সমাজ উন্নয়নে ক্যাশ ওয়াকফের প্রয়োজনীয়তা

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০৩ পিএম

ওয়াকফ হচ্ছে আল্লাহতায়ালার পথে এবং নামে কোনো স্থায়ী সম্পদ চিরতরে দান করা। যার ওপর দানকারী ব্যক্তির আর কোনো মালিকানা থাকে না। ইসলামের ইতিহাসের শুরু থেকেই ওয়াকফ ব্যবস্থা চলে আসছে। আগের দিনে সাধারণত জমিজমা ওয়াকফ করা হতো এবং ওয়াকফের ব্যাপক প্রচলন ছিল। একসময় মুসলিম বিশ্বে, বিশেষ করে মধ্য এশিয়ায় প্রায় অর্ধেক জমিজমা ওয়াকফের আওতায় চলে যায়। এসব ওয়াকফ সম্পত্তির আয় থেকে মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল ও মসজিদসহ বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রম চালানো হতো। গরিব-দুঃখীদের প্রয়োজনে বৃত্তি দেওয়া হতো।

মুসলিম সমাজ ও জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অন্যতম বিধান ওয়াকফ। ইসলামের এ বিধানটি সমাজসেবা ও জনকল্যাণের অন্যতম হাতিয়ার, যার সওয়াব ওয়াকফকারী মৃত্যুর পরও অনন্তকাল পর্যন্ত লাভ করেন। মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তার আমল ও পুণ্যের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন ওয়াকফের মতো পুণ্যের কাজ তার জন্য খোলা থাকে। এ বিষয়ে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের মৃত্যুর পর তিনটি আমল ছাড়া তার সমুদয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। ওই তিনটি আমল হলো- ১. সদকায়ে জারিয়া (অব্যাহত দান), ২. উপকারী ইলম (জ্ঞান) ও ৩. নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করবে।’সহিহ মুসলিম : ১৯৯২

বাংলাদেশ ওয়াকফ আইন ১৯৬২-তে ওয়াকফের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘ওয়াকফ বলতে কোনো ব্যক্তি দ্বারা স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তি মুসলিম আইনে স্বীকৃত যে কোনো ধর্মীয়, ধর্মসম্বন্ধীয় অথবা দাতব্য উদ্দেশ্য চিরতরে সোপর্দ করাকে বোঝায়।’ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশও ওয়াকফের একটি সংজ্ঞা প্রদান করেছে, ‘কোনো ব্যক্তি কর্তৃক নিজ সম্পত্তি আল্লাহর মালিকানায় সোপর্দ করে তা থেকে প্রাপ্ত আয় কোনো ধর্মীয় বা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়াকে ওয়াকফ বলে।’

তবে ওয়াকফের জন্য কিছু শর্ত পালন করতে হয়। এগুলো হলো ওয়াকফ সম্পত্তি নিঃস্বার্থ ও মানবতার কল্যাণে চিরস্থায়ীভাবে দান করা। এ সম্পদ বিক্রয়, হেবা কিংবা অসিয়ত করা যাবে না। ওয়াকফকারী নিজে কোনো সুবিধা ভোগ করতে পারবে না। ওয়াকফকারীর মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারীরা তা দাবি করতে পারবে না। দান করে ফেরত নেওয়া বা দাবি করা যাবে না। শুধুমাত্র সওয়াবের উদ্দেশ্যে দান করতে হবে।

ওয়াকফ এক সময় মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সেবা এবং কল্যাণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ বর্তমানে অনেকটা সীমিত। পরিসংখ্যান মতে বাংলাদেশের মোট ১,৫০,৯৫৩টি ওয়াকফ স্টেট রয়েছে। এর ৯৭,০৪৬টি রেজিস্ট্রিকৃত, ৪৫,৬০৭টি অরেজিস্ট্রিকৃত এবং ৭,৯৪০টি ব্যবহারিক। বাংলাদেশে মোট ২,১৪,৫৭৫.৪৬ একক জমি ওয়াকফ আছে। এসব সম্পত্তির ২,০০,৮৪২ একর কৃষিজমি এবং ১৩,৭৩৪ একর অকৃষি জমি। এসব ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের (সম্পদের) আয় থেকে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এক হিসেবে দেখা যায়, ওয়াকফ প্রশাসন বর্তমানে ১৫০০টি মসজিদ, ৭০০টি মাদ্রাসা, ১০০টি এতিমখানা, ৫টি দাতব্য চিকিৎসালয় এবং নওমুসলিমদের জন্য কল্যাণ তহবিল পরিচালনা করছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক হিসাবে বলা হয়েছে, দেশের প্রায় ১ লাখ আশি হাজারের বেশি মসজিদ ওয়াকফ সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ পরিসংখ্যানের পরিপ্রেক্ষিতে সহজেই বলা যায়, দেশে ওয়াকফ ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করে তুলতে পারলে, এটি দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে বিরাট অবদান রাখবে।

ওয়াকফ শুধু জমি হতে হবে এমনটা নয়। জমি ছাড়া ওয়াকফ হতে পারে ঘরবাড়ি, বিল্ডিং, হলরুম, দোকান, মার্কেট, পুকুর, কূপ, খাল, বিল, হাওর, নলকূপ, শিল্পকারখানা, ফলবান বৃক্ষ, যানবাহন, নগদ টাকা (ক্যাশ), বই-পুস্তক (স্বত্ব), লাইব্রেরি ও গবাদিপশু ইত্যাদি।

আগে দেশে জনসংখ্যা কম থাকায় মানুষ তার জায়গা-জমি ওয়াকফ করতেন। কিন্তু দিন দিন জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে পরিবারের মধ্যে জমি ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে জমি সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় মুসলিম স্কলাররা ওয়াকফ ব্যবস্থাকে ধরে রাখা এবং জনগণকে উৎসাহিত করার জন্য ক্যাশ ওয়াকফের পদ্ধতি অবিষ্কার করেছেন। ক্যাশ ওয়াকফ হলো, ওয়াকফ হিসেবে দানকৃত সেই নগদ অর্থ যা বিনিয়োগ করা হয় এবং সেই বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে উৎসর্গ বা সদকা করা হয়। এমতাবস্থায় মানবসেবা ও কল্যাণমূলক ওয়াকফের ধারা চালু রাখতে ব্যাংকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ক্যাশ ওয়াকফ করা যায়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রচারণা, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে সরকার, গণমাধ্যম, আলেম-উলামারা ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারেন।

ক্যাশ ওয়াকফের বহুমুখী অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদান বিদ্যমান। এমন অনেক প্রয়োজনীয় সেবা রয়েছে যা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না, সেটা ওয়াকফের মাধ্যমে কম খরচে নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। ক্যাশ ওয়াকফ এমন একটি দান, যাতে সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিরাই কেবল অংশ নিতে পারেন এমন নয়, কম আয়ের মানুষ, এমনকি অসচ্ছল ব্যক্তিরাও অংশ নিতে পারেন। এ জন্য দরকার ক্যাশ ওয়াকফের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি ও সদিচ্ছা।

বাংলাদেশে সাধারণ ওয়াকফ চালু থাকলেও ক্যাশ ওয়াকফের বিষয়টি তেমন পরিচিতি লাভ করেনি। দেশে ইসলামি ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর পর থেকে ক্যাশ ওয়াকফের বিষয়টি সামনে আসে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক সর্বপ্রথম ১৯৯৭ সালে ক্যাশ ওয়াকফ সঞ্চয় প্রকল্প চালু করলেও বিষয়টির প্রতি বেশি গুরুত্ব প্রদান করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ইসলামী ব্যাংক ২০০৪ সালে ক্যাশ ওয়াকফ চালু করে। বর্তমানে ব্যাংকটির ক্যাশ ওয়াকফ সঞ্চয়ের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে।

আগেই বলা হয়েছে, ওয়াকফ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম উপায়। এটা মানুষের ব্যক্তি জীবনকেই সফল করে না, বরং তার পরকালীন জীবনে অফুরন্ত সওয়াবের পাথেয় জোগাড় করে। ওয়াকফের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরিদ্র, অসহায় ও অক্ষম মানুষের নানাবিধ উপকার সাধন করে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাতে সাহায্য করে। তাই সামর্থ্যবান লোকদের উচিত ক্যাশ ওয়াকফের মতো একটি আর্থিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সদকায়ে জারিয়ার সুবিধা গ্রহণ করা।

আমাদের বিত্তশালীরা হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ সন্তানাদিদের জন্য রেখে যান। সেখান থেকে কিছু অংশ ওয়াকফ করে দিতে পারেন। যদি দেশের বিত্তশালীরা বিষয়টি নিয়ে ভাবেন এবং সম্পদের কিছু অংশ ওয়াকফ করেন, তাহলে এর দ্বারা সমাজের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হবে। যেহেতু ক্যাশ ওয়াকফে মূল সম্পদ ব্যবহার করা হয় না এর আয় ব্যবহার করা হয়। তাই মূল সম্পদ অটুট থাকে। সে হিসেবে ক্যাশ ওয়াকফ স্থানীয়ভাবে প্রত্যেক জেলায় কার্যকরী করা যায় এবং এজন্য প্রত্যেক এলাকায় ফাউন্ডেশন কিংবা সংস্থা করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে এসব ফাউন্ডেশনকে অবশ্যই দলীয় রাজনৈতিকমুক্ত হতে হবে এবং সরকার অনুমোদিত যোগ্য ব্যক্তিরা নির্মোহভাবে সমাজকল্যাণমূলক খাতে এগুলো পরিচালনা করবেন।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত