বর্ষায় খাল উদ্ধারের সুফল পাবে নগরবাসী

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২:৪৯ এএম

বছরখানেক আগেও রাজধানী ঘিরে থাকা ৫৮ খালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে খানিকটা চিন্তিত ছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে নানা হিসাবনিকাশে খাল রক্ষণাবেক্ষণের ভার পড়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাঁধে। দায়িত্ব পেয়েই নিজস্ব অর্থায়নে ব্যাপক কর্মতৎপরতা শুরু করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। ডিএনসিসির ভাগে আসা ২৬টি খালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও বর্জ্য অপসারণ কাজ চলে বিরতিহীনভাবে। উদ্ধার হতে থাকে যুগের পর যুগ বেদখল হয়ে থাকা সরকারি খালের জমি। এরই ধারাবাহিকতায় ডিএনসিসি গত তিন-চার দিনের অভিযানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার রামচন্দ্রপুর খালটি নকশা অনুযায়ী উদ্ধার করেছে।

ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম নিজেই উপস্থিত থেকে সেখানে দিনভর অভিযান পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় বহুতল ভবন আর প্রভাবশালীদের ট্রাক টার্মিনালও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। একদিকে খাল উদ্ধার আর অন্যদিকে খননকাজ চলছে সমানতালে। করপোরেশনের এমন কর্মতৎপরতা বেশ আশা জাগাচ্ছে নগরীর সাধারণ মানুষ ও নগরপরিকল্পনাবিদদের মধ্যে। আসছে বর্ষায় জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল উদ্ধারের সুফল দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সিটি করপোরেশন থেকে মোট ২৬টি খাল বুঝে পেয়েছি। খালগুলো পাওয়ার পর গত এক বছর ধরে নিজস্ব অর্থায়নে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে। অনেক প্রভাবশালী মহলের দখলে থাকা খালের অংশ আমরা উদ্ধার করেছি। রামচন্দ্রপুর খালটি উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে খননকাজও চলছে। যদিও খালটি এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রয়েছে।’

অন্যদিকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীতে অবৈধভাবে দখল হওয়া সমস্ত খালকে উদ্ধার করে তা সংস্কার করা হলে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি নগরবাসীকে একটি আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন ও বাসযোগ্য নগর উপহার দেওয়া সম্ভব হবে। যারা সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই এখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে সব জায়গায় একটি বার্তা চলে যাবে যে, অবৈধভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করে রেহাই পাওয়ার সুযোগ নেই। আমরা সকল খালের একটির সঙ্গে অন্যটির সংযোগ তৈরি করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট চালু করব। এভাবে ঢাকা শহরের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতেই হবে।’

ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই কল্যাণপুর খাল, ইব্রাহিমপুর খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, গোদাগাড়ী খাল ও রূপনগর খালসহ করপোরেশনের পরিষ্কার অভিযানে ১৪টি খাল থেকে গত দেড় মাসে ৯ হাজার ৩০০ টন বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। এ উদ্ধার অভিযানের কারণে অনেক খাল আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। এতে আগামী বর্ষায় জলাবদ্ধতার ভোগান্তি থেকে নগরবাসী অনেকটাই রেহাই পাবে। এসব পরিষ্কার অভিযানে প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। যার পুরোটাই করপোরেশনের নিজস্ব অর্থ। গত কয়েক দিনের অভিযানে রামচন্দ্রপুর খালের বুড়িগঙ্গা অংশ থেকে শুরু করে চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকা পর্যন্ত খালের আগের অবস্থা ফিরিয়ে আনতে বিস্তৃত পরিসরে কাজ করেছে করপোরেশন।

ডিএনসিসির কর্মকর্তারা আরও জানান, অভিযানে মোহাম্মদপুরের বছিলা থেকে বাড়ইখালী পর্যন্ত থাকা খালের অংশ অবৈধ দখলের চিত্র পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বছিলার লাউতলা বাজার এলাকায় খালের প্রায় ২০০ মিটার অংশের অস্তিত্বই নেই। সেখানে খাল ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছিল অবৈধ ট্রাক টার্মিনাল। সেখানেও ডিএনসিসি উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ট্রাক টার্মিনালটি ভেঙে দেয়।

এলাকাবাসী জানায়, বছিলা ও ঢাকা উদ্যানসহ আশপাশে যেকোনো মাত্রার বৃষ্টি হলেই পানি জমত। মোহাম্মদপুর-বছিলা সড়কে বটতলা কালভার্ট এলাকায় খালের প্রায় ২০০ মিটার অংশ আবর্জনা, বালু ও মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছিল। ভরাট করা জায়গায় টার্মিনাল তৈরি করে ট্রাক রাখা হতো। টার্মিনালের ভেতরে টিনের বেশকিছু দোকান নির্মাণ করা হয়েছিল। এ ছাড়া খালের অংশ ভরাট করে দ্বিতল একটি ভবন বানিয়ে ট্রাকচালক ইউনিয়নের সমিতি করা হয়েছিল। এসব কিছু ভেঙে দিয়েছে ডিএনসিসি। এখন বৃষ্টি হলে খুব সহজেই পানি নেমে যাবে।

নগরপরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালের সীমানা ও নাম নিয়ে কিছুটা ভিন্নমত রয়েছে। আবার সংখ্যার ক্ষেত্রেও বেসরকারিভাবে ঢাকায় ৭৩টি খালের কথা বলা হচ্ছে। আবার সরকারি হিসাবে খালের সংখ্যা ৫৮টি। যা আছে তাই সিএস ও আরএস মেনে উদ্ধার হলে ভালো হয়। এর আগে খালে কিছুটা অভিযান চালানো হলেও তা স্থায়ী হয়নি। এবার মনে হয় একটু ভিন্ন। কারণ তারা (ডিএনসিসি) উদ্ধারের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে। কীভাবে এগুলোকে গণপরিসর (উন্মুক্তস্থান) করা যায়। ফলে উত্তর সিটি করপোরেশনের এবারের অভিযান ভালো কিছু ফল দেবে বলে বিশ্বাস করি।’

যত প্রতিবন্ধকতাই থাকুক না কেন প্রত্যেকটি খাল উদ্ধার করা হবে জানিয়ে ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যত প্রতিবন্ধকতাই থাকুক না কেন জনগণের সহায়তায় জিআইএস ম্যাপ অনুযায়ী প্রত্যেকটি খালই উদ্ধার করা হবে। টানা ৩ দিনের অভিযানের ফলে অস্তিত্বহীন লাউতলা খালটি এখন দৃশ্যমান। বছিলাবাসীর স্বার্থেই প্রায় আড়াই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট লাউতলা খালটিকে বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত করে এতে পানি প্রবাহের সৃষ্টি করা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত