‘মাসুদ রানা’র স্বত্ব ও কিছু আইনি প্রতর্ক

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১১:০১ পিএম

সদ্যপ্রয়াত কাজী আনোয়ার হোসেনের স্পাই থ্রিলার সিরিজ ‘মাসুদ রানা’র প্রধান চরিত্রটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে- ‘টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না’। এমআর-৯ নামেও পরিচিত বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের দুর্ধর্ষ স্পাই মাসুদ রানা বাঁধনে না জড়ালেও স্বয়ং রানাকেই বাঁধনে জড়িয়ে নিজের করে নেওয়ার নানান প্রচেষ্টার মধ্যে সর্বশেষ উদ্যোগটির আপাত সাফল্য দেখেই কাজীদাকে এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হয়েছে। কর্কট রোগে নীল হওয়া অন্তিম সময়গুলোতে নিজের ব্রেইনচাইল্ডকে অন্যের হতে দেখাটা যে নিদারুণ শক্তিশেল হয়ে তার বুকে বিঁধেছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এই ব্যাপারটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটে যায় তখনই যখন ‘মাসুদ রানা’ ও আরেকটি ফ্র্যাঞ্চাইজ ‘কুয়াশা’র কপিরাইট-রয়্যালটি ইত্যাদি নিয়ে খোদ ফ্র্যাঞ্চাইজ দু’টিরই স্রষ্টা কর্তৃক স্বীকৃত প্রধান ‘নেপথ্য লেখক’ শেখ আবদুল হাকিমের কপিরাইট লঙ্ঘন ও প্রণেতার মিথ্যা কর্তৃত্বারোপের দায়ে কাজী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার অব কপিরাইট-এর কাছে দাখিল করা দরখাস্তটি যেভাবে নিষ্পত্তি করেছেন তাতে দেখা যায় যে ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ ফ্র্যাঞ্চাইজের যথাক্রমে ২৬০ ও ৫০টি বইয়ের প্রকৃত প্রণেতা হচ্ছেন শেখ আব্দুল হাকিম, গ্রন্থগুলোতে প্রণেতা হিসেবে মুদ্রিত কাজী আনোয়ার হোসেন নন। এভাবে শেখ আব্দুল হাকিম মাসুদ রানা’র নেপথ্য লেখক থেকে ‘লেখক’-এ উন্নীত হন।

সেবা প্রকাশনীকেন্দ্রিক নানান স্বাদের বই ও পত্রপত্রিকার জন্য কাজী আনোয়ার হোসেন এদেশের কয়েকটি প্রজন্মের হৃদয়ের খুব কাছে থাকায়, মাসুদ রানা’র স্বত্ব বদলে যাওয়ার ব্যাপারটি নিদারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বলাই বাহুল্য যে, শেখ আবদুল হাকিমও অসংখ্য রানা/সেবাভক্তের মনে ঠাঁই নিয়ে আছেন। প্রসঙ্গত, বলে রাখা দরকার যে, কাজী আনোয়ার হোসেনের মাস চারেক আগে শেখ আবদুল হাকিমও প্রয়াত হন।

সেই ডামাডোলের মধ্যেই কাজী আনোয়ার হোসেন নিবন্ধকের এহেন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট মামলা দায়ের করলে সাধারণত যেটা হয়, আদালত নিবন্ধকের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে দেন মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত। এরপর ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে থাকে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সেদিনই আবার শোরগোল পড়ে যায় যখন উচ্চ আদালত রেজিস্ট্রারের সিদ্ধান্তে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশ বাতিল করে রিট মামলাটি খারিজ করে দেন। খবরের কাগজ ও সামাজিক মাধ্যমগুলো বড় বড় শিরোনাম করে এই বলে যে- আদালতও মাসুদ রানার স্বত্ব  শেখ আবদুল হাকিমকে দিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

চিরবন্ধনহীন বলে খ্যাত মাসুদ রানা যখন আইন-আদালতের পাঁকেচক্রে পড়ে এ-হাত থেকে ও-হাতে লোফালুফি খেলায় জেরবার, তখন রেজিস্ট্রারের ১৪.০৬.২০২০ তারিখের সিদ্ধান্ত, হাইকোর্ট বিভাগের ১৩.১২.২০২১ তারিখের রায়, কপিরাইট আইন, ২০০০, কপিরাইট বিধিমালা, ২০০৬-সহ সম্পর্কিত নানান আইনি প্রতর্কের আলোকে মাসুদ রানা’র স্বত্বের তত্ত্বতালাশ করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। রেজিস্ট্রারের সিদ্ধান্ত ও আদালতের রায়Ñ উভয়ই প্রকাশিত হওয়ার পর গণসম্পত্তিতে পরিণত হয়। ফলে, তার বিশ্লেষণে আইনগত কোনো বাধা নেই এখন।

আদালতেও মাসুদ রানা’র কপিরাইট শেখ আবদুল হাকিম পেয়েছেন মর্মে খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং মূলত সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে সবাই সেটাই সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। কপিরাইট আইনানুসারে ক্ষেত্রভেদে ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট, দায়রা জজ ও জেলা জজ আদালতই হচ্ছে কপিরাইটের মামলা দায়ের ও বিচারের আদালত আর হাইকোর্ট বিভাগ কেবলই আপিল আদালত। অথচ যে একটিমাত্র রায়ের কথা সবাই বলছেন তা দিয়েছেন কেবল হাইকোর্ট, সেহেতু শুরুতেই হাইকোর্টের রায়টিই পড়ে দেখা বিধেয় যে বিচারিক আদালত না হওয়া সত্ত্বেও ঠিক কীভাবে তারা মাসুদ রানা’র স্বত্ব শেখ আবদুল হাকিমকে দিয়েছেন।

রায়টি পড়ে ভ্যাবাচেকা খেতে হয় এটা দেখে যে, কোন সে ভোজবাজি যাতে রুমালটি বেড়াল হয়ে গেল খবরের কাগজগুলোতে? কারণ, মাসুদ রানা’র স্বত্ব নিয়ে আদালত এখনো পর্যন্ত  কোনো ধরনের রায় দেয়নি। রায় দেওয়ার কথাও না। কারণ, আজ পর্যন্তও দেশের কোনো আদালতেই মাসুদ রানা’র স্বত্ব নিয়ে কেউ কোনো মামলা দায়ের করেননি। হাইকোর্টে কাজী আনোয়ার হোসেন একটি রিট মামলা দায়ের করেছেন এই বলে যে, রেজিস্ট্রার এখতিয়ার বহির্ভূত ও বেআইনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তাই এটা বাতিল করতে হবে। সেখানে মাসুদ রানা’র স্বত্ব নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়নি। হাইকোর্ট রায় দিয়েছে যে, এই বিষয়ে রিট মামলা চলে না। কারণ, রিট একটি বিশেষ সাংবিধানিক অধিকার।

যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয়ে বিকল্প প্রতিকার থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত রিট মামলা করা যায় না। রেজিস্ট্রার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এর বিরুদ্ধে প্রতিকারের ব্যবস্থা কপিরাইট আইনেই আছে। সেই প্রতিকারটা হলো- কাজী আনোয়ার হোসেনকে নিবন্ধকের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে কপিরাইট বোর্ডের কাছে। বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবার আপিল করা যাবে হাইকোর্ট বিভাগে। আইনের এসব পর্যায় শেষ করার প্রসঙ্গ টেনেই হাইকোর্ট রিট খারিজ করে দেয়। ফলে, আদালত মাসুদ রানা’র স্বত্ব অন্য কাউকে দিয়েছে, এমন সংবাদ একেবারেই সঠিক নয়।

এবার নিবন্ধকের সিদ্ধান্তটির লিখিতরূপ পর্যালোচনা করা যাক। তা পাঠের শুরুতেই জানা যায় যে, কপিরাইট আইন, ২০০০ এর ৭১ ও ৮৯ ধারার আওতায় হাকিম সাহেব যে দরখাস্তটি দাখিল করেছেন তার ওপরই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন রেজিস্ট্রার, যিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা।

এখানে এসে কপিরাইট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল যে কোনো ব্যক্তিকেই ২য় বার ভ্যাবাচেকা খেতে হবে। এর কারণ হলো কপিরাইট আইনে রেজিস্ট্রারকে ৭১ ও ৮৯ ধারার কোনো দরখাস্তের ওপর সিদ্ধান্ত দেওয়া তো দূরের কথা, এমন কোনো দরখাস্ত গ্রহণ করারও ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। এমনকি কপিরাইট আইনের ১০৩ ধারা অনুযায়ী প্রণীত কপিরাইট রুলস, ২০০৬ এর মধ্যেও রেজিস্ট্রারকে এমন কোনো ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তাহলে, ৭১ ও ৮৯ ধারায় কাকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আইনে?

আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো পাঠ করে দেখা যায় যে- ৭১ ধারায় কী কী করলে কপিরাইট লঙ্ঘিত হবে তা বলা হয়েছে। আর কেউ কপিরাইট লঙ্ঘন করলে তার প্রতিকার কী তা বলা আছে আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কিত ৮১ ধারায়। তাতে বলা হয়েছে- কপিরাইট লঙ্ঘনজনিত প্রত্যেক দেওয়ানি মামলা দায়ের ও বিচারের এখতিয়ার কেবল সংশ্লিষ্ট  জেলা জজ আদালতের।

আর এই সম্পর্কিত ফৌজদারি মামলাও (৮২-৯১ ধারা) করতে হবে সংশ্লিষ্ট দায়রা জজ আদালতে (৯২ ধারা)। আর ৮৯ ধারা অনুসারে প্রণেতার মিথ্যা কর্তৃত্ব আরোপ সাজা হলো দুই বছর পর্যন্ত কারাদ- বা অনূর্ধ্ব পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ড বা উভয়দন্ড। কপিরাইট আইনের ৯২ ধারা অনুসারে এই মামলাও কেবল সংশ্লিষ্ট দায়রা জজ আদালতে দায়ের ও এর বিচার করা যাবে।

এই দরখাস্তটি যে এখতিয়ার বহির্ভূত তা কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষে লিখিতভাবে জানানোও হয়েছিল। নিবন্ধকের সিদ্ধান্তেও সেসব উল্লিখিত হয়েছে। তিনি এই আপত্তিকে খ-ন করতে গিয়ে কপিরাইট আইনের ২(৯), ১২(৫), ৯৯ ও ১০০ ধারার দোহাই দিয়ে আইনের যে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন তা হলোÑ রেজিস্ট্রারকে আইনের আওতায় সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের অধিকার দেওয়া হয়েছে; বোর্ড ও রেজিস্ট্রারকে দেওয়ানি মামলা চালানোর ক্ষেত্রে আদালতের যেসব ক্ষমতা থাকে তা দেওয়া হয়েছে এবং বোর্ডের গৃহীত কাজ বিচার বিভাগীয় কার্যধারা বলে গণ্য হবে; রেজিস্ট্রার ও বোর্ড যদি কাউকে অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেয় তাহলে তা আদালতের ডিক্রির সমমর্যাদাসম্পন্ন বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, আইনের ২(৯) ধারায় এমন কোনো কিছু নেই। তবে, যা আছে তা আইনের ১০ (২) (গ) ধারায়। তাতে বলা আছে “রেজিস্ট্রার...এই আইন দ্বারা বা উহার অধীনে তাঁহার উপর প্রদত্ত সকল ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দায়িত্ব পালন করিবেন”। এখানকার ‘তাঁহার উপর প্রদত্ত সকল’ শব্দগুলো লক্ষ্য করলেই স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, আইন বা বিধিতে তাকে যদি কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয় তখনই কেবল তিনি তার প্রয়োগ করতে পারবেন। ইতিমধ্যেই আমরা নিশ্চিতভাবে জেনেছি যে, আইন/বিধিতে রেজিস্ট্রারকে ৭১/৮৯ ধারায় কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।

তদুপরি, তিনি এই আইনে কপিরাইট বিষয়ে প্রশাসনিক-দেওয়ানি-ফৌজদারি এই তিন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে বলে একটি নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দরখাস্তটিকে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে দায়ের করা হয়েছে মর্মে গণ্য করে তা তার গ্রহণ করার ও তাতে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার তার আছে বলে দাবি করেছেন। যদিও আইন বা বিধিতে এমন কিছুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আইনে সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষমতা দেওয়া হলেই কেবল তারা সেটা সম্পাদন করতে পারেন। না হলে সেই কাজ হবে আইনের ভাষায় void ab initio মানে গোড়ায় গলদ, এখতিয়ার বহির্ভূত ও বেআইনি। ফলে, যে দরখাস্তটি রেজিস্ট্রার পত্রপাঠ বাতিল করে দিতে বাধ্য, তা না করে কেন ও কীভাবে তিনি এতদূর এগিয়ে গেলেন তা অন্ততপক্ষে আইনগতভাবে বোধগম্য হয়নি।

ফলে, মাসুদ রানা’র কপিরাইট কাজী আনোয়ার হোসেনের নয়, শেখ আবদুল হাকিমের এমন কোনো আইনগত ফয়সালা এখনো হয়নি বলেই ধরে নিতে হবে। হওয়ার কথাও নয়।

বাংলাদেশের আইনে ভূতলেখক (ghostwriter) হওয়া ও বিদেশি বই অবলম্বন/সংযোজন/বিয়োজন/গল্পের প্লট ব্যবহার ইত্যাদি করে বই লেখা, অন্যকথায় এমনতর নকল/বুম্ভীলকবৃত্তি বেআইনি নয় [ধারা ২(৪৬)]। এটা অনৈতিক মনে হতে পারে, তবুও বৈধ। মাসুদ রানা একটা ভৎধহপযরংব; একটা প্রকল্প। এর ব্র্যান্ডনেম, প্যাটার্ন, চরিত্রগুলো, তাদের ধরন-ধারণ, সম্পর্ক, মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট। এসবের উদগাতাও একজনই এটা সর্বজনস্বীকৃত। আবার, ব্র্যান্ডমোড়কের ভেতরের জিনিস অন্যেরা ফর্মুলা মেনে অর্থের বিনিময়ে উদ্গাতার প্রত্যক্ষ নজরদারিতে প্রস্তুত করেন তাও স্বীকৃত। এরকম ক্ষেত্রে কী হওয়া বাঞ্ছনীয় এসব প্রকাশনা শিল্প ও আইনের বৃহদালাপের অন্তর্গত। এই জায়গাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে চলমান মাসুদ রানা’র প্রণেতা কে, কপিরাইট কার এই বিতর্ক ও আইনি বন্দোবস্ত। তবে, আপাত হলেও, দৃশ্যতই এখানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। মানে, মাসুদ রানা’র ওপর কপিরাইট প্রতিষ্ঠার আগেই তা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়ে তা নিষ্পত্তিও হয়ে গেছে!

লেখক প্রাবন্ধিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত