মস্তিষ্কের কোনো অংশে অস্বাভাবিক পি- অথবা কোষের জমাট বাঁধাকে ব্রেইন টিউমার বলা হয়। মানব মস্তিষ্ক মাথার খুলির ভেতরে একটি নির্দিষ্ট আকৃতির মধ্যে সুরক্ষিত থাকে। অস্বাভাবিক কোনো পিন্ড বা জমাটবদ্ধ কোষ (টিউমার) বেড়ে গেলে তা মস্তিষ্কের ওপর চাপ তৈরি করে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। সঠিক চিকিৎসা না হলে এর ফলে রোগী মৃত্যুবরণ করতে পারে।
ব্রেইন টিউমার মূলত দুই ধরনের
প্রাইমারি ব্রেইন টিউমার : যে ব্রেইন টিউমার সরাসরি মস্তিষ্ক থেকে উৎপন্ন হয়, তাকে প্রাইমারি ব্রেইন টিউমার বলে। যেসব স্থানে এ ধরনের টিউমার হতে পারে তা হলো মস্তিষ্কের কোষ, মস্তিষ্কের আবরণী পর্দা (মেনিনজেস), স্নায়ুকোষ ও গ্রন্থি। সেকেন্ডারি ব্রেইন টিউমার : যে ব্রেইন টিউমার শরীরের অন্যস্থান থেকে উৎপন্ন হয়ে মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটে, তাকে সেকেন্ডারি ব্রেইন টিউমার বলা হয়। মূলত অন্যস্থানের ক্যানসার মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়লে এ ধরনের ব্রেইন টিউমার হয়।
লক্ষণ
ব্রেইন টিউমারের লক্ষণ টিউমারের আকার ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। কিছু টিউমার সরাসরি মস্তিষ্কের ক্ষতি করে আর কিছু মস্তিষ্কের ওপর চাপ তৈরি করে মস্তিষ্কের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়। এ অবস্থায় বেশ কিছু লক্ষণ দেখা যায়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মাথাব্যথা সবচেয়ে তীব্র থাকে। ঘুমের মধ্যে মাথাব্যথা শুরু হয়। মাথাব্যথার ফলে ঘুম ভেঙে যায়। হাঁচি, কাশি ও ব্যায়ামের সময় মাথাব্যথা অনুভূত হয়। বমি হওয়া এবং দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা। স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া। খাবার গলাধঃকরণ ও হাঁটাচলার সমস্যা হওয়া।
চিকিৎসা
ব্রেইন টিউমারের চিকিৎসা নির্ভর করে টিউমারের আকৃতি, অবস্থান ও ধরনের ওপর।
সার্জারি : নিউরোসার্জারির মাধ্যমে সম্পূর্ণ টিউমার, কিংবা টিউমারের কিছু অংশ অপসারণ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই টিউমার মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং আকার বেড়ে যাওয়ার ফলে মাথার খুলির ওপর চাপ ফেলে। এ অবস্থায় আংশিক অপসারণের ফলে মারাত্মক ক্ষতি এড়ানো যায়। তবে কিছু টিউমার আছে যা মস্তিষ্কের মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে যায়, যার ফলে তা সার্জারির মাধ্যমে অপসারণ করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে টিউমারের ধরন ও আকারের ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য চিকিৎসা করা হয়।
রেডিয়েশন (তেজস্ক্রিয়তা) চিকিৎসা : রেডিওথেরাপি নামে পরিচিত এই চিকিৎসায় নির্দিষ্ট মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা ব্যবহার করে টিউমারের কোষ ধ্বংস করা হয়। এ ক্ষেত্রে খুব সতর্কতার সঙ্গে নিশ্চিত করতে হয় যেন টিউমারের পার্শ্ববর্তী সুস্থ কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। রেডিয়েশন থেরাপি নিয়মিত নিতে হয়, যত দিন টিউমার নিশ্চিহ্ন না হয় অথবা আকৃতিতে যথেষ্ট পরিমাণ না কমে যায়। অনেক সময় সার্জারিতে সম্পূর্ণ টিউমার অপসারণ করা যায় না। তাই সার্জারির পর বাকি অংশ অপসারণের অথবা ধ্বংস করার জন্য রেডিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়।
কেমোথেরাপি : ওষুধ ব্যবহার করে ব্রেইন টিউমারের যে চিকিৎসা করা হয় তা কেমোথেরাপি নামে পরিচিত। এই ওষুধগুলো রক্তনালির মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে টিউমার কোষ ধ্বংস করতে সাহায্য করে। আমাদের মস্তিষ্কে যেকোনো ওষুধ পৌঁছানোর জন্য রক্ত ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি বাধা, যা ইষড়ড়ফ ইৎধরহ ইধৎৎরবৎ নামে পরিচিত, তা অতিক্রম করতে হয়। ব্রেইন টিউমার চিকিৎসায় এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এগুলো ট্যাবলেট, ক্যাপসুল অথবা ইনজেকশন হতে পারে। কেমোথেরাপির ফলে বমি, মাথা ঘোরানো, ক্ষুধামান্দ্য, ক্লান্তিসহ নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পরিশেষে বলতে হয়, ব্রেইন টিউমার একটি মারাত্মক রোগ। কোনো লক্ষণ দেখা মাত্রই সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
