জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে সব ধরনের ব্যয় বাড়ায় সাধারণ জনগণ যখন নাকাল অবস্থায় ঠিক তখনই গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলো। রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানি গড়ে ১১৭ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। অথচ সব কোম্পানিই নিট মুনাফায় রয়েছে। কোনো কোনো কোম্পানির আয় আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে।
কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষিত হিসাব বিবরণী পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২০-২১ হিসাববছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানি সম্মিলিতভাবে ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিট মুনাফায় রয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। পেট্রোবাংলার এ কোম্পানিটি ২০২০-২১ হিসাববছরে ৩৫১ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। নিট মুনাফায় পরের অবস্থানে রয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। এ কোম্পানির নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় সামান্য কমলেও ২০২০-২১ হিসাববছরে তা প্রায় ৩৪৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এর বাইরে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যাস কোম্পানি, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ও জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমস লিমিটেড ২০২০-২১ হিসাববছরে ৬০ থেকে ১৮৫ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট মুনাফা করেছে।
এ বিষয়ে জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের জ¦ালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি কোম্পানিগুলো মুনাফায় থাকার পরও দ্বিগুণ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব গণবিরোধী। আইনে আছে, যা আয় হয়, তা দিয়ে যদি খরচ না মেটে তাহলে কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে তা লুণ্ঠনমূলক। এগুলো জনগণের কোম্পানি হওয়া সত্ত্বেও জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে চাইছে।
তিনি আরও বলেন, বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগ গ্যাস দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া। সে ক্ষেত্রে বর্তমানে যে হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা অযৌক্তিক। যদি আমদানি করা গ্যাসের মূল্য বাড়ে তাহলে সমহারে মূল্য সমন্বয় করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের আমদানি করা বেশিরভাগ গ্যাস দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আনা, যার দামে খুব বেশি হেরফের হয় না। আর যদি আমদানিতে অনেক বেশি ব্যয় হয়, তাহলে আমাদের উচিত হবে আমদানি কমিয়ে রেশনিং করা।
বিতরণ কোম্পানিগুলোর দেওয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, আবাসিকের ক্ষেত্রে দুই চুলায় ৯৭৫ থেকে বাড়িয়ে ২১০০ টাকা, মিটার আছে এমন চুলায় প্রতি ঘনমিটার ১২ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ২৭ টাকা ৩৭ পয়সা করতে চায় তারা। যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজির প্রতি ঘনমিটার কমিশন ছাড়া দাম ৭৬ টাকা ৪৮ পয়সা করতে হবে। বর্তমানে এ দাম ৩৫ টাকা। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার বর্তমানে ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা করতে হবে।
শিল্পকারখানার নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে উৎপাদিত ক্যাপটিভ পাওয়ারের গ্যাসের দাম ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার জন্য বলেছে কোম্পানিগুলো। শিল্পে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের গ্যাসের দাম ১৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে ৩৭ টাকা ২৪ পয়সা, চা শিল্পের গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা করার জন্য বলা হয়েছে। সার কারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ৪ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা, হোটেল ও রেস্টুরেন্টে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ২৩ থেকে ৪৯ টাকা ৯৭ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে কোম্পানিগুলো। বর্তমানে গড়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৯ টাকা ৩৬ পয়সা। দাম বাড়িয়ে ২০ টাকা ৩৫ পয়সা করতে চায় বিতরণ কোম্পানিগুলো।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০-২১ হিসাববছরে কোম্পানিটি গ্যাস বিক্রি করে আয় করেছে ১৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি। এ সময়ে গ্যাস বিক্রিতে তিতাসের ব্যয় হয় ১৭ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের বড় অংশ গিয়েছে এলএনজি ক্রয়ে। গত হিসাববছরে এলএনজি ক্রয়ে তিতাস ব্যয় দেখিয়েছে ১০ হাজার ২১৩ কোটি টাকা, যা আগের হিসাববছরে ছিল ৯ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা। ২০২০-২১ হিসাববছরে তিতাসের মোট আয় হয় ৬৭৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ বেশি।
পরিচালন, প্রশাসনিক ও বিতরণ ব্যয়ের পর তিতাসের পরিচালন আয় হয়েছে ২০৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এ সময় বিনিয়োগ ও ব্যাংকে রাখা আমানত থেকে আয় হয়েছে ২৫১ কোটি টাকা। ব্যাংক ঋণ পরিশোধের পর ২০২০-২১ হিসাববছরে কোম্পানিটির মুনাফা দাঁড়ায় ৪৫৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। বিনিয়োগ ও সুদবাবদ আয় কমে যাওয়ায় সর্বশেষ হিসাববছরে তিতাসের অপরিচালন আয় ১৭২ কোটি টাকা কমেছে। ফলে মুনাফায় কর্মচারীদের হিস্যা প্রদান শেষে ২০২০-২১ হিসাববছরে কোম্পানির কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়ায় ৪৩৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৫০৪ কোটি টাকা। আর কর পরিশোধের তিতাসের নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৪৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ কম।
রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বেশি মুনাফায় থাকা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি ২০২০-২১ হিসাববছরে গ্যাস বিক্রি করে আয় করে ৩ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। এ সময় গ্যাস (এলএনজিসহ) ক্রয়, ট্রান্সমিশন চার্জ, গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডসহ গ্যাস বিক্রিতে মোট ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৯৬০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরে ছিল ২ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা। এতে সর্বশেষ হিসাববছরে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ৫৬৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৫৫৬ কোটি টাকা। ২০২০-২১ হিসাববছরে প্রশাসনিক, অবচয় এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়, সুদ আয় ও অপরিচালন আয় সমন্বয় শেষে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৫১৬ কোটি টাকা। আর কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা হয়েছে ৩৫১ কোটি, যা আগের বছর ছিল ৩৬২ কোটি টাকা।
গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে নিট মুনাফায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমস লিমিটেড। ২০২০-২১ হিসাববছরে গ্যাস বিক্রি থেকে কোম্পানিটির আয় হয়েছে ২ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। এ সময় গ্যাস (এলএনজিসহ) ক্রয়, ট্রান্সমিশন চার্জ, গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডসহ গ্যাস বিক্রিতে মোট ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৬৪৩ কোটি, যা আগের বছরে ছিল ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। মোট আয় হয় ৩১৬ কোটি, যা আগের বছরে ছিল ২৯৭ কোটি টাকা। ২০২০-২১ হিসাববছরে প্রশাসনিক, অবচয়সহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়, সুদ আয় ও অপরিচালন আয় সমন্বয় শেষে কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৬৪ কোটি টাকা। আর কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা হয়েছে ১৮৪ কোটি, যা আগের বছর ছিল ১৬৮ কোটি টাকা।
২০২০-২১ হিসাববছরে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আয় হয় ২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। এ সময় গ্যাস (এলএনজিসহ) ক্রয়, ট্রান্সমিশন চার্জ, গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডসহ গ্যাস বিক্রিতে মোট ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩২৯ কোটি, যা আগের বছরে ছিল ২ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। এতে সর্বশেষ হিসাববছরে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২৬০ কোটি ৫৪ লাখ, যা আগের বছরে ছিল ৫৩৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ২০২০-২১ হিসাববছরে প্রশাসনিক, অবচয়সহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়, সুদ আয় ও অপরিচালন আয় সমন্বয় এবং কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা হয়েছে ১৪৮ কোটি ৭১ লাখ, যা আগের বছর ছিল ৯৭ কোটি টাকা।
২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হওয়া সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড কোম্পানির রেভিনিউ ২০২০-২১ হিসাববছরে ছিল ৫০০ কোটি টাকা। গ্যাস ক্রয়সহ অন্যান্য ব্যয় ও কর পরিশোধের পর ওই হিসাববছরে কোম্পানির নিট মুনাফা হয়েছে ৫৯ কোটি, যা আগের বছরে ছিল ৫৪ কোটি টাকা। একই বছরে পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যাস কোম্পানির আয় হয় ১ হাজার ১২৫ কোটি, যা আগের বছরে ছিল ১ হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। এ সময় গ্যাস (এলএনজিসহ) ক্রয়, ট্রান্সমিশন চার্জ, গ্যাস ডেভেলপমেন্ট ফান্ড, এনার্জি সিকিউরিটি ফান্ডসহ গ্যাস বিক্রিতে মোট ব্যয় হয়েছে ৯৭৪ কোটি, যা আগের বছরে ছিল ১ হাজার ২৬ কোটি টাকা। এতে সর্বশেষ হিসাববছরে মোট আয় দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটি, যা আগের বছরে ছিল ১৬০ কোটি টাকা। ২০২০-২১ হিসাববছরে প্রশাসনিক, অবচয়সহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয়, সুদ আয় ও অপরিচালন আয় সমন্বয় এবং কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা হয়েছে ৯০ কোটি, যা আগের বছর ছিল ৯২ কোটি টাকা।
