রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার লোভ ছিল মৌলভীবাজারের মুস্তাকিন আলীর। ১০ বছর ধরে এই লোভে কখনো ছুটে বেড়িয়েছেন ম্যাগনেটিক পিলারের সন্ধানে, আবার কখনো তক্ষকের পেছনে। এভাবে ভিটেমাটি বিক্রি করে হয়ে গেছেন নিঃস্ব। সবকিছু হারিয়ে হুঁশ হয় তার। হারিয়ে যাওয়া সহায়সম্বল ফিরে পেতে নিজেই দলবলে নেমে পড়েন প্রতারণায়। তামার কয়েনকে ম্যাগনেট ও প্রত্ননিদর্শন হিসেবে চালিয়ে দিয়ে এক জুতা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৪২ লাখ টাকা। চার সঙ্গীসহ মুস্তাকিনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ এসব তথ্য জানিয়েছে।
ওই চারজনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১১ লাখ টাকা ও ৪২টি তামার ধাতব কয়েন।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার হারুন-অর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত তামা দিয়ে এসব কয়েন তৈরি হয়। যাতে লিখে দেওয়া হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম। এই কয়েনগুলো একদল প্রতারক গুলিস্তান থেকে কিনে নেয়। তারপর তারা লোকজনের কাছে এগুলোকে প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা বিভিন্ন হোটেলে লোকজনকে ডেকে নিয়ে লোভের ফাঁদে ফেলে। একেকটি কয়েনের দাম হাঁকে ৪-৫ কোটি টাকা। আসলে এই কয়েনের মূল্য ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, টার্গেট ব্যক্তির সঙ্গে ভুয়া সেসব কয়েনের দরদাম চলত পাঁচ তারকা হোটেলে। প্রতারক চক্রের সদস্যরা নিজেদের লোকদের বিক্রেতা, রসায়নবিদ ও দালাল সাজিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করতেন, যাতে ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে মো. জসিম উদ্দিন নামের এক জুতা ব্যবসায়ী গত ৯ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় দুই দালাল ও কথিত এক রসায়নবিদকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগ। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাভারে অভিযান চালিয়ে চক্রের আরেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানিকগঞ্জের একটি বাঁশঝাড় থেকে উদ্ধার করা হয় ১১ লাখ টাকা।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলো সাইফুল ইসলাম ওরফে বিষ্ণু মালো, সাইদুল ইসলাম জিহাদ ওরফে রাজা, সৈয়দ মুস্তাকিন ওরফে অহিদুজ্জামান ও মতিন মোল্লা ওরফে মোল্লা আতিক। মুস্তাকিনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার মশিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়েনগুলো ক্রেতার সামনে স্কচটেপে মোড়ানো প্যাকেট থেকে খোলা হয়। এরপর কার্বন কাগজের আরেকটি প্রলেপ ছিঁড়ে কয়েন বের করে ম্যাগনিফায়িং কাচ দিয়ে পরীক্ষা করেন কথিত রসায়নবিদ। সাজানো পরীক্ষায় সেই রসায়নবিদ চার ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার করেন। এসব কেমিক্যাল মূলত বিভিন্ন শ্যাম্পু, স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াশ ইত্যাদির মিশ্রণে তৈরি। পরীক্ষার আরেকটি যন্ত্র মূলত কান পরীক্ষা করার ডাক্তারি যন্ত্র। এটা কেনা হয় মিটফোর্ড এলাকা থেকে। এই যন্ত্রটি কয়েনের ওপর ধরলে হালকা রঙিন আভা হয়।
ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন এজাহারে উল্লেখ করেন, গত ২০ ডিসেম্বর তার স্ত্রীর পূর্বপরিচিত ফরিদপুরের মান্নান তার দুই সঙ্গী শংকর ও রাজাকে নিয়ে বাসায় আসে। এ সময় তাদের কাছে একটি ম্যাগনেটিক কয়েন রয়েছে এবং সেটি কোথাও বিক্রি করতে পারছে না বলে তাকে জানায়। বিক্রি করতে পারলে একটি অংশ তাকে দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করে। এতে লোভে পড়ে যান জসিম। ঘটনার এক দিন পর শংকর তাকে ফোন করে উত্তরার গার্ডেন রেসিডেন্স হোটেলে যেতে বলে। গত ২৬ ডিসেম্বর ওই হোটেলে গিয়ে চক্রটির খপ্পরে পড়েন তিনি।
