মহাসড়কের ওপর ১৯৩ বাজার

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২২, ০১:৫৭ এএম

দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর ১৯৩টি অবৈধ বাজার থাকার তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের একটি প্রতিবেদনে। অবৈধ এসব বাজারের নিয়ন্ত্রণ সরকারদলীয় স্থানীয় নেতা ও প্রভাবশালীদের হাতে। ক্ষেত্র বিশেষে বাজারগুলো ইজারার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

পুরনো মহাসড়ক আইন সংশোধন করে গত ডিসেম্বরে জারি করা মহাসড়ক আইন অনুযায়ী, মহাসড়কের ভূমির প্রান্তসীমা থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত সংরক্ষিত অংশ। আগে থেকে অনুমতি না নিয়ে এই অংশে হাট-বাজার বসানো, অবকাঠামো তৈরি কিংবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ওই অংশটি ব্যবহার করা যাবে না।

অবৈধ এসব বাজারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। আবার বাজার ঘিরে চলছে চাঁদাবাজি। এমনকি চাঁদার ভাগ বসাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যরাও।

মহাসড়কের ওপর গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার দ্রুত উচ্ছেদের পাশাপাশি ইজারা বাতিল করতে বছরখানেক আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। কিন্তু চিঠির জবাব এখনো পায়নি পুলিশ সদর দপ্তর। সে কারণে আবারও চিঠি দেওয়ার কথা ভাবছে পুলিশ।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। বিশেষ করে মহাসড়কে যাতে অবৈধ কোনো কিছু চলাচল করতে না পারে সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কের আশপাশে যাতে কোনো ধরনের বাজার বসতে না পারে সেই জন্য মনিটরিং করা হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দেশ রূপান্তরকে জানায়, বেশিরভাগ মহাসড়ক ঘেঁষে হাট-বাজার বসেছে। আবার কোথাও কোথাও সড়কের দ্ইু পাশে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে দোকানপাট ও বাজার। এসব বাজার ও দোকানপাট ঘিরে নীরবে চলছে চাঁদাবাজি। মহাসড়কে দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরের ট্রাফিক বিভাগ প্রায় এক বছর ধরে গবেষণা চালায়। ওই গবেষণায় অন্যান্য কারণের সঙ্গে হাট-বাজারকে বেশি দায়ী করা হয়েছে। বছরখানেক আগে হওয়া ওই গবেষণায় দেশের কোন কোন মহাসড়কের পাশে বাজার আছে তার একটি তালিকাও করে পুলিশ। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারগুলো বছরের পর বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা। কিছু বাজার নামকাওয়াস্তে ইজারা নেন তারা। তবে বেশিরভাগ বাজারেরই ইজারা নেওয়া হয় না। প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এমনও আছে এক কিলোমিটার জুড়ে বাজার বসানোর কথা থাকলেও বসানো হয়ে ৪-৫ কিলোমিটার জুড়ে। যেসব স্থানে বাজারগুলো আছে তার তালিকাসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে বছরখানেক আগে একটি চিঠি পাঠায় পুলিশ।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জাতীয় মহাসড়ক আছে ১১০টি। এগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৯৯০ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার। আর আঞ্চলিক মহাসড়কের সংখ্যা ১৪৭, সেগুলোর মোট দৈর্ঘ্য ৪৮৯৭ দশমিক ৭১ কিলোমিটার।

পুলিশ সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র ও সেতু মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুমিল্লার নিমসার বাজার, দাউদকান্দির গৌরীপুর, চান্দিনা বাগুর বাসস্ট্যান্ড, কালাকচুয়া বাজার, দেবীদ্বারের কংশনগর, সুয়াগাজী, মিয়াবাজার, চৌদ্দগ্রাম, মহিপাল, নাথেরপেটুয়া, ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের ভালুকার বরাডোবা, ভালুকা, চেলেরঘাট, বাঘামোরা, ত্রিশাল, হৈলরবাজার, কাজীরসিমলা, কানহর, তুরখাই, টাঈাইল মহাসড়কের মনতলা, সাহেব বাজার, ভাপাকিরমোড়, কালীবাড়ি বাজার, চেচুয়াখালী বাজার, গাবতলী, জামালপুর মহাসড়কের রসুলপুর, কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের কানারামপুর, মাজার বাসস্ট্যান্ড, জালুয়ার বাজার, আমতলা, নান্দাইল চৌরাস্তা, তারেরঘাট, শেরপুরের গোপালপুর, উদালধর, তারাকান্দা দক্ষিণ, বাইমকান্দি, গোরদাড়, পাইসলা বাইপাস, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের রাজাবাড়ি, হরিপুর, কামারপাড়া, নাটোরের বানেশ^র, ঝলমলিয়া, নওগাঁর নওদাপাড়া, নওহাটা, মৌগাছি, কেশরহাট, সাপাই, বরিশালের কাশিপুর, নতুলাবাদ, চৌমাটা, বাকেরগঞ্জের বোয়ালিয়া, রহমতপুর, জয়শ্রী, লাকুদিয়া বাজার প্রমুখ।          

বাজারগুলোর বিষয়ে পুলিশ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিমসার বাজারে এলোপাতাড়ি গাড়ি রেখে মালামাল তোলার কারণে যানজট লেগেই থাকে। এখানে রাস্তার দুইপাশেই বাজার বসে। দেশের অন্যতম সবজির বাজার হিসেবে প্রসিদ্ধ নিমসার বাজারের বিষয়ে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীরা বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করে।

এ ছাড়া পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের শাখারিয়া থেকে ব্রিকফিল্ড, কেওয়াবুনিয়া, মহিষকাটা, চুনাখালী, সাহেববাড়ি, আমড়াগাছিয়া, ডাক্তারবাড়ি, শিকদার বাড়ি, ঘটখালী, বাঁধঘাট, ছুরিকাটা, মানিকঝুড়ি, খুড়িয়ার খেয়াঘাট, আকনবাড়ীসহ ৩৭ কিলোমিটার জুড়ে সড়কের পাশে বাজার গড়ে উঠছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিজেদের ইচ্ছামতো মহাসড়কের ওপরে বাজার গড়ে তুলেছেন।

গাজীপুরে সড়ক, মহাসড়ক, ফুটপাথসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অসংখ্য বাজার বসেছে। দখলকারীরা মাসে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা, ভবানীপুর, জৈনা, চান্দনা চৌরাস্তার পশ্চিমপাশে, চান্দনা স্কুলের সামনের ফুটপাত, বোর্ডবাজার, বড়বাড়ি, গাজীপুরা, চেরাগআলী সিটি কার্যালয়ের সামনে, স্টেশন রোড এবং টঙ্গীতে বাজার বসে প্রতিদিন। এখান থেকে তোলা হয় চাঁদা।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অবৈধ বাজার। রাত-দিন ওইসব বাজার সরগরম থাকে। যার ফলে যানবাহন চলাচল করতে সমস্যা হয়। লোকজনের ছোটাছুটিও বেশি।

আমাদের সাভার প্রতিনিধি ওমর ফারুক জানান, সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, নবীনগর-চন্দ্রা ও বাইপাইল আব্দুল্লাহপুর সড়কের দুই পাশের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) জমিসহ ফুটপাত এমনকি মহাসড়ক দখল করে গড়ে উঠেছে বাজার। সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মহাসড়কের উভয় পাশে সবজি, মসলা, মাছ, মাংস, ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের ছয় হাজার ভাসমান দোকান বসিয়েছে হকার্স লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। প্রতিদিন এসব দোকান থেকে ২৫০-৪০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, উলাইল, গেন্ডা, নবীনগর, বাইপাইল, জামগড়া, জিরানিবাজার, বলিভদ্র ও চন্দ্র এলাকা থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক ২০০-৪০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ডিইপিজেড) থেকে শমসের প্লাজা পর্যন্ত বিশাল কাঁচাবাজার বসিয়ে প্রতিটি দোকান থেকেও একই হারে চাঁদা তোলা হয়। নতুন ইপিজেড ওভারব্রিজের নিচে একটি মিনি মার্কেট করে দোকানপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়ে দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

বাইপাইল সম্ভার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে আশুলিয়া থানা পর্যন্ত ফুটপাতে দুই শতাধিক কাঁচামালের দোকান বসানো হয়েছে। এর ফলে পোশাকশ্রমিকরা মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। দোকানিদের দাবি, ধামসোনা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি লতিফ ম-লের ছত্রছায়ায় তারা দোকান বসিয়েছেন। এজন্য তাদের প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়।

তবে আওয়ামী লীগ নেতা লতিফ মন্ডল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। কেউ যদি এসব দোকান উচ্ছেদ করতে আসে, তাহলে আমি তাদের সহযোগিতা করব।’

গত ৩০ ডিসেম্বর সাভার বাসস্ট্যান্ডে চাঁদা তোলার সময় হকার্স লীগ সাভার উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক জুয়েলকে আটক করে পুলিশ।

এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর পৌরসভার উলাইল এলাকায় ফুটপাতে দোকান বসিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে সাভার থানা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিন খান ও তার এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার ওসি কাজী মাইনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। সাভারে কোনো চাঁদাবাজি চলবে না। যেই চাঁদাবাজি করুক তাকেই আটক করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত