সারা দেশে ঘটা অগ্নিকাণ্ডের শতকরা ৩৫ ভাগের বেশি ঘটছে বৈদুতিক শর্টসার্কিট থেকে। ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব শর্টসার্কিটের অন্যতম কারণ মানহীন ইলেকট্রিক পণ্য; বিশেষ করে সুইচ, সকেট ও মাল্টিপ্লাগ নিম্নমানের হলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, দেশে একাধিক চক্র নামীদামি বিভিন্ন কোম্পানির নামে অবিকল নকল ইলেকট্রিক সরঞ্জাম তৈরি করে শহর থেকে গ্রামাঞ্চলের বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর বেশি লাভের আশায় অনেক দোকানি বিক্রি করছেন এসব মানহীন নকল পণ্য। ফলে ক্রেতারা যেমন ঠকছেন, তেমনি দুর্ঘটনায় পড়ে হতাহতও হচ্ছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২২ হাজার ২২২টি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। এসব অগ্নিকাণ্ডে ২ হাজার ৫৮০ জন নিহত আর আহত হয়েছে ১১ হাজার ৯৯৯ জন। একই সঙ্গে ৩৩০ কোটি ১৫ লাখ ৩৩ হাজার টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। ২০২০ সালে দেশে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৭৩টি।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে মোট অগ্নিকাণ্ডের ৩৫ ভাগের বেশি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে ঘটে। আমাদের দেশের ৬৪ জেলায় উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত বাজারে হাজার হাজার ইলেকট্রিক সরঞ্জাম বিক্রি হয়। এগুলো যদি নিম্নমানের হয়, তবে খুবই বিপজ্জনক; বিশেষ করে যেগুলো বিদ্যুৎ পরিবহন করে সেসব সরঞ্জাম নিম্নমানের হলে অবশ্যই ইলেকট্রিক শর্টসার্কিট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে সুইচ, সকেট ও মাল্টিপ্লাগ। এগুলো নকল হলে আমাদের সবার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে গত মঙ্গলবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ভাঙ্গাপ্রেস শেখদি এলাকার আব্দুল করিম ভিলার দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে নকল ইলেকট্রিক পণ্য সুইচ, সকেট ও হোল্ডার তৈরির সময় দুজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মোক্তার আহম্মেদ (৩৪) ও জয়নাল আবেদীন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই এলাকার রিজিয়া মঞ্জিলের নিচতলার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ইলেট্রিক পণ্য, এগুলো প্রস্তুত করার মেশিন, ডাইস বা শোল্ড উদ্ধার করা হয়। তবে এখান থেকে চক্রের অন্যতম হোতা মাজহারুল ইসলাম রতন পলিয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া এসব নকল পণ্য ও পণ্য তৈরির কাঁচামালের মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা এবং চক্রটি ‘সুপারস্টার কোম্পানি’র নামে এসব নকল পণ্য বাজারজাত করত বলে জানিয়েছে ডিবি।
ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, চাহিদা বেশি হওয়ায় চক্রটি নকল সুইচ, সকেট ও বাটন হোল্ডার বেশি উৎপাদন করছে। একটি সুইচ তৈরি করতে সুপারস্টার কোম্পানির খরচ হয় ২০ টাকারও বেশি। আর সেগুলো বাজারে বিক্রি হয় ২৮ টাকায়। অথচ চক্রটি একই ব্র্যান্ডের নকল সুইচ তৈরি করছে মাত্র ২ টাকা ২০ পয়সা খরচে। এসব সুইচ দোকানে বিক্রি করছে ৯-১০ টাকায়। বাটন হোল্ডার তৈরিতে কোম্পানিটির খরচ হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা, আর বাজারে এগুলো বিক্রি হচ্ছে ৯৮ টাকায়। কিন্তু নকল বাটন হোল্ডার তৈরিতে খরচ হচ্ছে ১৭-১৯ টাকা। আর বিক্রি হচ্ছে ৪২ টাকায়। খুবই নিম্নমানের নকল কাঁচামাল ব্যবহার করায় এগুলো কম দামে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, আরও অনেকে এই নকল ইলেকট্রিক সরঞ্জাম তৈরির সঙ্গে জড়িত।
সুপারস্টার কোম্পানির সহকারী মহাপরিচালক (প্রশাসন) মো. জামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই সারা দেশ থেকে আমাদের কাছে নকল পণ্য বাজারে থাকার অভিযোগ আসছিল। ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় আমরা পুলিশের কাছে অভিযোগ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই নকল সুইচ ও বাটন হোল্ডার বাজারে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাসা-বাড়ির পাশাপাশি অনেক ভালো প্রতিষ্ঠান এগুলো কিনছে। আমাদের কাছে থাকা তথ্যমতে, অতীতে বিভিন্ন ছোট-বড় ইন্ডাস্ট্রিতে যত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগেরই উৎপত্তি ইলেকট্রিক সুইচের শর্টসার্কিট থেকে। নকল সরঞ্জামের কারণেই এই শর্টসার্কিটের ঘটনা ঘটছে।’
ডিবি ওয়ারী বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. তরিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চক্রটি ৬-৭ বছর ধরে নকল ইলেকট্রিক পণ্য তৈরি করে বিক্রি করছে; বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বাজারে তারা এসব নকল পণ্য বেশি বিক্রি করে থাকে। এসব নকল ইলেকট্রিক পণ্য ব্যবহার করায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে। এমন আরও কয়েকটি চক্র রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
