নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে এখনো স্থানীয় প্রভাবশালী সংসদ সদস্য শামীম ওসমান অনুসারীদের ভোটের মাঠে নামতে দেখা যায়নি। তবুও প্রচার-প্রচারণায় চাঙ্গাভাব আইভী শিবিরে। আইভীর অনুসারীরা বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে তারা সাধারণ ভোটার ও আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের কাছ থেকে জোরালো ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। শামীম ওসমানের অনুসারীরা শেষমেশ পক্ষে কাজ না করলেও আইভীই জিতবেন। আইভী নিজেও তার জয়ের ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সাধারণ জনগণ তার সঙ্গে আছে।
অন্যদিকে ভোটের মাঠে আইভীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী বিএনপি নেতা তৈমূর আলম খন্দকার শিবিরও জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। গতকাল বুধবার বিশাল নির্বাচনী শোডাউন করেছেন তৈমূর। যদিও তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন এমন একটি গুঞ্জনের ডালপালা গজাতে শুরু করেছে। তবে তৈমূরের কর্মী ও সমর্থকরা একে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তৈমূর নিজেও গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, যেখানেই প্রচারণায় যাচ্ছেন, সেখানেই সাধারণ মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসা পাচ্ছেন। মানুষের এ ভালোবাসাই তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
শামীম ওসমানের অনুসারীরা পক্ষে কাজ না করলেও আইভীই জিতবেন এমন দাবি করে তার পক্ষে ভোটের মাঠে থাকা নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি আনোয়ার হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শামীম ওসমানের অনুসারীরা যুক্ত না হলেও আমরাই জিতব। নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি। শামীম ওসমানের সংবাদ সম্মেলনের পরে আজ (বুধবার) দুদিন পার হয়েছে। তার লোক কাউকেই প্রচারণার মাঠে দেখিনি। তার অনুসারীদের অবস্থান আগে যা ছিল, এখনো তাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘নেতা বানানোর সময় কেন্দ্র তো সব তার (শামীম ওসমান) লোক বানিয়েছে। আমরা এ শহরের নেতা, আমাদের কাছ থেকে কোনো পরামর্শও গ্রহণ করেনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। এখন নেতা হওয়া ওদের ডাকলে ওরা বলে, ভাই (শামীম ওসমান) না বললে আমরা কীভাবে প্রচারণায় নামব? তাদের কথাও তো ঠিক। ভাই নেতা বানিয়েছে, ভাই না বললে তারা কীভাবে নামবে। এখানে পদ-পদবি পাওয়া সবাই আওয়ামী লীগ নয়, ভাই লীগ করে।’
পদ-পদবিধারী আওয়ামী লীগ নেতাদের নৌকার প্রচারণায় না পাওয়া গেলেও দলের সাধারণ কর্মী-সমর্থকরা আইভীর সঙ্গে আছেন বলেও দাবি করেন আনোয়ার হোসেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডা. আইভী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ জনগণ তো আমার সঙ্গে আছে। এর চেয়ে বেশি কিছু এখন বলব না।’
আত্মবিশ্বাসী তৈমূরও : স্বতন্ত্র প্রার্থী তৈমূর আলম নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন এমন একটি গুঞ্জনের ডালপালা গজাতে শুরু করেছে। গতকাল নারায়ণগঞ্জ শহরে বিভিন্ন ওয়ার্ডের আনাচে-কানাচে, চায়ের দোকান ও বিভিন্ন নির্বাচনী ক্যাম্পে এমন গুঞ্জন শোনা গেছে। নৌকার প্রার্থী আইভীর পক্ষে কাজ করছেন এমন অনেক কর্মী-সমর্থকের মুখেও শোনা গেছে এ গুঞ্জন। তবে তৈমূরের কর্মী ও সমর্থকরা একে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর (আইভীর) অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে তৈমূর আলমের নির্বাচনী সমন্বয়ক এসএম আকরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তৈমূরের জেতার সম্ভাবনা জেগে ওঠায় নৌকার কর্মীরা এ গুজব ছড়াচ্ছেন। ক্ষমসীন দল অবশ্য তৈমূরকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তবে জনগণ তাকে সমর্থন করছে, পাশে আছে। তাই সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ বা সম্ভাবনা কোনোটিই নেই।’
তৈমূর আলমও তার জয় নিয়ে দৃঢ় আশাবাদী। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেখানেই প্রচারণায় যাচ্ছি মানুষের সমর্থন, ভালোবাসা পাচ্ছি। মানুষই আমাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর যে গুঞ্জনের কথা আপনারা বলছেন, এটা গুটিবাজরা ছড়াচ্ছে।’
এর আগে গত সোমবার ডা. আইভী গণমাধ্যমে বলেন, ‘অপেক্ষা করুন, চমক আছে।’ তিনি এ চমকের মাধ্যমে তৈমূরের বসে যাওয়াকে ইঙ্গিত করেছেন বলে গুঞ্জন ছড়িয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আইভীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ধারণা হাতির মার্কার প্রার্থী শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন। তৈমূর শুধু এখন একটি অজুহাত খোঁজার জোর চেষ্টা করছেন।’
অবশ্য নারায়ণগঞ্জের সাধারণ অনেক মানুষেরই ধারণা তৈমূর শেষমেশ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন না। কেন এমন ধারণা তা জানতে চাইলে তারা জানান, জানুয়ারির আগে তাদের ভেতরে এরকম একটা সন্দেহ ছিল। তবে এখন আর সেই সন্দেহ করছেন না। কারণ তারা মনে করছেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি ভর করেছে তৈমূরের ওপর। কয়েক দিন আগেও তার সুর ছিল অনেকটাই দুর্বল। এখন নির্বাচনী প্রচরণায় দেওয়া তার বক্তব্য পর্যালোচনা করলে তাকে আত্মবিশ্বাসী মনে হয়।
দুই প্রার্থীর অহিংস প্রচারণায় উৎসবমুখর নারায়ণগঞ্জ : নির্বাচনে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আইভী ও তৈমূরের অহিংস প্রচারণাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষ। আর এই অহিংস প্রচারণায় ভোটের মাঠে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। সব প্রার্থীর সমর্থনে মাইক বাজছে শহরের সর্বত্র। ব্যানার-পোস্টারেরও ছড়াছড়ি। কারও মধ্যে কোনো শঙ্কা নেই ভোট নিয়ে।
সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রাফিউর রাব্বী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নৌকার প্রার্থী আইভী ও হাতির প্রার্থী তৈমূরের প্রচারণায় এখন পর্যন্ত কোনো উচ্ছৃঙ্খলতা পাওয়া যায়নি। তাই নারায়ণগঞ্জবাসী মনে করে ১৬ জানুয়ারির ভোটেও উৎসব বিরাজ করবে। কোনো সহিংসতা ঘটবে না।’
নৌকা নয়, আইভীকে পছন্দ : নির্বাচনে আইভীকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি। শুধু এই সংগঠনই নয়, অরাজনৈতিক সমমনা অন্য সংগঠনও একই পথে হেঁটেছে। আর এর নেতৃত্বে রয়েছেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রাফিউর রাব্বী। এছাড়া বিভিন্ন বাম ঘরানার দলগুলোও মৌন সমর্থন জিইয়ে রেখেছে আইভীর পক্ষে। কেন আইভীর পক্ষে কাজ করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে এই সংগঠনগুলোর প্রায় সব নেতাই বলেন, আইভীর পক্ষে তাদের সমর্থনের অন্যতম কারণ নিজের শহরকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ রাখার প্রত্যাশা।
আগের দুবারের মতো এবারও সুষ্ঠু ভোট হবে দাবি আইভীর : তৈমূর আলম তার নেতাকর্মীদের পুলিশি হয়রানির যে অভিযোগ তুলেছেন তা নাকচ করে আইভী বলেন, ‘এর আগে ২০১১ সালের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, ২০১৬ সালের নির্বাচনও সুষ্ঠু হয়েছে। এবারও নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু রয়েছে। আগের দুই নির্বাচনের মতো এবারও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট হবে।’ গতকাল সকালে নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে গণসংযোগকালে এসব কথা বলেন তিনি।
ভোটের মাঠে সংসদ সদস্য শামীম ওসমান সঙ্গে আছেন কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, ‘আপনারা এই লোকটার বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করেন কেন? আরও তো অনেক বিষয় আছে, সেগুলো বলেন। তিনি নৌকার লোক, নৌকার পক্ষেই আছেন।’
তৈমূরের বিশাল শোডাউন : নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই বিশাল নির্বাচনী শোডাউন করেছেন স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী তৈমূর আলম খন্দকার। গতকাল সকালে শহরের খানপুর হাসপাতাল এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক নিয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন তিনি।
তৈমূরের নির্বাচন সমন্বয়ক মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল জানান, করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় এক দিন আগেই হাতি মার্কার সর্বশেষ শোডাউনের আয়োজন করেন তৈমূর। আজ বৃহস্পতিবার এ শোডাউন হওয়ার কথা ছিল।
তৈমূরের এ শোডাউনে নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এসএম আকরাম এবং জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
মিছিল-পূর্ব সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তৈমূর আলম বলেন, ‘গত ১৮ বছরের না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই এই নগরীর মানুষ আমাকে ভোট দেবে।’
