নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২২, ১১:৫২ পিএম

মাত্র কদিন আগেই ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে তিনতলা লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে অর্ধশত যাত্রী আগুনে পুড়ে মারা গেলেন। আহত আরও অর্ধশতাধিক যাত্রী এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কিন্তু এরই মধ্যে দেশে আরও কয়েকটি নৌদুর্ঘটনা ঘটে গেল। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ধলেশ^রী নদীতে ছয় দিন আগে ট্রলারডুবিতে নিখোঁজ হয়ে যান ১০ যাত্রী। নিখোঁজদের ছয়জনের লাশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। কিন্তু আরও চারজনের এখনো সন্ধান মেলেনি। দুঃখজনক বিষয় হলো, একের পর এক নৌদুর্ঘটনায় দেশে শোকের মাতম চললেও নৌযানের মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে যেন এর কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই! কোনো তাগিদও নেই নৌযান আর নৌযাত্রা নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়ার। উল্টো, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন যাত্রীদের মারধর করছে নৌযানের চালক-সহকারী-শ্রমিকরা। এমনকি ছবি ও সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ওপরও চড়াও হচ্ছে আর ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ভাঙচুর করছে নৌশ্রমিকরা। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে দেশের নৌপথের জন্য অশনি সংকেত।

সোমবার দেশ রূপান্তরে নৌদুর্ঘটনা নিয়ে দুটো সংবাদ ছাপা হয়। প্রথম পাতার সংবাদ থেকে জানা যায়, গত বুধবার এমভি ফারহান-৬ নামে লঞ্চের ধাক্কায় ফতুল্লার ধর্মগঞ্জ ঘাট এলাকায় ডুবে যাওয়া ট্রলারটির নিখোঁজ দশ যাত্রীর ছয়জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে দুর্ঘটনার পাঁচদিন পর। এছাড়া কেরানীগঞ্জের একটি ডকইয়ার্ড থেকে ওই লঞ্চটিসহ লঞ্চের মাস্টার কামরুল হাসান, ইনচার্জ ড্রাইভার জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও সুকানি মো. জসিম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিআইডব্লিউটিএ। এক্ষেত্রে ট্রলারটিকে ধাক্কা দেওয়া লঞ্চের মাস্টারসহ তিনজনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পারা আশাব্যঞ্জক বটে। কিন্তু একই সময়ে দেশ রূপান্তরের শেষ পাতায় ছাপা হওয়া সংবাদ থেকে জানা যায়, সুরভী-৯ নামের একটি লঞ্চে যাত্রী ও সাংবাদিকদের মারধর করেছে নৌযানের চালক-সহকারী-শ্রমিকরা। গত শনিবার রাতে পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে বরিশালে আসার পথে সাইলেন্সার পাইপ থেকে অতিরিক্ত ধোঁয়া বের হতে থাকে সুরভী-৯ লঞ্চের। সে সময় লঞ্চে আগুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এসময় কয়েকজন যাত্রী ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সহায়তা চায়। এছাড়া কয়েকজন যাত্রী মাঝনদীতে আগুন আতঙ্কের ঘটনা ফেইসবুকে লাইভ করেন। এক পর্যায়ে কোস্টগার্ড চাঁদপুরের মোহনপুরে নোঙর করায় সেটি। পরে সকালে বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা হয় লঞ্চটি। কিন্তু বরিশাল পৌঁছেই ৯৯৯-এ কলকারী এবং ফেইসবুকে ভিডিও প্রচারকারী যাত্রীদের খুঁজে খুঁজে মারধর করতে শুরু করে লঞ্চটির সহকারী ও শ্রমিকরা। খবর পেয়ে বরিশালের স্থানীয় সাংবাদিকরা নদীবন্দরে উপস্থিত হয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে লঞ্চের ম্যানেজার মিজানের নেতৃত্বে সাংবাদিকদের ওপরও চড়াও হয় তারা। ভাঙচুর করা হয়েছে চ্যানেল-২৪ ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের দুই ফটোসাংবাদিকের ক্যামেরাও। নৌযানের কর্মীদের এমন আচরণ যেমন অপেশাদার তেমনি অগ্রহণযোগ্য।

সুরভী-৯ লঞ্চে যাত্রী ও সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা এটাই প্রমাণ করছে যে, নৌপথে একের পর দুর্ঘটনা ঘটলেও নৌযানের মালিক-শ্রমিকদের টনক নড়ছে না। নৌযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যথাযথ যাত্রীসেবা দেওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো অঙ্গীকার নেই। এছাড়া কোনো দুর্ঘটনার পরই নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সম্ভবত নৌযানের মালিক-শ্রমিকরা ধরেই নিয়েছে যে, তারা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। নইলে আগুনের আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে সাহায্য চাওয়া যাত্রীদের মারধরের সাহস নৌযানের চালক-ম্যানেজার-শ্রমিকরা কোথায় পায়? এক্ষেত্রে লঞ্চটির মালিক প্রতিষ্ঠান সুরভী নেভিগেশন গ্রুপের পরিচালক মো. রেজিন-উল কবির যাত্রীদের ওপর হামলা ও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটা লক্ষ করা দরকার। তিনি বলেছেন, ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী কেউ আইনগত পদক্ষেপ নিলে কর্তৃপক্ষের আপত্তি থাকবে না! অর্থাৎ মালিকপক্ষ যাত্রী হয়রানি ও সাংবাদিক নির্যাতনের দায় নেবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত হবে এই ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। সংশ্লিষ্ট সবারই এটা মনে রাখা দরকার যে, বেশি যাত্রী বহন করা, মাত্রাতিরিক্ত গতিতে চলাচল করা, পথে অন্য যানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া, পরিবহনের ফিটনেস ঠিক না থাকা এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগুলো ঠিক না থাকার জন্য যেমন নৌযানের মালিকপক্ষ দায়ী তেমনি মালিকপক্ষকে এসব ক্ষেত্রে দেশের বিদ্যমান আইন-কানুন মানতে বাধ্য না করা কিংবা করতে না পারার দায়ও সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থার। কদিন আগেই সুগন্ধা ট্র্যাজেডির তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযান-১০ লঞ্চের ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন এবং লঞ্চটির চারজন মালিক, মাস্টার ও ইঞ্জিন চালককে দায়ী করা হয়েছে। একই সঙ্গে সদরঘাটে কর্মরত নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা ছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, লোকবলের অভাব আর সীমাবদ্ধতার কথা বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আর কতদিন নৌপথের নিরাপত্তার বিষয়টি এড়িয়ে যাবে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত