মুক্তিযুদ্ধের দু-বছর পরে খুলনা থেকে ‘কথা’ নামের কথাসাহিত্যের একটি অনিয়মিত সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পাদক হাসান আজিজুল হক ও অসিতবরণ ঘোষ। প্রকাশ সাল ১৩৮১, অর্থাৎ ১৯৭৪। এই সংখ্যায় হাসান আজিজুল হকের ‘নামহীন গোত্রহীন’ (১৯৭৫) বইয়ের একটি গল্প ‘কেউ আসেনি’ ছাপা হয়েছে। হাসান আজিজুল হকের খুলনাপর্বের তখন প্রায় শেষ, এর কিছুদিন পরে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিরতরে খুলনার পাট চুকিয়ে রাজশাহীতে চলে যান। প্রথমে কর্মসূত্রে, পরে স্থায়ী হন সেখানে। এখন আর মিলিয়ে দেখারও সুযোগ নেই যে হাসান আজিজুল হক সম্পাদিত ‘কথা’ নামের কাগজটির আরও কোনো সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল কি না।
হাসান আজিজুল হকের খুলনাপর্ব নিয়ে ‘কথা’ পত্রিকার সংখ্যাটির সূত্রে এ কথাগুলো তোলার ভিন্ন একটি কারণ আছে। বর্ধমানের যবগ্রাম থেকে মেট্রিক পাসের সনদ নিয়ে দেশভাগ-উত্তর পূর্ব বাংলার দক্ষিণে খুলনায় এসেছিলেন তিনি, ১৯৫৪ সালে। লিখবেন কিংবা লেখক হবেন এমন কোনো আকাক্সক্ষা কিংবা ব্রত তখনো পর্যন্ত তার ভেতরে তেলেজলে বেড়ে ওঠেনি, অন্তত তিনি জীবনের ওই পর্ব যেভাবে আত্মজৈবনিক লেখাপত্রে যেভাবে বর্ণনা করছেন। খুলনার ব্রজলাল কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রত্ব, পাকিস্তানবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত থাকায় সরকারি পেটোয়া বাহিনী কর্তৃক আহত হওয়া, রাজশাহী কলেজে অনার্স পড়তে যাওয়া, কাছাকাছি সময়ে মানিক স্মৃতি উপন্যাস প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও বিচারকম-লীর দৃষ্টি আকর্ষণ। এসব একটার পরে একটা ঘটছে। হাসান আজিজুল হকের লেখক হওয়ার বিষয়টি যদি বিখ্যাত ‘সমকাল’ পত্রিকায় ‘শকুন’ (১৯৬০) থেকে ধরা হয়, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে তিনি কলেজ শিক্ষকতায় যুক্ত হয়েছেন।
যদি তখন হাসান আজিজুল হক লেখক হিসেবে নিজের কাজ স্থির করে নিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে একটি বিষয় এখানে সহজে নজরে পড়ে যে, ‘শকুন’-এর কাহিনীর মূল পটভূমি উত্তর বাংলা, অর্থাৎ রাঢ়। হাসান আজিজুল হক সম্পর্কে পরবর্তীকালে একথাও বলা হয় যে, তিনি রাঢ়বঙ্গের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। এর কারণ সেই ‘শকুন’সহ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’ (১৯৬৪) পর্বের আরও কিছু লেখা, আর শেষ পর্বের, ‘আগুনপাখি’ ও ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’ও রাঢ়ের পটভূমিতে, মাঝখানে ‘জীবন ঘষে আগুন’-এর নামগল্পটিও। কিন্তু ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত, যে কালে হাসান আজিজুল হকের গদ্যলেখক হিসেবে উত্থান, এ পর্বের যেগুলোকে তার প্রতিনিধিত্বশীল গল্প হিসেবে ধরা হয়ে থাকে, সেগুলোর পটভূমি খুলনা। কোনো কোনোটির পশ্চাৎপট হিসেবে রাঢ় বা পশ্চিমবঙ্গ থাকলেও খুলনা সেখানে দগদগে। এমনকি সে সময়ের যে লেখাটিকে তিনি পরে বলতে গেলে অস্বীকারই করেছেন, সেই ‘বৃত্তায়ন’-এর ভূগোলও খুলনা। নভেলা ‘বৃত্তায়ন’কে হাসান আজিজুল হক সে সময়ে কেন ‘অস্বীকার’ করেছিলেন, পরে ওটি যখন স্বতন্ত্র বই হিসেবে যখন প্রকাশিত হয়, সে ভূমিকায় জানিয়েছেন। ইমতিয়ার শামীমের একটি লেখার কথা মনে পড়ছে। সেই কলামটির শিরোনাম ছিল: ‘কুয়াশার অন্তর্গত’। তার একটি ছোট্ট ভুক্তিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘বৃত্তায়ন’ সম্পর্কে। সেই লেখায় শামীম মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, হাসান আজিজুল হক এই মধ্য আশির দশকে এসে ‘বৃত্তায়ন’ লেখার সেই কলম হারিয়ে ফেলেছেন। সেদিক থেকে ‘বৃত্তায়ন’ হয়তো সময়ের চেয়ে এগোনো লেখা, অথবা, বাংলাদেশের বাস্তবতায় গত শতকের তিরিশের দশকের ইউরোপীয় দার্শনিকতায় উজ্জীবিত ‘অপ্রয়োজনীয়’ লেখা। সেটি ষাটের দশকের বাংলাদেশে কিংবা উপনিবেশিত পূর্ব পাকিস্তানের একজন কথাসাহিত্যিকের জন্যে স্বদেশ-এড়ানো পলায়নপরতার গল্প। এসব হাসান আজিজুল হক ওই বইয়ের ভূমিকায় স্বীকারও করেছেন। কিন্তু, যে কোনো কাহিনীগদ্যে স্রষ্টা যতই পটভূমিজনিত চাপ লেপে-পুছে দিতে চান না কেন, একটু খেয়াল দিলেই ভাষায় ওই কাহিনীর জায়গা জমি মানুষ বুঝে নেওয়া যায়। সেদিক থেকে ‘বৃত্তায়ন’ যতই পলায়নপরতার গল্প হোক না-কেন, এর পটভূমি ষাটের দশকের খুলনা।
এখান থেকে কথা ধরে টেনে নিয়ে গেলে, যেকথা বলার জন্য এতক্ষণের কথাগুলো প্রায় ভূমিকার মতন করে তোলা হলো, সে কথাটি বলা যাক। হাসান আজিজুল হকের প্রথম দিকের গল্পের আবছা রাঢ়দেশ বাদ দিলে, স্থিরীকৃত পটভূমি আছে একমাত্র খুলনা পর্বের গল্পগুলোতে। দুই-চারটি উদাহরণ ‘মন তার শঙ্খিনী’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘পরবাসী’ কিংবা ‘আমৃত্যু আজীবন’। না, শুধু সংলাপ থেকে বিষয়টি বোঝার নয়, কাহিনীর সঙ্গে জড়ানো প্রকৃতি আর ভূগোলসমেত বিষয়টি ভাবতে হবে। এমনকি, ‘নামহীন গোত্রহীন’র ‘ভূষণের একদিন’,
‘কৃষ্ণপক্ষের দিন’ অথবা ‘ঘর গেরস্থি’ ইত্যাদি। সেই সময়ের দিনযাপনের অন্য একটি ভাষ্য পাওয়া যায় ‘একাত্তর: করতলে ছিন্নমাথা’য় (১৯৯৫)। সে বই অবশ্য ‘নামহীন গোত্রহীন’-এর প্রায় দুই দশক বাদে প্রকাশিত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরে প্রকাশিত ‘নামহীন গোত্রহীন’-এর ওই গল্পগুলোর পাত্রপাত্রী যে ভূগোলে দিনযাপন করে তা দক্ষিণবঙ্গের, খুলনা-বাগেরহাটের, ‘আমৃত্যু আজীবন’ এরটা খুলনার চেয়ে হয়তো বেশি সাতক্ষীরার। অমন বাদাবনময় নোনাজমির ভূগোলকে আলাদা আলাদা জেলা কিংবা নদীনালা দিয়ে পৃথক করার মতন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু, যখন যে লেখা প্রায় ভূগোলনিরপেক্ষ বলে মনে হয়, পটভূমিজনিত কোনো বিষয় এর সঙ্গে প্রায় থাকেই না, সেই লেখারও তো পটভূমিও তো কোনো না কোনোভাবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন, ‘খাঁচা’ কিংবা ‘পরবাসী’ ইত্যাদি। এর মাঝখানে ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’কে বর্ধমান ও খুলনা জড়াজড়ি করে আছে। এমন দেখা থেকে লেখা বই বাংলা ভাষায় খুব বেশি লেখা হয়নি।
এদিকে, হাসান আজিজুল হকের গল্পচর্চাকে যেভাবে ভূগোলচিহ্নিত করে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে, তা দিয়ে একটি বিষয় মোটামুটিভাবে বুঝতে চেষ্টা করা যায়, কখনো দেশকালহীনতা কখনো দেশকালময়তা তার গল্পচর্চার ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার বিঘœ সৃষ্টি করেছে কি না। মোটা দাগে একটি বিষয় তো দেখাই যাচ্ছে যে, ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’ থেকে ‘নামহীন গোত্রহীন’ পর্যন্ত তার এই চারটি বই মোটামুটি পর-পর, এবং প্রকাশিতও হয়েছে দশ-এগারো বছরের (১৯৬৪-৭৫) ভেতরে। এর পটভূমি, রাঢ়ের গল্পগুলোকে পাশে সরিয়ে রাখলে বাকি-সব দক্ষিণবঙ্গ। আর, রাঢ়ের গল্পগুলোয় হাসান আজিজুল হক প্রকৃতির বর্ণনা একটু কমই। হয়তো ততদিনে উঁকি দিয়ে উলটো ফিরে দেখা সেই দিগন্তের অনেকখানিক কাহিনীগদ্যের জন্য তার হাত থেকে লেপে-পুছে গেছে। আশির দশকের মাঝামাঝিতে হাসান আজিজুল হক ষাটের দশকে ‘বৃত্তায়ন’ লেখার সেই কলমকে পেছনে ফেলে এসেছেন বলে যেভাবে ইমতিয়ার শামীম উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু এই চারটি বইয়ের পরে পঞ্চম বই ‘পাতালে হাসপাতালে’তে সেই পটভূমিজনিত বিষয়টি খানিকটা যেন সরে যেতে শুরু করে। ‘আমরা অপেক্ষা করছি’ কিংবা ‘মা-মেয়ের সংসার’, বাংলাদেশের পশ্চিম দিকের উত্তর-দক্ষিণ মিলিয়েই। হয়তো এরপরে আর কখনোই, এমনকি ‘ঘের’ বা ‘সম্মেলন’ ইত্যাদি গল্পের ক্ষেত্রেও হাসান অজিজুল হক সেভাবে আর ভূগোলনির্দিষ্ট হননি। কিন্তু যেই তিনি উপন্যাস বা দীর্ঘ কাহিনী রচনা করার প্রয়াস নিয়েছেন, তখনই রাঢ়ের দিকে তাকিয়েছেন। ততদিনে তিনি আর ছোটগল্প রচনায় নিজস্ব প্রয়াসে প্রায়শ যুক্ত নেই।
এই যে কথাগুলো এতক্ষণ তোলা হয়েছে, এটি এই জন্য যে হাসান আজিজুল হকের মতন একজন গদ্য লেখকের গল্পগুলোকে মোটামুটি প্রকাশ সন অনুযায়ী পাশাপাশি রেখে পড়ে গেলে যে জিনিসটা খুব তীব্রভাবে ধরা পড়ে, তা হলো কৈশোরক রাঢ়ের দিনগুলো বাদে, যুবক হাসান তার খুলনাপর্বের গল্পগুলোতে অনেক বেশি অথবা অনেকাংশ জায়গা জমি মানুষহ উপস্থিত। যখন রাঢ়, তখনই গল্পের বা কাহিনীর সময় একটু পেছনের দিকের, কিন্তু সেই ষাট থেকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী মধ্য সত্তর পর্যন্ত তিনি খুলনা অঞ্চলকে উপভাষাসহ কলমে গেঁথে নিতে পেরেছেন। খুলনা থেকে রাজশাহীতে থিতু হওয়ার পরে যেমন তিনি খুলনার পটভূমিতে সেভাবে ফেরেননি, একইসঙ্গে রাজশাহী নগরের বাইরের গল্পও বলতে গেলে প্রায় লেখেননি। বিষয়টি কয়েকভাবে কয়েকবার এই জন্য তোলার চেষ্টা করা যে, হাসান আজিজুল হক তার অসংখ্য সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন, তিনি সেই মানিক স্মৃতি পুরস্কারে ‘শামুক’ নামের ছোট্ট উপন্যাসটি জমা দেওয়া থেকে সারাটি জীবনভর উপন্যাসই লিখতে চেষ্টা করেছেন। যদি ‘আগুনপাখি’কে তার উপন্যাসের চেষ্টা হিসেবে ধরা যায়, তাহলে প্রায় সত্তর বছরের বয়েসের কাছাকাছি এই লেখা প্রকাশিত, অথচ ‘শামুক’ রচনার সময়ে হাসান আজিজুল হকের বয়েস কুড়ি বছরেরও নিচে। মাঝখানে সময় প্রায় পঞ্চাশ বছর। এর কারণ কি এই যে, বারবার নিজস্ব ভূগোলহীনতা?
কেননা, আত্মজা ও একটি করবী গাছে ততটা ধরা না-পড়লেও, ‘আমৃত্যু আজীবন’ কারও কারও মতে হাসান আজিজুল হকের শ্রেষ্ঠ গল্প, এই ভূগোলের বিস্তৃতি তিনি মধ্য ষাটের দশকে যখন ধরছেন, কিংবা মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পগুলোতে যেভাবে জনপদ ধরা পড়ে, সেই পটভূমি ও ভূগোলনির্ভর অমন অভিজ্ঞতা থাকবার পরও হাসান আজিজুল হক সেখান থেকে যেমন সরে গেলেন, এমনকি এই পটভূমিতে তিনি কোনো উপন্যাসও লেখেননি, লিখবার পরিকল্পনা করেছেন নিকটজন এমনও বলেননি। ‘শিউলি’ কিংবা ‘তরলাবালা’ নামের কাহিনীগুলোকে তার উপন্যাস রচনার প্রয়াস হিসেবে ধরছি। সেখানে নির্দিষ্ট পটভূমির কোনো ব্যাপ্তি কিন্তু ধরা পড়েনি।
গোটা বিষয়টাই প্রশ্ন উত্থাপন। গল্পলেখক থেকে ঔপন্যাসিকের যাত্রাপথে, কিংবা যদি নিজের কাছে একটু সহজ করার জন্য ধরে নিই যে, যে কোনো ধরনের কাহিনীগদ্য, ইংরেজিতে যাকে মোটামুটি ফিকশন বলা যায়, সেখানে নির্দিষ্ট ‘ভূগোল’ কথাসাহিত্যিকের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। হাসান আজিজুল হকের ক্ষেত্রে, তার প্রথম যৌবনে যে ভূগোল ধরা দিল, হাতে এলো, ষাটের দশকে ও সত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকার পরে, হাসান আজিজুল হক আর সেখানে ফিরলেন না কেন? ফিরলেন না, নাকি ফিরতে পারলেন না? নাকি, ইমতিয়ার শামীমের ওই প্রশ্নটিই এখানে তোলা যায় যে, বৃত্তায়ন লেখার মতন এখানেও ‘আমৃত্যু আজীবন’-এর পটভূমিজনিত বিস্তৃতি হাসান আজিজুল হক হারিয়ে ফেলেছেন। এর পাশাপাশি আর একটি বিষয়ও ভাবা যেতে পারে। পাকিস্তানের উপনিবেশে স্বদেশকে যেভাবে খোঁজা যায়, স্বাধীন ভূখন্ডে সে দেখাটা হারায়?
লেখক কথাসাহিত্যিক
