বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ জরুরি

আপডেট : ২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০০ পিএম

বিগত কয়েক বছর ধরেই রাজধানী ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর পাঁচটি মহানগরের একটি। শুধু তা-ই নয়, বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে ২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশ হিসেবে এক নম্বর অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। আর মহানগরের তালিকায় দিল্লির পরেই রয়েছে ঢাকার নাম। ঢাকা কয়েক বছর ধরেই এই অবস্থানে রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে ওই বছর ঢাকার বায়ু বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২০০ দিনের চেয়েও বেশি সময়জুড়ে অনিরাপদ বা অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাজধানীর স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক গবেষণা থেকে জানা গেল চলতি জানুয়ারি মাসে এক দিনও নির্মল বায়ু পায়নি ঢাকা মহানগর। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে ঢাকায় গড় বায়ুদূষণের পরিমাণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজ এই দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বলে মনে করছেন গবেষকরা।

দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত ‘জানুয়ারিতে এক দিনও নির্মল বায়ু পায়নি ঢাকা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুদূষণবিষয়ক গবেষণার কথা তুলে ধরা হয়। বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘বিপজ্জনক মাত্রায় ঢাকার বায়ুদূষণ : জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে ক্যাপসের এই গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়। আয়োজকরা জানান, গবেষণা কেন্দ্রটি ২০২১ সালে ঢাকা শহরের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বায়ুমান নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে। এতে দেখা গেছে, ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য নির্মাণ খাত ৩০ শতাংশ দায়ী। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বায়ুদূষণ হচ্ছে ইটভাটা ও শিল্পকারখানার মাধ্যমে। যার হার ২৯ শতাংশ। বায়ুদূষণের তৃতীয় সর্বোচ্চ কারণ হলো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, যার হার ১৫ শতাংশ।

ঢাকার বায়ুদূষণ প্রসঙ্গে ক্যাপসের পরিচালক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানিয়েছেন, চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত বায়ুমানের সূচক ২১৯.৫৯ এসে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে চলতি মাসে ঢাকার মানুষের এক দিনের জন্যও ভালো বায়ু সেবন করার সৌভাগ্য হয়নি। বায়ুমান বেশিরভাগ সময় খুবই অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ছিল। ঢাকা শহরের ১০টি স্থানের গবেষণার বরাত দিয়ে এই অধ্যাপক জানান, ২০২১ সালে ঢাকা শহরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষিত ছিল তেজগাঁও এলাকা। এখানে প্রতি ঘনমিটার বায়ুতে বস্তুকণা ছিল ৭০ মাইক্রোগ্রাম। এর পরের অবস্থানে ছিল শাহবাগ এলাকা। এখানে প্রতি ঘনমিটারে বস্তুকণা ছিল ৬৮ মাইক্রোগ্রাম। গবেষণা অনুযায়ী, এর পরের অবস্থাগুলোতে ছিল আহসান মঞ্জিল, আবদুল্লাহপুর, মতিঝিল, ধানমন্ডি ৩২, সংসদ ভবন, আগারগাঁও, মিরপুর ১০ এবং গুলশান ২ এলাকা। এই গবেষণার ফল ঢাকা মহানগরের বায়ুদূষণের যে চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে সেটা অবশ্যই সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবারই গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া দরকার। 

বলাবাহুল্য, প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের আবাসস্থল বিশে^র সবচেয়ে বেশি জনঘনত্বের এই ঢাকা মহানগরীতে অব্যাহত পরিবেশ দূষণের ফলেই এখানকার বায়ুর মান এত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ যে ঢাকায় বায়ুদূষণের নেপথ্যে মূল কারণ এই কথাও নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স-বিআইপি মনে করে, একটি আদর্শ নগরের মোট আয়তনের সর্বোচ্চ ৬০ ভাগে ভবন ও সড়কের অবকাঠামো থাকতে পারে। সবুজ থাকতে হবে অন্তত ২৫ ভাগ এবং মুক্ত জলাশয় বা নদী-খাল-লেক থাকতে হবে অন্তত ১৫ ভাগ। উল্লেখ করা দরকার, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস’ এক গবেষণায় জানিয়েছিল, ১৯৮৯ সালেও ঢাকা শহরের ১৭ শতাংশ এলাকা ছিল সবুজ গাছপালায় ঘেরা। কিন্তু ২০২০ সালে অর্থাৎ মাত্র ৩০ বছরে ঢাকায় সবুজের পরিমাণ মাত্র ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, কাক্সিক্ষত মানের চেয়ে গাছপালা বা সবুজের পরিমাণ এবং পানি বা জলাশয়ের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া এই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটাচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, ঢাকায় এখন ক্ষমতার চেয়ে তিন থেকে চারগুণ বেশি স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। এছাড়া শিল্পকারখানার বর্জ্য এবং মাত্রাতিরিক্ত যানবাহনের ক্ষতিকর কালো ধোঁয়া ঢাকার বায়ুদূষণ প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে চলেছে। অন্যদিকে গ্রিন পিসের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বায়ুদূষণজনিত রোগে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৯৬ হাজার শিশুর অকালমৃত্যু হয়েছে। বছরে ৪০ লাখ মানুষ অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসছে চিকিৎসা নিতে। এমন উচ্চমাত্রার বায়ুদূষণ বন্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নির্বিকার থাকতে পারেন না। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো বায়ুদূষণ বন্ধে কেন জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত