অনশনে অটল শিক্ষার্থীরা আরও ৭ জন হাসপাতালে

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২২, ০২:১২ এএম

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে অনশনে বসা আরও সাত শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমরণ অনশন কর্মসূচির তৃতীয় দিনে গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ নিয়ে অনশনে বসা ২৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে তীব্র শীত আর অনাহারে অসুস্থ হয়ে পড়া ১৪ শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও তাদের কেউ এখনো অনশন ভাঙেননি বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

শুধু অনশনে বসা একজন তার বাবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে অনশনস্থল ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন। গতকাল রাত সাড়ে ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত অনশনস্থলে বসে ৯ শিক্ষার্থী অনশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের সবারই শরীরে স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। গত বুধবার দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আমরণ অনশন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত ২৪ শিক্ষার্থী।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে বৈঠক করতে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষক ঢাকা পৌঁছেছেন। গতকাল রাত ১১টার দিকে তারা ক্যাম্পাস থেকে ঢাকা পৌঁছান বলে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক তুলসী কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। প্রতিনিধিদলে তিনি ছাড়াও রয়েছেন ফিজিক্যাল সায়েন্সের অনুষদ ডিন অধ্যাপক ড. রাশেদ তালুকদার, শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মুহিবুল আলম, অ্যাপ্লাইড সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আরিফুল ইসলাম ও বাণিজ্য অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. খায়েরুল ইসলাম রুবেল। তবে কখন তারা বৈঠকে বসবেন এ বিষয়ে জানা যায়নি।

এর আগে গতকাল বিকেলে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধিদলকে ঢাকায় গিয়ে তার সঙ্গে তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। ফোনালাপ শেষে তারা আট সদস্যের প্রতিনিধিদল আলোচনায় বসবে বলে গণমাধ্যমকে জানান। তবে সেই আলোচনা ঢাকায় নয়, শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে বা ভার্চুয়ালি করতে চান আন্দোলনকারীরা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শিক্ষামন্ত্রীর দূত হিসেবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতে আসা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। উপাচার্যও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে চান বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে তাতে সায় দেননি শিক্ষার্থীরা। আলোচনা চলাকালে এক দফা দাবিতে অনশন কর্মসূচি চলমান থাকবে বলেও জানান অনশনকারীরা।

গতকাল দুপুরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আশফাক, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেনসহ ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতা ক্যাম্পাসে আসেন। তারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার পর আওয়ামী লীগ নেতারা উপাচার্য ফরিদ উদ্দিনের বাসভবনে তার সঙ্গে আলাপের জন্য যান। দুপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষে শফিউল আলম নাদেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘এভাবে অচলাবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। আমাদের সন্তানদের এই কষ্ট আমরা মেনে নিতে পারছি না। শিক্ষামন্ত্রীর বার্তা নিয়ে এখানে এসেছি। দুপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করব। উপাচার্যও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।’

আওয়ামী লীগ নেতারা উপাচার্যের বাসভবনে আলাপ করে ফিরে আসার পর বেলা ৩টায় শফিউল আলম চৌধুরীর মোবাইল ফোনে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন আন্দোলনকারীরা। মোবাইল ফোনের লাউড স্পিকারে তাদের আলাপকালে গণমাধ্যমকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। আলাপকালে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি শিক্ষার্থীদের বলেন, ‘আমরা চাই আমাদের সন্তানরা ভালো থাকবে। তাদের যেন কষ্ট না হয়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও ঠিক থাকবে। আপনারাও ওখানে কষ্ট করছেন এটা দেখছি, অন্যান্য সমস্যা হচ্ছেও, সেটাও দেখছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপার আছে। আমরা তাতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে চাই না। তবে শিক্ষার্থীরাও কষ্ট পাবেন এটাও চাই না। সব সমস্যারই একটা সমাধান আছে। এ সমস্যারও নিশ্চয়ই সমাধান আছে। আলোচনার মাধ্যমেই সেই সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের চার-পাঁচজন যদি আসেন, শিক্ষক সমিতির নেতারা যদি আসেন, তবে আমরা আলাপ করে একটা সমাধানে পৌঁছতে পারব। আপনারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে আসবেন, পরে নিজেদের মধ্যে যেন ঝামেলা না হয়।’

শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলাপকালে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘আমরা শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী। আজ (গতকাল) সন্ধ্যার আগেই আমাদের সাতজন প্রতিনিধি আলোচনার জন্য নির্বাচন করা হবে। আশা করছি, মন্ত্রী আমাদের দাবি মেনে নেবেন। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হলেও আমাদের অনশন যথারীতি চলবে।’

তবে সন্ধ্যা ৬টার দিকে আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র শাহরিয়ার আবেদিন দেশ রূপান্তরকে জানান, অনশনকারীরা গুরুতর অসুস্থ, তাই তাদের এভাবে রেখে ঢাকায় যেতে পারছেন না। তবে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে চান তারা। হতে পারে সেটা ভার্চুয়ালি। তারা শিক্ষামন্ত্রীকে আহ্বান জানান যেন তিনি সিলেটে এসে এখানকার বর্তমান চিত্র দেখেন এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। এ বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীর দূত হিসেবে আসা শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।

গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় নাদেল আবার ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের কাছে আসেন। এ সময় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী এখানে আসতে চাচ্ছেন। তবে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে তিনি দুয়েক দিনের মধ্যে আসতে পারছেন না। কিন্তু তিনি আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি শিক্ষার্থীরা যতজন চায় তারা ঢাকায় আলোচনায় বসতে পারবেন বলে জানিয়েছেন।’

শিক্ষার্থীরা তখন জানান, ভিসি তাদের ওপর বোমা মেরেছে, গুলি করেছে, পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। এগুলো সবই প্রমাণিত। তারা অসুস্থ অনশনরত ভাইবোনদের রেখে ঢাকায় যেতে পারেন না। ঢাকায় না গিয়ে অনলাইনে আলোচনায় বসতে চান তারা।

এ সময় নাদেল বলেন, ‘আসলে অনলাইনে তো সব বিষয়ে আলোচনা হয় না। সামনাসামনি অনেক বিষয় উঠে আসে, এজন্য শিক্ষামন্ত্রী সামনাসামনি বসতে চাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের ঢাকায় যেতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তবে সরাসরি কথা বললে বিষয়টি ভালোভাবে সমাধান হতো।’

সবশেষে ঢাকা যাওয়ার বিষয়টি অমীমাংসিত রেখেই আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলকে চলে যেতে হয়।

দ্রুত অবনতি হচ্ছে অনশনরতদের স্বাস্থ্যের : আন্দোলনরতদের চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক দলের প্রধান ডা. নাজমুল হাসান দেশ রূপান্তরকে জানান, অনশনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে। তিন ধরে কিছু খায়নি তারা। তাদের পানি শূন্যতার কারণে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এখানে যাদের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে তাদের স্যালাইন ও ওষুধের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যখন কোনো জরুরি অবস্থা তৈরি হচ্ছে তখনই হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

সংহতি শাবিপ্রবির সাবেক ও মহানগর ছাত্রলীগ নেতাদের : উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে আছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সহসভাপতি মঞ্জুর মোরশেদ অসীম। এছাড়াও সমর্থন ও সংহতি জানিয়েছেন শাবির সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা ও সিলেট মহানগর ছাত্রলীগ। আর অনশনকারীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগের সদস্যরা।

শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূত্রপাত গত ১৩ জানুয়ারি। ওইদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের কয়েকশ ছাত্রী। গত শনিবার সন্ধ্যার দিকে হলের ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ। পরে গত রবিবার বিকেলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। তখন পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা ও তাদের লক্ষ্য করে শটগানের গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। ওইদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ও শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার ঘোষণা দিলেও শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে উপাচার্যের পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, খুলনা ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত