কৃষকের নামে ঋণের টাকা তুলে ‘আত্মসাৎ’

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২২, ০২:২৪ এএম

ঢাকার নবাবগঞ্জের নয়নশ্রী ইউনিয়নের সাপলেজা গ্রামের বাসিন্দা সুবল বিশ্বাস (৩৮)। ২০২০ সালের বন্যায় সব ফসল হারিয়ে দিন এনে দিন খাওয়া এ কৃষকের এমনিতেই পথে বসার উপক্রম। এর ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে সোনালী ব্যাংকের ‘ভৌতিক’ ঋণের বোঝা। কিছুদিন আগে সুবল হঠাৎ জানতে পারেন তার নামে সোনালী ব্যাংকের নবাবগঞ্জ শাখা থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ তোলা হয়েছে। এ খবরে যেন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। কারণ ব্যাংক থেকে তিনি ঋণের কোনো টাকাই তোলেননি। সুবলের মতো একইভাবে ঋণ না নিয়েও ঋণের টাকা পরিশোধের দুশ্চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে স্থানীয় আরও সাতজন হতদরিদ্র কৃষকের।

সোনালী ব্যাংকের ঢাকার নবাবগঞ্জ শাখার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে এই আট কৃষকের নামে ঋণ তুলে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। নয়নশ্রী ইউনিয়নের সাপলেজা গ্রামের বাসিন্দা ওই কৃষকদের নামে ৫০ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ টাকা ঋণ উত্তোলন হলেও তাদের দাবি তারা কোনো ঋণই নেননি। হঠাৎ ঋণের কথা শুনে দুশ্চিন্তা ভর করেছে এই কৃষক পরিবারগুলোতে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, জাতীয় পার্টির স্থানীয় নেতা জাহাঙ্গীর চোকদার ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তাদের নামে ঋণ নিয়েছেন। নবাবগঞ্জের নতুন বান্দুরার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর চোকদার জাতীয় পার্টির ঢাকা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক।

ভুক্তভোগী অন্য কৃষকরা হলেন সাপলেজা গ্রামের বাসিন্দা প্রয়াত অমূল্য ব্যাপারীর ছেলে সোনাতন ব্যাপারী (৭৪), প্রয়াত জীবন সরকারের ছেলে মেঘলাল সরকার (৬০), প্রয়াত হরিপদ বিশ্বাসের ছেলে গোপাল বিশ্বাস (৫৩), শ্যামল সরকারের স্ত্রী অমলা সরকার (৩৮), প্রয়াত শরৎ বিশ্বাসের ছেলে জয়দেব বিশ্বাস (৭৪), কাঞ্চেরাম সরকারের ছেলে আনন্দ সরকার (৫৪) ও প্রয়াত জীবন বিশ্বাসের ছেলে বিরেন বিশ্বাস (৬০)।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, সোনালী ব্যাংকের নবাবগঞ্জ শাখায় ২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সাপলেজা গ্রামের বাসিন্দা সুবল বিশ্বাস, বিরেন বিশ্বাস, আনন্দ সরকার ও গোপাল বিশ্বাসের নামে এবং ২২ সেপ্টেম্বর গোপাল বিশ্বাস, জয়দেব বিশ্বাস, মেঘলাল সরকার ও সোনাতন ব্যাপারীর নামে সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর তাদের সবার নামে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ব্যবসা ঋণ কর্মসূচি প্রকল্পের আওতায় ৫০ হাজার টাকা করে ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু এই কৃষকদের অভিযোগ, তাদের শুধু এক দিনই ব্যাংকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং তাদের প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। তারা ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলেননি বলেও দাবি করেন।

জালিয়াতির শিকার হয়েছেন দাবি করে সুবল বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০২০ সালে বন্যায় ফসল তলিয়ে গেলে অসহায় হয়ে পড়ি। তখন জাহাঙ্গীর নেতা (জাতীয় পার্টির নেতা জাহাঙ্গীর চোকদার) আমার প্রতিবেশী রামার (রামানন্দ সরকার) মাধ্যমে জানান যে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি (ঢাকা-১ আসনের জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি, বর্তমানে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি) আমাদের কৃষকদের সার কেনার জন্য ২ হাজার করে টাকা দেবেন। সালমা ম্যাডামের কথা শুনে আমরা সব কাগজপত্র দিয়ে দিয়েছি। ১৫-১৬ দিন পর আমাদের আটজনকে নবাবগঞ্জের সোনালী ব্যাংকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বান্দুরা এসে প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। কিছুদিন আগে হঠাৎ জানতে পারি আমার নামে সোনালী ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন ওঠানো হয়েছে। ঋণ না নিয়েও ঋণগ্রস্ত হওয়ার চিন্তায় এখন আমাদের নাওয়া-খাওয়া বন্ধের পথে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর চোকদারকে জালিয়াতিতে সহায়তার অভিযোগ ওঠা রামানন্দ সরকার বলেন, ‘আমি বান্দুরা বাজারে সবজি বিক্রি করি। এক দিন জাহাঙ্গীর নেতা জানান যে অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম কৃষকদের সার কেনার জন্য ২ হাজার করে টাকা দেবেন। আমাকে কিছু কৃষি কার্ড, আইডি কার্ড ও ছবি দিতে বলেন জাহাঙ্গীর নেতা। আমি সরল বিশ্বাসে তাকে ২০ জনের কাগজপত্র দিই। এক দিন বিকেলে সোনালী ব্যাংকে আটজনকে নিয়ে যান জাহাঙ্গীর চোকদার। তাদের সঙ্গে আমিও গিয়েছিলাম। ব্যাংকে সেখানে দুই-তিনজনের সাইন নিলেও বাকিদের সাইন বা টিপসই কিছুই নেওয়া হয়নি। পরে ওই আটজনকে বান্দুরা এসে ২ হাজার করে টাকা দেন জাহাঙ্গীর নেতা। এখন শুনি ওদের নামে লোন ওঠানো হয়েছে।’

আরেক ভুক্তভোগী জয়দেব বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক দিন বিকেলে জাহাঙ্গীর চোকদার আমাদের সোনালী ব্যাংকে নিছিল। ওরা আমার টিপসই নেই নাই। এখন হুনি (শুনি) আমি নাকি ৫০ হাজার টাকা লোন নিছি। সাইন দিয়ে আমার নামে লোন উঠাইছে। কিন্তু আমি তো নামই লেখবার পারি না। সারাজীবন দিলাম টিপসই।’

চাপের মুখে জমি বিক্রি করে হলেও ঋণ পরিশোধ করা লাগতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে অন্য আরেক ভুক্তভোগী কৃষক মেঘলাল সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমপি সালমা ইসলামের নাম কইছে, তাই কার্ড দিছিলাম। বুঝতে পারি নাই জাহাঙ্গীর জালিয়াতি করে আমাদের নামে লোন উঠাইবো। এখন জমি বিক্রি করে লোন দিতে হইবো।’

তাদের অবগত না করেই ব্যাংকে কীভাবে হিসাব খোলা ও ঋণ মঞ্জুর হলো সেই প্রশ্ন তুলে আরেক ভুক্তভোগী আনন্দ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সবাইকে এক দিনই ব্যাংকে নেওয়া হয়েছিল। যেদিন ব্যাংকে গিয়েছিল সেদিন সবাইকে বান্দুরা এসে ২ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছিল। অথচ আমাদের নামে আগেই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। ব্যাংকে না গিয়েও কীভাবে অ্যাকাউন্ট হয়ে গেল বুঝলাম না! আর লোন তো নেই-ই নাই।’

ঋণ পরিশোধের চিন্তায় রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে উল্লেখ করে ‘ভৌতিক’ ঋণের শিকার গোপাল বিশ্বাস বলেন, ‘সালমা ম্যাডাম আমাদের জন্য অনেক কিছু করছেন। কিন্তু ভাবতে পারি নাই তার নাম ব্যবহার করে জাহাঙ্গীর নেতা আমাদের এভাবে ঠকাবেন। এতে তো সালমা ম্যাডামেরই দুর্নাম হইলো। আমরা এখন কীভাবে ঋণ দেব সেই চিন্তায় রাইতে ঘুম আসে না।’

যারা এই ঋণ ‘জালিয়াতির’ সঙ্গে জড়িত তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করে ভুক্তভোগী অমলা সরকার বলেন, ‘অনুদান পাবো শুইনা কাগজপত্র দিছিলাম। লোন দরকার হলে আমরাই তো সরাসরি আনতে পারতাম। পাইলাম ২ হাজার টাকা, এখন লোন দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা।’

ঋণ জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টি নেতা জাহাঙ্গীর চোকদার বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। রাজনৈতিকভাবে আমাকে ফাঁসানোর জন্য একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে এসব করাচ্ছে।’

আট কৃষকের নামে ঋণ বরাদ্দের সময় সোনালী ব্যাংকের নবাবগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক ছিলেন জসিম উদ্দিন। ঋণ জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমানে ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখায় (ঢাকা সাউথ) কর্মরত এই ব্যাংক কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমিও ঘটনাটি শুনেছি। কীভাবে এমন হলো আমিও বুঝতে পারছি না। আমার কোনো অফিসার এর সঙ্গে জড়িত কি না তদন্ত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। আমার পক্ষ থেকে তদন্তে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। এটা আমার জন্যও একটা দুর্নাম।’

আর ঋণ জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের নবাবগঞ্জ শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক রেজাউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘ভুক্তভোগী পরিবারগুলো লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকরা আমাদেরও জানিয়েছেন যে তারা কোনো লোন নেননি। তবে যেহেতু তখন আমি এই শাখায় ছিলাম না, তাই এখনই কিছু বলতে পারছি না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত