লিজ নেওয়া বিমানের ২৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ কেন

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৫৬ এএম

লিজে আনা এয়ারক্রাফট ফেরত দিতে হলে নানা ধরনের শর্ত মানতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লিজে আনার সময় যে অবস্থায় ছিল, ফেরত দেওয়ার সময়ও এয়ারক্রাফটি সেই অবস্থায় থাকতে হবে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে ব্যয়বহুল সি-চেক করাতে হয়। ইজিপ্ট এয়ার থেকে লিজে আনা এয়ারক্রাফট ফেরত দেওয়ার সময় সি-চেক করিয়েছে বিমান। পাশাপাশি টেকনিক্যাল কম্পেনসেশন বা কারিগরি ক্ষতিপূরণও দিয়েছে। দুটো একসঙ্গে দিতে গিয়েই অডিট আপত্তির মুখে পড়েছে বিমান। সবকিছু ‘দিয়ে-থুয়ে’ও বিমান বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে পারছে না।

বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইজিপ্ট এয়ারের এয়ারক্রাফট ফেরত দেওয়ার সময় ভিয়েতনাম এয়ারলাইনস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি থেকে সি-চেক করানো হয়েছে। সি-চেকের যাবতীয় খরচ বিমান বহন করেছে। এ খরচ দেওয়ার পর টেকনিক্যাল কম্পেনসেশন দেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। এরপরও দেওয়া হয়েছে। লিজ চুক্তি, ইনভয়েস, লেজার, রুলস রেগুলেশন সব দেখেছি। কোথাও দুটো একসঙ্গে পরিশোধের বিধান নেই।

বিমানের ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের আর্থিক লেনদেনের অডিট করছেন বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ সময় বিমান কর্মকর্তারা ইজিপ্ট এয়ারের লেনদেনের সঠিক জবাব দিতে পারছেন না । বিশেষ করে সি-চেক করানোর বিল দেওয়ার পরও টেকনিক্যাল কম্পেনসেশন দেওয়ার কোনো জবাব পাচ্ছে না অডিটররা। বিষয়টি গত ১৩ অক্টোবর বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইওকে লিখিতভাবে জানিয়েছে বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর। এরপর বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। শিগগিরই এ নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে বিমান ও অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও থাকবেন। সেখানেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করছেন বিমান কর্মকর্তারা।

বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চুক্তিতে টেকনিক্যাল কম্পেনসেশন দেওয়ার বিধান না থাকলেও ইজিপ্ট এয়ারকে তা দেওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের ৭ মে ৯ লাখ ডলার এবং একই বছরের ১৫ জুন ১৯ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয় দুটি ভাউচারের মাধ্যমে। ওই সময় ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা। সেই হিসাবে ক্ষতিপূরণের মোট পরিমাণ ২৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা।

ভিয়েতনাম থেকে কত টাকায় ইজিপ্ট এয়ারের এয়ারক্রাফটগুলো সি-চেক করানো হয়েছে তা জানা যায়নি। তবে গত বছর বিমানের ড্রিমলাইনার আকাশবীণা প্রথমবারের মতো দেশেই সি-চেক করানো হয়েছে। এতে করে বিমানের ৬ লাখ মার্কিন ডলার আর্থিক সাশ্রয় হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী।

সি-চেক দীর্ঘমেয়াদি, জটিল এবং উচ্চ কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন চেক, যাতে এয়ারক্রাফটের মূল যন্ত্রপাতির পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষা করে উড্ডয়নযোগ্য করা হয়। প্রতি তিন হাজার ঘণ্টা ওড়ানোর পর (ফ্লাইট আওয়ার) সি-চেক করাতে এয়ারক্রাফট দুই সপ্তাহ বসিয়ে রাখতে হয়। সি-চেকের মধ্যে এ-চেক ও বি-চেকও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ-চেকে এয়ারক্রাফটের সাধারণ অবস্থাটা নিরীক্ষা করা হয়। বি-চেকে তরল পদার্থের সরবরাহ ব্যবস্থা, লুব্রিকেশন এবং নির্দিষ্ট কিছু অপারেশনাল চেক করা হয়। ডি-চেকে কেবিন এবং ভেতরকার অন্যান্য অংশ খুলে ফেলে বিস্তারিত নিরীক্ষা করা হয়। ডি-চেকে পুরো এয়ারক্রাফট খুলে ফেলা হয়। প্রতি ৬ থেকে ১০ বছর পরপর এ-চেক করা হয়। মিসরের ইজিপ্ট এয়ার থেকে আনা বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজটি বিমানের বহরে যুক্ত হয় ২০১৪ সালের মার্চে।

২০১৪ সালে ইজিপ্ট এয়ারের কাছ থেকে ড্রাই লিজ পদ্ধতিতে পাঁচ বছরের জন্য দুটি বোয়িং ট্রিপল সেভেন এয়ারক্রাফট ভাড়ায় আনে বিমান। এর এক বছরের মধ্যেই প্রথমটি ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এয়ারক্রাফট সচল রাখতে পরপর দুটি ইঞ্জিন ভাড়ায় আনা হলে নষ্ট হয়ে যায় সেগুলোও। পরের এয়ারক্রাফটির ক্ষেত্রেও একই সংকটে পড়ে বিমান।

সাত বছর আগে মিসর থেকে ভাড়া আনার ঘটনায় সরকারের বিপুল অর্থের অপচয় হয়েছে। এর কারণ দুর্নীতি নয়, দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভুল সিদ্ধান্তÑ তা বছরের পর বছর ধরে খতিয়ে দেখছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এ বিষয়ে সর্বশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর। বৈঠকে বিমানের সাবেক চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সাক্ষ্য নেয় সংসদীয় কমিটি। বেঠক শেষে কমিটির সভাপতি উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক চেয়ারম্যান ও এমডির বক্তব্য কমিটি শুনেছে। তারা লিখিতও দিয়েছেন। আরও লিখিত দেবেন। কমিটি তদন্ত করবে। কমিটি এখনই বলছে না যে দুর্নীতি হয়েছে। এখানে কাউকে এই মুহূর্তে দোষীও করা হচ্ছে না। ক্ষতি দুর্নীতির কারণেই হয়েছে এমনও নয়। ভুল সিদ্ধান্তের কারণেও হতে পারে। কমিটি বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করবে।

এর আগে সংসদীয় কমিটি জানিয়েছিল, এ দুটি বিমান ভাড়ায় সরকারের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এই এয়ারক্রাফট দুটি চালিয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। অথচ খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। দুটি এয়ারক্রাফটের জন্য প্রতি মাসে বিমান ১১ কোটি টাকা করে ভর্তুকি দিয়েছিল। পরিকল্পনা ও প্রকৌশল বিভাগের অদূরদর্শিতায় এক বছর ফ্লাইট পরিচালনার পরই এয়ারক্রাফটে জটিলতার শুরু হয়। বিমানের একটি সিন্ডিকেট লিজ চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত দিয়েছিল যার কারণে এয়ারক্রাফট চলুক বা না চলুক, চার বছরের আগে সেটি ফেরত দিতে পারেনি। এয়ারক্রাফট বসিয়ে রেখে প্রতি মাসে বিমানকে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ডলার (৪ কোটি ৭০ লাখ ১৬ হাজার টাকা) আর একটি ইঞ্জিনের জন্য প্রতিদিন ১০ হাজার ডলার ভাড়া দিতে হবে। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ না হওয়ায় ২৭ মাস বসিয়ে রাখতে হয় এয়ারক্রাফটি। এতে মাসে প্রায় ৫ কোটি টাকা হিসাবে মেয়াদ শেষে ১৩৫ কোটি টাকা দিতে হয় বিমানকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত