চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা পিছিয়ে পড়তে পড়তে পঞ্চম ধাপে এসে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে হেরে গেছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশিরভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী। দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নিজেদের নেতাকর্মীদের ভোট দেওয়ার এই প্রবণতায় আওয়ামী লীগ উদ্বিগ্ন। বিষয়টি দলকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। সে কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় ঐক্য জোরদার করার জন্য বিজয়ী ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে না দলটি। আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস মিলেছে।
ওই নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নৌকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আবেগ-ভালোবাসার প্রতীক। এই প্রতীকের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার এমন প্রবণতা আগে এতটা দেখা যায়নি। কিন্তু এবারের ইউপি ভোটে নৌকার প্রার্থী থাকলেও প্রতীকের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীকে বিজয়ী করার হার বেড়েই চলেছে, যা ভবিষ্যতে দলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আওয়ামী লীগের ওই কেন্দ্রীয় নেতারা আরও বলেন, নৌকা প্রতীকের ব্যাপারে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের আবেগ জড়িত। এবারের ইউপি ভোটে সেই আবেগে ভাটা পড়েছে। নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে নৌকারই নেতাকর্মীরা।
গত ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ৩ হাজার ৭৪৩টি ইউপিতে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ৭৩ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে ৫৮ শতাংশ, তৃতীয় ধাপে ৫২ দশমিক ৯২ শতাংশ, চতুর্থ ধাপে ৪৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ ও পঞ্চম ধাপে ৪৯ দশমিক ২৭ শতাংশ ইউপিতে বিজয়ী হন নৌকা প্রতীক; অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে নৌকার ভোট কমেছে, অন্যদিকে বেড়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোট। পাঁচ ধাপ মিলিয়ে বিনা ভোটে নৌকা জয়ী হয় ৩৫২টি ইউপিতে। ওই সব ইউপিতে ভোট হলে ফল অন্য রকমও হতে পারত। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি অনাস্থা জানিয়ে বিএনপি তৃণমূলের এই নির্বাচন বর্জন করেছে। তবে দলের অনেক নেতাকর্মী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সম্পাদকম-লীর একাধিক নেতা বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে গবেষণার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে তৃণমূলের এই প্রবণতা প্রশমনের উদ্যোগ নিতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সম্পাদকম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় আওয়ামী লীগ করার পরও নৌকা প্রতীককে হারাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই। নেতাকর্মীদের এমন প্রবণতা ভীষণ উদ্বেগের-ভাবনার। ওই নেতা আরও বলেন, এবারের ইউপি নির্বাচনের জরিপ প্রতিবেদনও নির্মোহভাবে কেন্দ্রে জমা পড়ছে না। এর কারণ যেসব সংস্থা জরিপের কাজ করছে, তারা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এ কারণে জরিপ প্রতিবেদনে ভালো প্রার্থী খারাপ হয়ে যাচ্ছেন, আর খারাপ প্রার্থী ভালো হয়ে যাচ্ছেন। তাই প্রতিবেদন অনুযায়ী মনোনয়ন পেলেও হেরে যাচ্ছে নৌকা।
তবে সম্পাদকম-লীর ওই নেতা বলেন, ২০১৬ সালে যখন দলীয় প্রতীকে ইউপি নির্বাচন শুরু হয়, তখন জরিপ প্রতিবেদন নিয়ে বাণিজ্য করার সুযোগ ছিল না। তাই এলাকার জনপ্রিয় নেতাই মনোনয়ন পেয়েছেন, বিজয়ীও হয়েছেন। আবার বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ছিল না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে কারণেই হোক নৌকা প্রতীক হেরে যাচ্ছে ইউপিতে, এটা খারাপ নজির।’
ইউপি নির্বাচন একেবারেই তৃণমূল পর্যায়ের ভোট। এই ভোটে প্রতীক বরাদ্দের আইন বুমেরাং হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন বোর্ডের মনোনয়ন পদ্ধতিকে। দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের ভোট করা ও বিজয়ী হওয়া তারই প্রমাণ।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌকার বিরুদ্ধে নৌকার নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভোট দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে আওয়ামী লীগকে নিশ্চয়ই ভাবতে হবে।’ তিনি বলেন, এই নজির আগে ছিল না। এবার কেন হলো, কোথায় ভুল হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
জাফরউল্যাহ আরও বলেন, ইউপি নির্বাচনে প্রতীকে ভোট এবং প্রার্থী যাচাই-বাছাইয়ের কাজ পুরোপুরি ভুলের ঊর্ধ্বে উঠে করা সম্ভব হয়নি।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার প্রবণতা আগে আওয়ামী লীগে ছিল না, এটা সত্য। আগে নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ, জাতীয় পার্টির লাঙ্গল এসব প্রতীক ছিল। এখন এই প্রতীকগুলো না থাকায় নৌকার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ভোট পড়ছে।’ তিনি মনে করেন, নৌকার বিরুদ্ধে যখন অন্য প্রতীকগুলো মাঠে লড়াইয়ে নামবে, তখন নৌকার বিরুদ্ধে ভোট আর পড়বে না।
এ প্রসঙ্গে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী-সমর্থকদের আবেগ-ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু মনোনীত প্রার্থী পছন্দ না হলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ^াসঘাতকতার প্রবণতা ছিল না, এমন নয়। তবে এবারের ইউপি নির্বাচনে এর প্রবণতা আশঙ্কাজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন সময় এসেছে, আমাদের নিরপেক্ষ, নির্মোহ ও গভীরভাবে গবেষণা করতে হবে, কেন নৌকার বিপক্ষে দলের তৃণমূল অবস্থান নিয়েছে? গবেষণার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে তা প্রশমনের উদ্যোগ না নিলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে একজন মাঠকর্মী হিসেবে আমি মনে করি।’
এদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীর ব্যাপারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যে অনড় অবস্থান আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে, চলমান ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী জেতার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শাস্তির সিদ্ধান্তও প্রত্যাহার করা হতে পারেএমন ইঙ্গিত মিলেছে।
দলের কেন্দ্রীয় নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তৃণমূলে ঐক্য ও শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ জেলা-উপজেলা, ওয়ার্ড-ইউনিয়ন সফরে নেমেছে। একদিকে শৃঙ্খলা ফেরানোর কার্যক্রম, অন্যদিকে শাস্তি। এতে মাঠে তৃণমূল নেতাকর্মীর ভেতরে বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে চলেছে। যার ফলে ঐক্য ও শৃঙ্খলা ফেরানোর কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিদ্রোহীদের টোকেন শাস্তি দেওয়ার কথা চিন্তা করছে ক্ষমতাসীনরা। আগামী নির্বাচন দলের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যেকোনো মূল্যে তৃণমূলের ঐক্য জরুরি। তাই নৌকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অপরাধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের সিদ্ধান্ত শিথিল করবে আওয়ামী লীগ।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ তো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে দলের মঙ্গলের জন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, প্রত্যাহারও হয়। তাই বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে একটি টোকেন শাস্তির চিন্তা করা হচ্ছে। কারণ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বড় শাস্তির ব্যাপারে অনড় থাকলে তৃণমূলে ঐক্য ফেরানো ও বিশৃঙ্খলা দূর করা দুরূহ কাজ হয়ে উঠবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী হলে শাস্তি তাকে পেতে হবেএমন সিদ্ধান্তে এখনো আমরা অনড় রয়েছি।’ তাহলে নির্বাচন সামনে রেখে দলের অভ্যন্তরে ঐক্য সুসংহত করা ও বিশৃঙ্খলা দূর করায় কতটা সফল হবেনএই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন এলে তখন দেখা যাবে। আমাদের দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।’
