আমরা যদি এখনই বিধিনিষেধ জারি না করি ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ না নিই, তাহলে সামনের দিনগুলোতে সংক্রমণ আরও বাড়বে। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ ব্যক্তির নিজেকে নিতে হবে। আর বিধিনিষেধ সরকারের পক্ষ থেকে আসবে ও সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। এ দুটোর সমন্বয় হলে মাস্ক পরা বাড়বে, সামাজিক মেলামেশায় ভিড় কমবে। এগুলো যদি করা যায় তাহলে অবশ্যই সংক্রমণ কমবে। আমরা করোনাকে তাড়িয়ে দিতে পারব না, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব।’

কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আমরা সভায় বসব। আশা করছি আগামী দুয়েক দিনের মধ্যেই আমাদের পক্ষ থেকে নতুন যেসব পরামর্শ থাকবে, সেগুলো জানিয়ে দেব।’

টিকা না নিলে স্কুলে যেতে পারবে না শিক্ষার্থীরা : ওমিক্রনের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের ১২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের এক ডোজ টিকাও নেওয়া হয়নি, তারা স্কুলে যেতে পারবে না বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে। গত ৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আর গতকাল মন্ত্রিসভার বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রীকে বলা হয়েছে। এতক্ষণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চয়ই এ ধরনের নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছে বলেও জানান তিনি।

এর আগে গত বছরের শেষে এসএসসি পরীক্ষার আগে ঢাকায় ১২-১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা দেওয়া শুরু করে সরকার। গত ১ জানুয়ারি থেকে গ্রামেও টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এ মাসে সারা দেশে ১২-১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য বড় পরিসরে টিকাদান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এখনো দেশের ১২ বছরের কমবয়সী অসংখ্য শিক্ষার্থী টিকার বাইরে রয়েছে।

এ ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, টিকা ছাড়া স্কুলে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছর। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের নির্দেশনা নয়।

রেস্তোরাঁ, শপিং মল, বিমান, লঞ্চ, ট্রেনে টিকা সনদ বাধ্যতামূলক হচ্ছে : ওমিক্রনের বিস্তার ঠেকাতে হোটেল, রেস্তোরাঁ বা শপিং মলে প্রবেশ করতে এবং ট্রেন, বিমান ও লঞ্চে চড়তে করোনা টিকার সনদ বাধ্যতামূলক করার সরকারের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। গতকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ওমিক্রমের বিষয়ে বলা হয়েছে, এখন থেকে রেস্টুরেন্ট, শপিং মল, বিমান, ট্রেন ও লঞ্চে যারা উঠবে ডাবল ভ্যাকসিনেশন সার্টিফিকেট ছাড়া কেউ যাতে না ওঠে, সেরকম একটা চিন্তা-ভাবনার দিকে যেতে হবে। এর জন্য অবশ্য একটা সময় দেওয়া হবে।’

এসব ক্ষেত্রে টিকা সনদ দেখভালের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মোবাইলে সফট কপি (টিকা সনদের) থাকবে কিংবা হার্ড কপি থাকবে। আর কোনো দেশেই পুরো জনসংখ্যার তদারকি সম্ভব নয়, স্যাম্পল হিসেবে করা হয়। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্য পরিদর্শক যারা আছেন, তারা এটা পরীক্ষা করবেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিষয়টি দেখবে।’

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, টিকা সনদ সঙ্গে রাখার ব্যাপারে টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে বসে দুয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে পরিকল্পনা জানিয়ে দেওয়া হবে।

মাস্ক বাধ্যতামূলক ও সীমিত হচ্ছে সামাজিক অনুষ্ঠান : কেউ যাতে মাস্ক ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হয়, তা নিশ্চিত করতে আবারও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা বলে দিয়েছি, এখন থেকেই মোটিভেশন ও প্রমোশনাল কাজ করবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিষয়টি বাস্তবায়ন হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান সীমিত রাখতে হবে এবং পরিবহনে মাস্কসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে।’

সামাজিক অনুষ্ঠান সীমিত করার ব্যাপারে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এ ব্যাপারে টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এমনও হতে পারে তারা হয়তো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একটি সংখ্যা নির্ধারণ করে দেবে যে এতজনের বেশি থাকা চলবে না। চলমান নির্বাচনের বিষয়টিও টেকনিক্যাল কমিটির সঙ্গে আলোচনা হবে।’

গণপরিবহনে যাত্রী অর্ধেক হলেও ভাড়া বাড়বে না : গণপরিবহনের ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘যদি করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়, তাহলে ৫০ শতাংশে নেওয়া যায় কি না, সেজন্য আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যাতে আবার মিটিং করতে না হয়।’ তবে এ সময় গণপরিবহনে যেন ভাড়া না বাড়ে, সে ব্যাপারে সরকার বিআরটিএকে জানিয়ে দেবে বলেও জানান তিনি।

টিকার পরিসর বাড়ছে : গতকাল মন্ত্রিপরিষদ সচিব করোনার টিকার প্রসঙ্গে বলেন, ‘করোনার টিকা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। বুস্টার ডোজের কার্যক্রম আরও কীভাবে বিস্তৃত করা যায়, সেটি দেখতে হবে। বুস্টার ডোজ দেওয়ার বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি রাখা হবে নাকি আরও কমানো যায়, সেটা চিন্তা করতে হবে কারণ পর্যাপ্ত টিকা আছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত