মানবতাবিরোধী অপরাধ

পলাতকদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ স্তিমিত

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২২, ০২:০২ এএম

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৩১ জন ও আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত ১৩ আসামি এখনো পলাতক। তাদের গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকরের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখা ও তদন্ত সংস্থার ভাষ্য, বিচারকাজ শেষে দন্ডপ্রাপ্ত পলাতকদের ধরতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় ট্রাইব্যুনাল থেকে। আর এই পরোয়ানা কার্যকরের দায়িত্ব পুলিশ বিভাগের। তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত কোনো আসামিকে সরাসরি গ্রেপ্তারের ক্ষমতা তাদের নেই। তবে গ্রেপ্তারে সহযোগিতা করতে পারেন তারা।

পলাতকদের গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকরের বিষয়টি তদারকি করতে কয়েক বছর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর দুটি মনিটরিং সেল গঠন করে। কিন্তু ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় হওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ বছরে দন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে যারা পলাতক তাদের গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নজির নেই।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালে ঢাকার পুরনো হাইকোর্ট ভবনে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। শুরুতে একটি ট্রাইব্যুনাল থাকলেও বিচারকাজে গতি আনতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটি ট্রাইব্যুনালকে একীভূত করা হয়। ট্রাইব্যুনালে এখন ৩৭টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে বেশিরভাগ মামলাই সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার তথ্য মতে, এখন পর্যন্ত ৪৪টি মামলার রায় হয়েছে। এসব রায়ে মৃত্যুদন্ড, আমৃত্যু কারাদন্ড, যাবজ্জীবন সাজা ও ২০ বছরের কারাদন্ড হয়েছে ১০৬ জনের। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদন্ডের রায় হয়েছে ৭১ জনের। আমৃত্যু কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে ২৮ জনকে। ২০ বছর সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ৬। আর যাবজ্জীবনের আসামি ১ জন।

সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি শেষে বিভিন্ন সময়ে ৬ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে।

মৃত্যুদন্ড, আমৃত্যু কারাদন্ড ও ২০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মোট ৫২ জন। ইতিমধ্যে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৫ জন, আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত ১ জন ও ২০ বছর সাজাপ্রাপ্ত ১ জন পলাতক অবস্থায় মারা যাওয়ায় এ সংখ্যা এখন ৪৫।

তদন্ত সংস্থা থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৩১ জন, আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্ত ১৩ জন ও ২০ সাজাপ্রাপ্ত একজন পলাতক রয়েছেন।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত পলাতকদের মধ্যে অন্তত চারজনের বিদেশে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তদন্ত সংস্থা।

সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার দুই হোতা ও মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত চৌধুরী মঈনুদ্দিন যুক্তরাজ্যের লন্ডনের টটেনহামের জনসন রোডে, আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রের জ্যামাইকার হাইল্যান্ড এভিনিউতে থাকেন। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক প্রথম রায়ে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ফরিদপুরের নগরকান্দার আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার থাকেন পাকিস্তানে।

এ ছাড়া মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকার সুইডেনের স্টকহোমে থাকেন। সেখানে তিনি নিয়মিত জুয়া খেলেন বলে জানান তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক সানাউল হক। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, এই চারজনের বিষয়ে আমাদের নিজস্ব সোর্স, পুলিশ বিভাগের তথ্য ও ইন্টারপোলের রেড নোটিসের বরাতে তাদের অবস্থান জানতে পেরেছি। এর মধ্যে খোকন রাজাকারকে বছর তিনেক আগে সুইডেনের স্টকহোমে আমি নিজে দেখেছি। পরিচিতজনদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি খোকন রাজাকার জুয়ায় আসক্ত। সেখানে নিয়মিত জুয়া খেলেন তিনি। তার ছেলে ও স্বজনরাও স্টকহোমে থাকেন। আর বাচ্চু রাজাকার পাকিস্তানের করাচিতে আছেন বলে শুনেছিলাম।

মৃত্যুদন্ড, আমৃত্যু ও ২০ বছরের কারাদন্ডপ্রাপ্ত আরও ৪১ জন দেশের অভ্যন্তরেই রয়েছে বলে দাবি করেন সানাউল হক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য মতে, রায়ে সাজাপ্রাপ্ত ও বিদেশে পলাতক আসামিদের দেশে ফেরত আনা ও রায় কার্যকর করার বিষয় তদারকি করতে ২০১৪ সালের ৪ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে সভাপতি করে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ২৪ মে পুলিশ সদর দপ্তর পুলিশের একজন ডিআইজিকে সভাপতি করে আরেকটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের আগের আদেশ আংশিক সংশোধন করে ২০১৫ সালের ১৯ আগস্ট মনিটরিং সেলসংক্রান্ত আরেকটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। কিন্তু পরবর্তীকালে সেল বা কমিটির কার্যক্রম আর গতি পায়নি।

তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক সানাউল হক বলেন, শুরুর দিকে মনিটরিং সেলের কিছু সভা হয়েছিল। এরপর করোনা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি হওয়াসহ নানা কারণে সেলের কার্যক্রম গতি পায়নি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি পলাতকদের ধরতে করণীয় নিয়ে অচিরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগকে তাগিদ দিয়ে বৈঠকে বসব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুই বছরের মধ্যে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত অন্তত তিনজন আসামির রাজধানীর উত্তরা, ভূতের গলি এবং মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরে অবস্থানের বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে তাদের গ্রেপ্তারে পরোয়ানা কার্যকর করতে পুলিশ বিভাগকে তাগিদ দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, দন্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক বেশ কয়েকজন দেশের বিভিন্ন এলাকায় মারা যাওয়ার পর তারা তথ্য পেয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, একজন মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি তার বাড়িতে অবস্থান করছে, মারা গেছে এই তথ্য কি স্থানীয় পুলিশের অজানা ছিল?

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যানিং) মো. হায়দার আলী খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের প্রতিটি জেলা ও মেট্রোপলিটন পর্যায়ে সময়ে সময়ে পলাতকদের বিষয়ে নির্দেশনা ও মনিটর করি। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় আসামি জাল পাসপোর্ট করে অন্য দেশে চলে গেছে। তিনি বলেন, ওয়ারেন্ট থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের ধরছে নাএ রকম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যদি এ ধরনের কোনো অভিযোগ তদন্ত সংস্থা সুনির্দিষ্টভাবে দিতে পারে, তাহলে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেব।

ডিআইজি হায়দার আলী বলেন, দেশের বাইরে যারা আছে তাদের ব্যাপারে ইন্টারপোলের রেড অ্যালার্ট রয়েছে। পুলিশ হেড কোয়ার্টার থেকে তাদের গতিবিধি সবসময়ই মনিটর করা হয়। বিভিন্ন ফোরাম ও আন্তর্জাতিক সভায় আমরা এদের বিষয়টি উপস্থাপন করে থাকি। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিকে কোনো কোনো দেশ হস্তান্তর করতে চায় না। এ ধরনের জটিলতাও রয়েছে।  

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, যে উৎসাহ উদ্দীপনা ও একাগ্রতার সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারটা শুরু হয়েছিল সেটা আর এখন নেই। গোটা বিচার প্রক্রিয়াটাই ক্রমশ গুরুত্ব হারিয়ে ফেলছে। যে কারণে পলাতকদের গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পলাতকদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে আছে। আমাদের দাবি স্পষ্ট, পলাতকদের ধরে এনে সাজা কার্যকর হোক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত