রাজধানীর শ্যামলীতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ‘বিল পরিশোধ না করার’ অজুহাতে চিকিৎসা না দিয়ে বের করে দেওয়ায় এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার শ্যামলীর ‘আমার বাংলাদেশ হাসপাতাল’ নামের ওই হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপতালে নেওয়ার পথে যমজ দুই শিশুর একজন মারা যায়। গতকাল শুক্রবার এই ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন শিশুর মা। পরে হাসপাতালটির মালিক ও পরিচালক গোলাম সারোয়ারকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের অস্থায়ী মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘বিল পরিশোধ নিয়ে দ্বন্দ্বে চিকিৎসাধীন যমজ শিশুকে জোর করে বের করে দেওয়ার পর এক শিশুর মৃত্যু হয়। অপর শিশুকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় যমজ শিশুর মা আয়েশা বেগম মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। পরে গতকালই মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে হাসপাতালের মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
যদিও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের দাবি, ওই মা নিজের ইচ্ছায় সন্তানদের নিয়ে যান। তিনি হাসপাতালের পুরো বিলও পরিশোধ করেননি। তবে শিশুদের মা আয়েশা বেগম জানান, তিনি তার ছয় মাস বয়সী যমজ সন্তান নিয়ে সাভারের বাটপাড়া রেডিও কলোনিতে থাকেন। শিশুদের বাবা জামাল সৌদি আরব প্রবাসী। সেখানে তিনি দিনমজুরের কাজ করেন।
আয়েশা বলেন, ঠাণ্ডাজনিত কারণে ৩১ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করাই দুই বাচ্চাকে। রবিবার সেখান থেকে বলা হয় তাদেরকে এনআইসিইউতে নিতে হবে। সেখানে এনআইসিইউতে সিট পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে যখন সিদ্ধান্ত নিই, সাভারে নিয়ে যাব। তখন হাসপাতালের এক অ্যাম্বুলেন্স চালক সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে আমাকে কৌশলে আমার বাংলাদেশ হসপিটালে নিয়ে যান। ওই হাসপাতালে শিশু দুটি চিকিৎসা নিচ্ছিল।
র্যাবও জানিয়েছে, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে আমার বাংলাদেশ হাসপাতালে আয়েশা ও তার যমজ সন্তানকে ভাগিয়ে আনে দালালরা। এই দালালরাই রাজধানীর বড় বড় হাসপাতাল থেকে রোগী নিয়ে এসে গোলাম সরোয়ারের হাসপাতালে ভর্তি করাত। এতে ভালো অঙ্কের একটা কমিশন পেত তারা।
র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ‘আমার বাংলাদেশ হাসপাতাল’-এর মালিক গোলাম সরোয়ারকে গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে নানা অনিয়মের তথ্য হাতে এসেছে। তাতে বোঝা গেছে, সাধারণ নিয়মানুযায়ী কোন খাতে কত টাকা চার্জ হয়েছে, সেসব বিষয় উল্লেখ করে বিলের কাগজ তৈরির কথা থাকলেও মালিকের ইচ্ছেমতো বিল পরিশোধ করতে হয় রোগীদের।
র্যাব কর্মকর্তারা আরও জানান, ওই হাসপাতালে শিশু দুটি চিকিৎসা নিচ্ছিল। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ছয় দিন ভর্তি দেখিয়ে শিশুর স্বজনদের কাছে ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা দাবি করে। এরই মধ্যে স্বজনরা কয়েক দফায় ৫০ হাজার ৫০০ টাকা বিল পরিশোধ করেন। এরপর আর কোনো টাকা দিতে পারেননি। হাত-পায়ে ধরেও লাভ হয়নি।’
খন্দকার আল মঈন আরও জানান, হাসপাতাল পরিচালনার বিধি মোতাবেক সার্বক্ষণিক তিনজন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও এতে ছিল একজন। হাসপাতালটিতে দুটি আইসিইউসহ ৩০টি বেডের অনুমোদন থাকলে এতে ৬টি আইসিইউ, ৯টি এনআইসিইউ থাকলেও ইনকিউভেটর ছিল ১টি এবং সাধারণ বেড ১৫টি। মূলত আইসিইউকেন্দ্রিক ব্যবসার ফাঁদ তৈরি করে সে অবৈধ ব্যবসা করে যাচ্ছিল।
অনুমোদনের তুলনার বেশি আইসিইউ বেড বসানো থাকলেও এই সেবা দেওয়ার মতো কোনো চিকিৎসক ছিল না বলে জানান র্যাবের এই কর্মকর্তা। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অসৎ উদ্দেশ্যে আইসিইউ, এনআইসিইউ বেড রাখলেও চিকিৎসক ছিল না।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গোলাম সরোয়ার ২০-২২ বছর ধরে হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ পর্যন্ত তিনি ৬টি প্রতিষ্ঠান বদল করেছেন। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা বন্ধ করে নতুন এলাকায় নতুন হাসপাতাল খুলে ব্যবসা করেছেন গোলাম সরোয়ার। তিনি কীভাবে একের পর এক প্রতিষ্ঠান চালু করে অনিয়ম, অবহেলা, স্বেচ্ছাচারিতা করে যাচ্ছেন তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর খতিয়ে দেখবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে র্যাব। মামলার তদন্তেও এসব বিষয় উঠে আসবে বলে জানান র্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন।
