পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় আহত আরও দুজন মারা গেছেন। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের বাসাইলে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় আহত হেলাল উদ্দিন (৬০) গতকাল শনিবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজ বাড়িতে মারা যান। এর আগে গত বুধবার পঞ্চম ধাপে অনুষ্ঠিত ৭০৭টি ইউপির নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন হামলার শিকার হন তিনি। অন্যদিকে ঝিনাইদহের শৈলকুপায় নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হওয়া আবদুর রহিম নামে এক আওয়ামী লীগকর্মী গতকাল সকালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। এর আগে গত ২৩ ডিসেম্বর প্রতিপক্ষের হামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি।
এদিকে ইউপি নির্বাচনে ভোটের পরে নওগাঁয় ফারজানা পারভীন নামে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে। গত শুক্রবার রাতে পত্নিতলার ঘোষনগর ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে।
টাঙ্গাইলের বাসাইলে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় নিহত হেলাল উদ্দিন ফুলকি ইউনিয়নের বালিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের প্রয়াত আতোয়ার রহমানের ছেলে। জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি ভোটের ফল ঘোষণার পর পরাজিত মেম্বার প্রার্থী জামাল উদ্দিনসহ তার কর্মী-সমর্থকরা আরেক পরাজিত মেম্বার প্রার্থী আবদুল আজিজের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। এতে নিহত হেলাল ও তার স্ত্রী মিনু বেগমসহ অন্তত পাঁচজন আহত হন। হামলাকারীরা আজিজের সমর্থকদের বাড়িঘরও ভাঙচুর করে।
এ প্রসঙ্গে পরাজিত মেম্বার প্রার্থী আবদুল আজিজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বুধবার সবাই ভোটকেন্দ্রে ছিলাম। আমার চাচা অসুস্থ হওয়ায় তিনি বাড়িতে ছিলেন। ওইদিন বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ ছিল না। এ সময় জামাল উদ্দিন ও তার সমর্থকরা বাড়িতে এসে ভাঙচুর করে। আমার চাচি বাধা দিলে তাকে কুপিয়ে আহত করে সন্ত্রাসীরা। তারা ১৫-২০টি বাড়িঘর ভাঙচুর করে।’
তবে জামাল উদ্দিন নিহত হেলাল উদ্দিনের বাড়িতে হামলার কথা স্বীকার করলেও তাকে মারধরের কথা অস্বীকার করেন। তার দাবি, অসুস্থতাজনিত কারণে হেলাল উদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে।
বৃদ্ধ হেলালের মৃত্যুর ঘটনায় তার ছেলে মেহেদি হাসান মাসুম বাদী হয়ে বাসাইল থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
বাসাইল থানার ওসি হারুন অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহতের ছেলে বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার মামলা করেছেন। আজ (গতকাল) হেলাল উদ্দিন মারা যাওয়ায় ওই মামলায় নতুন ধারা যুক্ত হবে। এ মামলার আসামিদের ধরতে অভিযান চলছে।’
শৈলকুপায় নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত আবদুর রহিমের বাড়ি সারুটিয়া ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামে। তিনি গত বুধবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহমুদুল হাসান মামুনের সমর্থক ছিলেন।
শৈলকুপা থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ইউপি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে গত ২৩ ডিসেম্বর সারুটিয়া ইউনিয়নের কাতলাগাড়ী বাজারে আবদুর রহিমকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী জুলফিকার কাইছার টিপুর সমর্থকরা। তাকে উদ্ধার করে শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠান। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে মারা যান আবদুর রহিম।
এ নিয়ে সারুটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ইউপি নির্বাচন ঘিরে হামলা ও সংঘর্ষে চারজন আওয়ামী লীগকর্মী মারা গেলেন। তারা সবাই নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থক ছিলেন।
নওগাঁয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ : ইউপি নির্বাচনে ভোটের পরে নওগাঁয় স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) ফারজানা পারভীনের বাড়িতে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে। ভোটের দিন পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন ফারজানা। দুটি কেন্দ্রে ভোট স্থগিত থাকায় এই ইউপির ফল এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
স্বজনদের দাবি, নির্বাচনী বিরোধের জেরে নৌকার প্রার্থী আবু বক্কর সিদ্দিক ও তার লোকজন গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে ফারজানার কমলাবাড়ি গ্রামের বাড়িতে আগুন দেয়। এতে গাড়ির গ্যারেজ, গুদাম, আসবাবপত্রসহ অন্যান্য মালপত্র ও খড়ের পালা পুড়ে গেছে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় রাত ১টার দিকে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
গ্রেপ্তার আতঙ্কে পুরুষশূন্য বকশীগঞ্জের ৪ গ্রাম : জামালপুরের বকশীগঞ্জে ভোটকেন্দ্রে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার ভয়ে পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে চারটি গ্রাম। মেরুরচর হাছেন আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বকশীগঞ্জ থানার এসআই আবু শরিফ বাদী হয়ে ৯২ জনের নাম উল্লেখসহ গত বৃহস্পতিবার মামলাটি করেন। মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পরই পুলিশের ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে চার গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ। মেরুরচর, ফকিরপাড়া, বাঘাডুবা ও ভাটি কলকীহারা গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারই এখন পুরুষশূন্য। মহিলাদের উপস্থিতিও হাতেগোনা। অভিভাবকদের সঙ্গে পালিয়ে বেড়াচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরাও। এমনকি সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় অসুস্থতাজনিত কারণে মেরুরচর গ্রামে তিনজনের মৃত্যু হলে তাদের দাফন করতেও কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। পরে বকশীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুর রউফ তালুকদার ও পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম সওদাগরের বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মৃতদের লাশ দাফন করা হয়।
সিরাজগঞ্জে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা : সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক নাসিম রেজা নুর দিপুকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সদর উপজেলার কাওয়াকোলা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমানসহ ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১০ জনকে আসামি করে সদর থানায় মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার রাতে আহত নাসিম রেজা নুর দিপুর বড় ভাই রাকিবুল হাসান বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
এর আগে গত বুধবার ইউপি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে রাতে কাওয়াকোলা ইউপি নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার আগে নাসিম রেজা নুর দিপুর ওপর হামলা হয়।
সিরাজগঞ্জ সদর থানার ওসি নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।’
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিরা
