আল্লাহতায়ালা মানুষের জীবনের দুটি দুর্বলতার মধ্যে একটি শক্তি রেখেছেন; সেই শক্তিটিই পার্থিব জীবনের ভিত্তি এবং পরকালের মুনাফা। প্রথম দুর্বলতার পরের সেই শক্তিটিই হচ্ছে যৌবনকাল। এ সময়েই মানুষে দৃঢ়তা ও উচ্চাকাক্সক্ষা প্রজ¦লিত হয়। এই সময়ের গুরুত্বও অনেক বেশি। এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, সাত শ্রেণির মানুষ যাদের কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তার আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, তাদের অন্যতম হলো, ‘ওই যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে। তার প্রতিপালকের আনুগত্যের মধ্যে।’ সহিহ্ বোখারি
তরুণ ও যুবক সাহাবিদের সঙ্গে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আচার-আচরণ ও ব্যবহার ছিল খুবই আন্তরিক। তিনি তাদের প্রতি বিনয় দেখিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মিশেছেন, সাক্ষাৎ করেছেন, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাদের কাজের হিম্মত বাড়িয়েছেন। ফলে তাদের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম বের হয়েছে। তাদের সঙ্গে নবী করিম (সা.)এর বিনয় আচরণের অন্যতম উদাহরণ হলো ‘তিনি যখন বাচ্চাদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন তখন তাদের সালাম দিতেন।’ সহিহ্ মুসলিম
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের শিক্ষা প্রদানে খুবই আগ্রহী ছিলেন। হজরত জুনদুব বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমরা নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন আমরা শক্তিশালী উঠতি যুবক ছিলাম অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্ক ছিলাম। ওই সময়ে আমরা কোরআন শেখার আগে ইমান শিখেছি। অতঃপর আমরা কোরআন শিখেছি এবং এর দ্বারা আমরা ইমানকে আরও বৃদ্ধি করেছি।’ সুনানে ইবনে মাজাহ
নবী করিম (সা.) তাদের হৃদয়ে আকিদাকে দৃঢ়ভাবে স্থাপন করাতেন। তাদের শিক্ষাদানে বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে আন্তরিকতা প্রকাশ করতেন। ধৈর্যের সঙ্গে তাদের শিক্ষা দান করতেন। তাদের প্রতি যে স্নেহ ও ভালোবাসা দেখাতেন তার অন্যতম নমুনা হলো ‘তিনি যখন সওয়ারিতে চড়তেন তখন তাদেরও পেছনে উঠিয়ে নিতেন যদিও বড় বড় সাহাবিরা উপস্থিত থাকতেন। আরাফা থেকে মুজদালিফা পর্যন্ত একই বাহনে নবী করিম (সা.)-এর পেছনে হজরত উসামা (রা.) উপবিষ্ট ছিলেন। এরপর মুজদালিফা থেকে মিনা পর্যন্ত ফজল বিন আব্বাসকে তার পেছনে আরোহণ করান।’ সহিহ্ বোখারি
তিনি তাদের ইবাদত পালনে উদ্বুদ্ধ করতেন। তাদের সুন্দর ভাষায় নির্দেশনা দিতেন। তাদের স্নেহ করতেন এবং তাদের পরিবারের খোঁজ-খবর নিতেন। নবী করিম (সা.) এমনই এক মহান ব্যক্তি, যিনি বাচ্চাদের সঙ্গে রসিকতা কিংবা মজাও করতেন। এমনকি তিনি তাদের পালিত পাখির খবর নিতেন ও স্নেহ করে উপনামে ডাকতেন। ইবনে বাত্তাল বলেন, ‘নবী করিম (সা.) বাচ্চাদের সঙ্গে রসিকতা ও কৌতুক করতেন যেন এ বিষয়েও তাকে অনুসরণ করা হয়। বাচ্চাদের সঙ্গে তার রসিকতার মধ্যে হৃদয়কে বিনয়াবনত রাখা ও তা থেকে অহংকার দূর করার শিক্ষা রয়েছে।’
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশু-কিশোরকে এটা-সেটা খাওয়ানোর জন্য তাদের হাত ধরে সঙ্গে করে বাড়ি আসতেন। তাদের সঙ্গে আহার করতেন ও আহারের আদব শিক্ষা দিতেন। তরুণ ও যুবক সাহাবিদের দাওয়াতেও তিনি সাড়া দিতেন। কোনো তরুণ সাহাবির অসুস্থতার খবর তার কাছে পৌঁছালে, তিনি তাকে দেখতে যেতেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের প্রত্যেকের প্রতিভা ও যোগ্যতার দিকে বিশেষ নজর দিতেন এবং এমন পরামর্শ দিতেন যাতে তার নিজের ও জাতির কল্যাণ রয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ মদিনায় আগমন করে দেখলেন, হজরত জায়েদ বিন সাবেত (রা.) খুব সুন্দরভাবে লিখতে পারে, সে সময় তার বয়স পনেরো বছরের মতো ছিল। তারপর তাকে তিনি অহির লেখক হিসেবে নিয়োগ দেন। তার তীক্ষè মেধা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ইহুদিদের ভাষা রপ্ত করতে বললেন, যেন তাদের ভাষায় লিখিত বিষয়গুলো তার কাছে অনুবাদ করতে পারেন। হজরত জায়েদ (রা.) বলেন, ‘তারপর আমি তাদের লেখা শিখতে লাগলাম। পনেরো রাতের মধ্যেই তা আয়ত্ত করে ফেললাম। ফলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তাদের লেখা চিঠি এলে আমি তাকে পড়ে শোনাতাম এবং তিনি উত্তরপত্র লেখানোর ইচ্ছা করলে আমি লিখে দিতাম।’ মুসনাদে আহমাদ
তরুণ ও যুবক শ্রেণির সাহাবিদের ভালো ও কল্যাণমূলক উদ্বুদ্ধ এবং মর্যাদা প্রকাশের জন্য নবী করিম (সা.) তাদের প্রশংসা করতেন। তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন এবং সেভাবেই তাদের সম্বোধন করতেন, যেন তাদের মর্যাদা প্রকাশ পায়। তরুণ সাহাবিদের ভালোবেসে ও সম্মান প্রদর্শন করে তাদের জন্য ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণের দোয়া করতেন। এমনকি তাদের বিশ্বাস করে অনেক গোপন কথাও বলতেন। তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায়িত্ব দিতেন। নবী করিম (সা.) আত্তাব বিন উসাইদ (রা.)-কে মক্কার আমির নিযুক্ত করেন। তখন তার বয়স ছিল বিশ বছরের মতো। হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এরপর সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেন পাঁচজন। হজরত আনাস (রা.), হজরত জাবের (রা.), হজরত ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত ইবনে ওমর (রা.) ও হজরত আয়েশা (রা.)। তারা সবাই কম বয়সী সাহাবি ছিলেন। বড় বড় বিষয়েও এমন কম বয়সী সাহাবিদের কাছে নবী করিম (সা.) পরামর্শ চাইতেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মজলিশে বড় বড় সাহাবিদের উপস্থিতি সত্ত্বেও কম বয়সী সাহাবিদের বিশেষ গুরুত্ব দিতেন ও সম্মান জানাতেন।
নবী মুহাম্মদ (সা.) তরুণ ও যুবকদের বিপদে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়কে গুরুতর মনে করতেন। ইসলামের প্রথম দিকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল ও নবী করিম (সা.)-কে সহযোগিতা করেছিল তাদের অধিকাংশের বয়স (৮-১৩) আট থেকে তের বছরের মধ্যে ছিল। যেমন হজরত আলী (রা.), হজরত তালহা (রা.) ও হজরত যুবাইর (রা.)। যখন কুরাইশরা নবী করিম (সা.)-কে মক্কা থেকে বহিষ্কার করার ইচ্ছে করেছিল, তখন মদিনা থেকে আনসাররা তার কাছে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে অর্ধেকই ছিল বয়সে তরুণ। তারা আকাবার সন্নিকটে রাসুলের কাছে দুবার বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। এদের অন্যতম ছিলেন হজরত জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.)। তার হিজরতের পথেও তরুণ ও যুবকেরা তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিল। তিনি যখন সঙ্গীকে নিয়ে গুহায় অবস্থান করছিলেন তখন হজরত আবদুল্লাহ বিন আবু বকর (রা.) তার কাছে মক্কাবাসীদের খবরা-খবর পৌঁছাতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘সে ছিল যুবক, সুচতুর ও বুদ্ধিসম্পন্ন ছেলে।’ সহিহ্ বোখারি
তিনি মদিনায় পৌঁছালে সেখানকার কিশোর ও বালকেরা আনন্দে অভ্যর্থনা জানাতে এসেছিল। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন মদিনায় স্থির হলেন, তখন মক্কা থেকে অন্য সাহাবিরা মদিনায় হিজরত করলেন; তারা ছিল যুবক শ্রেণির। হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) মদিনায় আগমন করলেন। এই সময় তার সাহাবিদের মধ্যে হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছাড়া সাদাকালো চুলওয়ালা অর্থাৎ পাকা চুলওয়ালা কেউ ছিলেন না।’ সহিহ্ বোখারি
বাচ্চাদের সঙ্গে নবীজির অনন্য ব্যবহারের কারণে তারা তাকে অনেক ভালোবাসত। তিনি যখন সফর শেষে ফিরে আসতেন, তখন তারা তাকে অভ্যর্থনা জানাতে মদিনা থেকে বেরিয়ে পড়তে। এমনকি তারা রাসুলের বাড়িতে ঘুমাত, তাদের কেউ কেউ বিছানার ওপর রাসুলের মাথার কাছে তার মাথা রেখে ঘুমাতে।
বস্তুত মহৎ ব্যক্তিদের চরিত্র যত উন্নত হয়, ততই তা শিশুদের জন্য কোমল হয়। শিশুরা সৃষ্টিগতভাবেই তাদের ভালোবাসা পায়, যারা তাদের সঙ্গে মিশে ও তাদের শিক্ষা দেয়। কখনো কখনো তার মুখস্থ ও বুঝ শক্তি বড়দের চেয়েও তীক্ষè হয়। আর ইসলাম ধর্ম শিশুদের প্রকৃতিগত স্বভাবের অনুকূলে; তাই তারা এটাকে ভালোবাসে এবং এর শিষ্টাচার ও বিধানগুলোকে পছন্দ করে। কাজেই নবী করিম (সা.)-এর আচরণ ও নির্দেশনা ছিল তাদের জন্য সুশিক্ষাস্বরূপ। শিশু-কিশোর ও যুবকদের হেয় জ্ঞান করা ও তাদের অবজ্ঞা করা বুদ্ধিমানদের বৈশিষ্ট্য নয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় জ্ঞান করে।’ সহিহ্ মুসলিম
১৪ জানুয়ারি মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ আতিকুর রহমান
