নোয়াখালী পৌর নির্বাচন

ডিসির ভাইয়ের পক্ষে ভোটের মাঠে সরকারি কর্মচারীরা!

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২২, ০২:০৩ এএম

নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নোয়াখালী পৌরসভা নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বরিশাল জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে। তারা বরিশাল থেকে নোয়াখালী এসে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী (স্বতন্ত্র) লুৎফুল হায়দার লেলিনের পক্ষে ভোট চেয়ে সরকারি কর্মচারী সমিতির নেতাদের নিয়ে সভা করেছেন বলে তথ্য মিলেছে। গত সোমবার রাতে কালেক্টরেট সহকারী সমিতির নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ে ওই সভা হয়।

স্বতন্ত্র প্রার্থী লুৎফুল হায়দার লেলিন বরিশালের জেলা প্রশাসক (ডিসি) জসীম উদ্দীন হায়দারের ভাই। তার পক্ষে সরকারি কর্মচারীদের প্রচারণা চালানোর একটি ভিডিও ক্লিপ গতকাল মঙ্গলবার সকালে ফেইসবুকে ভাইরাল হলে বিষয়টি নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নোয়াখালী জেলা প্রশাসন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী লেলিনের পক্ষে সরকারি কর্মচারীদের আয়োজিত প্রচারণা সভায় উপস্থিত থাকা নোয়াখালী জেলা কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার দুপুর ২টার দিকে বরিশাল জেলা প্রশাসনের উচ্চমান সহকারী ও জেলা সরকারি কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহফুজুর রহমান খানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল নোয়াখালীতে আসে। প্রতিনিধিদলটি সন্ধ্যার পর সংগঠনের জেলা কার্যালয়ে নোয়াখালীর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সংগঠনের নোয়াখালীর সভাপতি বেলায়েত হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিমসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে সংগঠনের নোয়াখালীর সদস্যদের ব্রিফিং করেন বরিশাল থেকে আসা মাহফুজুর রহমান। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী লেলিনের পক্ষে ভোট করার জন্য নোয়াখালী জেলা প্রশাসনের কর্মচারীদের আহ্বান জানান। পাশাপাশি তারা কীভাবে প্রচারণা চালাবেন তার দিকনির্দেশনা দেন। সন্ধ্যায় বৈঠকের পর বরিশাল থেকে আসা সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধিদলটি জেলা সার্কিট হাউজে রাতযাপন করে। পরে গতকাল সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মচারীদের বাসায় বাসায় গিয়ে ভোটের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

সরকারি কর্মচারীদের বৈঠকের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, বরিশাল ডিসি অফিসের কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মাহফুজুর রহমান খান বৈঠকে উপস্থিত নোয়াখালীর নেতাদের বলছেন, ‘যোগ্য প্রার্থী, অযোগ্য প্রার্থী যা-ই বলেন, আমাদের একটি দাবি আছে। সেই দাবি হলো, আমাদেরই এক কলিগের ছোট ভাই, তাকে যদি এগিয়ে দেওয়া যায়... সবার পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনকে যদি বলেন, তাহলে আমাদের মুখটা উজ্জ্বল হবে। আপনাদের মুখটাও উজ্জ্বল হবে।’

নির্বাচনী আচরণবিধি ভেঙে নোয়াখালীতে এসে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘মূলত ১৫ তারিখে আমাদের একটা মিটিং আছে। আমাদের সাংগঠনিক কারণে সে বিষয়ে নোয়াখালীতে বসেছিলাম। এখানে যেহেতু নির্বাচন চলে, নির্বাচন হচ্ছে নোয়াখালীতে, আমাদের কথায় কেউ ভোট দেবেনও না আর আমাদের কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই। জাস্ট জানতে চাওয়া কী হয়েছে? তখন একপর্যায়ে যেটা বলেছি, আপনারা একটু খেয়াল রাখতে পারেন। এখন কেউ কেউ হয়তো বিষয়টি অন্যভাবে নিয়েছে।’

বরিশাল থেকে সরকারি কর্মচারীরা এসে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার নিন্দা জানিয়েছেন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক খায়রুল আনম সেলিম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি এবং দেখছি। বরিশালের ডিসির এ ধরনের কর্মকাণ্ডের আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এটা তো তারা পারেন না, নির্বাচন আইনেও এটা তারা পারেন না, এটা নির্বাচনী বিধির লঙ্ঘন। আশা করি আমাদের প্রশাসনের ওপর এটার প্রভাব পড়বে না।’

সরকারি কর্মচারীদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাজিমুল হায়দার জানান, সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাফিজুল হক এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অমৃত দেবনাথকে কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খোরশেদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে একটা তদন্ত কমিটি করেছি। দুদিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। যারা যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কল কেটে দেন।

১৬ জানুয়ারি নোয়াখালী পৌর নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। এতে মেয়র পদে মোবাইল ফোন প্রতীক নিয়ে ভোট করছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী লুৎফুল হায়দার লেলিন। তিনি বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দীন হায়দার লিপুর ছোট ভাই। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী বর্তমান মেয়র সহিদ উল্যাহ্ খান সোহেল। এছাড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল ইসলাম কিরণ (স্বতন্ত্র), শহর বিএনপির সভাপতি আবু নাছেরসহ (স্বতন্ত্র) মেয়র পদে সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত