‘তিলকে তাল বানালেন’ শাবিপ্রবি উপাচার্য!

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০৮:২০ পিএম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে এখন উত্তাল। তবে এর শুরু ছোট একটা ঘটনা দিয়ে। ঘটনা পর্যালোচনায় সিলেট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা বলছেন, ‘তিলকে তাল বানিয়ে’ এখন বিপদে আছেন উপাচার্য।

ঘটনার সূত্রপাত বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রভোস্ট বডির পদত্যাগ দাবি করেন হলের ছাত্রীরা। রাত ১০টা থেকে পৌনে তিনটা পর্যন্ত উপাচার্য বাসভবনের সামনে জড়ো হয়ে তাদের দাবি উপাচার্যকে জানান। সেদিন তাদের দাবি ছিল, প্রভোস্ট কমিটির পদত্যাগ, অবিলম্বে হলের যাবতীয় অব্যবস্থাপনা দূর এবং হলে স্বাভাবিক সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিতসহ ছাত্রীবান্ধব প্রভোস্ট কমিটি নিয়োগ। ছাত্রীদের এসব দাবি কর্তৃপক্ষ গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরদিন শুক্রবারও ছাত্রীরা এসব দাবিতে আন্দোলনে নামে। ওই দিন সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন প্রভোস্টের রুমে ছাত্রীরা তালা দিয়ে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। রাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই হলে একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বলা হয় বর্তমান প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করা হয়নি বরং তিনি অসুস্থ এবং ছুটিতে থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে ছাত্রীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে তাদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনাও ঘটে। যদিও ছাত্রলীগ তা অস্বীকার করে।

তারা বলছেন, ছাত্রীরা যে তিনটি দাবি প্রশাসনের কাছে জানিয়ে ছিলেন তা সহজেই সমাধান করা যেত। কিন্তু প্রশাসন সে পথে হাঁটেনি। কিংবা প্রশাসন বিষয়টি পাত্তা না দিয়ে দমন করার চেষ্টা করেছে।

তাদের মত, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, গ্রুপিং রাজনীতি এবং উপাচার্যের অদূরদর্শিতা দায়ী বলে মনে হচ্ছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক সূত্র জানায়, রবিবার দুপুরে মাত্র তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন উপাচার্য। তাও ছাত্রীরাই তাকে অবরুদ্ধ করেছিল। কিন্তু তিনি বা তার প্রশাসন বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে সমঝোতার চেষ্টা না করে সহিংস পথ বেছে নিয়েছিলেন। ক্যাম্পাসে পুলিশ ডেকে এনে ছাত্রীদের ওপর হামলা চালিয়ে উপাচার্যের বেরিয়ে যাওয়ার পথ পরিষ্কার করেছেন। ছাত্রীদের হটাতে লাঠি পেটার পাশাপাশি পুলিশ ৩১ রাউন্ড শটগানের গুলি ছুড়েছে, যা অকল্পনীয়! সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে ২১টি। সিলেটের রাজপথে সশস্ত্র রাজনৈতিক সংঘাতের সময়ও এতগুলো সাউন্ড গ্রেনেড কোনো সময় ছোড়া হয়েছে বলে মনে পড়ে না।

সিলেটের কয়েকজন সাংবাদিক জানান, এ বিশ্ববিদ্যালয়েই ১৯৯৯ সালে উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবিতে উপাচার্যসহ শিক্ষকদের প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়ে রেখেছিল। অবরুদ্ধ ছিলেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, অধ্যাপক জয়নাল আবেদিন, ড. গৌরাঙ্গ দেবরায়, রেজা ই করিম খন্দকারসহ বিভিন্ন বিভাগের ডিন ও প্রধান। ছাত্ররা গেটে তালা দিয়ে বাইরে আর শিক্ষকরা ভেতরে অবস্থান করছেন। বেলা দুইটার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরুদ্ধ করেন তাদের। ১৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন উপাচার্যসহ শিক্ষকরা তবে তখন পুলিশের হামলার মতো ঘটনা ঘটেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পক্ষ বলছে, ছাত্রীদের দাবি অনুযায়ী নতুন প্রভোস্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের পুলিশ দিয়ে না পিটিয়ে প্রথম দিনেই সিদ্ধান্তটি নিলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। তাও দ্বিতীয় দিন যখন ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট নিয়োগ দেওয়া হয় তখন ‘প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করা হয়নি’ বাক্যটিও না বললে চলত।

তারা বলছেন, বর্তমান উপাচার্য প্রথম মেয়াদ শেষ করে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছেন। গত চার বছর তিনি বিচক্ষণতার সঙ্গে সবকিছু সামলে নিয়েছেন। এবার কেন তিনি এমন করলেন তার হিসাব বোধগম্য নয়।

সাংবাদিকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কয়েকজন পুলিশের হামলার পর হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের দেখতে যান। শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে সোমবার একটি বিবৃতিতে পুলিশের হামলাকে লজ্জাজনক বলে অভিহিত করা হয়। মঙ্গলবার শিক্ষকদের একটি অংশ উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের পর শিক্ষার্থীদের আলোচনার প্রস্তাব দেন। তবে তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা বলেন, উপাচার্যের পদত্যাগের আগে আলোচনা নয়।

তারা আরো বলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদেরও তারা একই কথা বলেন। নেতারা ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ সরানোর কথা বললেও তা বাস্তবায়ন কতটা হবে সে সংশয়ও রয়েছে। অন্যদিকে মঙ্গলবারই পুলিশের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা কয়েক শ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর প্রতিবাদে মামলা প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেন আন্দোলনকারীরা। তারা বুধবার এ ইস্যুতে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। ফলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত