বাণিজ্য বাড়াতে এফবিসিসিআইর সহায়তা চায় ভারত

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০৩ পিএম

গত এক বছরে বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্য ৯৪ শতাংশ বেড়েছে। অবশ্য এ বাণিজ্য বাংলাদেশের যে পরিমাণে বেড়েছে, টাকার অঙ্কে তার চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে ভারতের। বিশে^র বড় অর্থনীতির বিভিন্ন দেশ পেছনে ফেলে চলতি অর্থবছরে ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানি দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দু’দেশের এই বাণিজ্য সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিতে আগ্রহী ভারত। এজন্য দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআইর সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতের রাষ্ট্রদূত। মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বলেন লজিস্টিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, অটোমোবাইল ও পোশাক খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক উন্নত করতে চায় তার দেশ।

সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনকে পেছনে ফেলে ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম রপ্তানি দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ভারতীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান পাঁচ ধাপ এগিয়েছে।

ভারতের অর্থবছর শুরু হয় এপ্রিল থেকে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (এপ্রিল-অক্টোবর) টাকার অঙ্কে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮১ শতাংশ বেড়েছে, যার পরিমাণ ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরে ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি নিয়ে এর পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৯ বিলিয়ন ডলার। অবশ্য চলতি অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানিও বেড়েছে। অর্থবছর শেষে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রথমবারের মতো ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে, যেটা আগের অর্থবছরে ছিল ১ বিলিয়ন ডলারের মতো। ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়াতে স্থলবন্দরগুলোর ভারতীয় অংশের অবকাঠামো উন্নয়নের তাগিদ দেন এফবিসিসিআই সভাপতি জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, ভারতীয় বন্দরের সুযোগ সুবিধার অভাবে বাংলাদেশ থেকে অনেক পণ্য রপ্তানি করা যাচ্ছে না। তাতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ সময় ভারতের রাষ্ট্রদূত বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী জানান, পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল দ্রুত ও সহজ করতে পেট্রাপোল স্থলবন্দরে শিগগিরই আরেকটি নতুন গেট চালু করা হবে। অন্যান্য স্থলবন্দরে আরও বেশি পণ্য আমদানি-রপ্তানির সুযোগ বাড়লে ভারতীয় অংশে উন্নয়ন কাজ হাতে নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী বলেন, তার সরকার দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও সহজ করতে আগ্রহী। এজন্য আগামী ফেব্রুয়ারিতে সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে সিইও’স ফোরাম চালুর আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের শীর্ষ কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীদের  ফোরাম দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সমস্যা দূর করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রসঙ্গত, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকটাই দুই দেশের স্থলবন্দরের মাধ্যমে হয়। সীমান্তের পয়েন্টগুলো মূলত কন্ট্রোল ও চেক পয়েন্ট। সে কারণে পণ্য কেবল ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ থেকেই বোঝাই ও খালাস করা হয়। এ কারণে বাণিজ্য দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি খরচ বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে গ্রহণযোগ্য কোনো চুক্তি নেই। ফলে পণ্যগুলো পরীক্ষণ জটিলতায় বন্দরে বহুদিন পড়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে বহুদূরের ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষা করে আনা হয়। কিন্তু এর ফলে অনেক সময় চলে যায়।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন জানান, লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন এফবিসিসিআইর প্রধান লক্ষ্য। এ খাতের উন্নয়নে সরকারকে ১২ বছরব্যাপী পরিকল্পনা জমা দিতে কাজ করছে এফবিসিসিআই। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সম্ভাবনা বিষয়ে সভাপতি বলেন, এলডিসিপরবর্তী সময়ে পোশাক শিল্পে সুতা ও তুলার বড় জোগানদাতা হতে পারে ভারত। বাংলাদেশে ভারতীয় কোম্পানিগুলো ভালো করছে। তাই বাংলাদেশে অন্যান্য ভারতীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও লাভজনক হওয়ার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন জসিম উদ্দিন।

গত বছরের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা প্রধান পণ্যগুলোর মধ্যে ছিল তুলা (২১০ কোটি ডলার), শস্যবীজ (১৩০ কোটি ডলার), বিদ্যুৎ ও জ্বালানি (৬০ কোটি ডলার), গাড়ির যন্ত্রাংশ (৫০ কোটি ডলার) ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি (৪০ কোটি ডলার)।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সম্ভাবনা ও সুযোগের তুলনায় তার বাস্তবায়ন খুব সামান্যই। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আসলে হচ্ছে ১০ বিলিয়ন ডলার। আবার এ বাণিজ্যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রতি বছরই বাড়ছে। বাংলাদেশ ভারতের একটি বৃহৎ ও বিকাশমান বাজার হলেও বাংলাদেশ সেখান থেকে পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণে লাভবান হতে পারেনি। বৈশ্বিক বাজার থেকে ভারতের আমদানির মোট মূল্যমান প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার, যেটা এবার বেড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাণিজ্য সহজীকরণের অভাব ও লজিস্টিকস স্বল্পতার কারণে বাণিজ্যের সময়কাল দীর্ঘায়িত হয়। এটি ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করে। আরেকটি সমস্যা হলো, ভারতের পক্ষ থেকে অশুল্ক বাধা থাকার ফলে বাংলাদেশের পণ্য ভারতের বাজারে প্রবেশে বাধা পায়। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর অ্যান্টি-ডাম্পিং ডিউটি ও কাউন্টার ভেইলিং শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত