লাগামহীন পদোন্নতি

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২২, ১০:৪৬ পিএম

রবিবারের দেশ রূপান্তরে পদোন্নতির যে লাগামহীন চিত্র প্রকাশ হয়েছে তাকে দুর্নীতি না বললেও অনিয়ম বলা যায়। এই পদোন্নতির ফলে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে, তা রাষ্ট্রের জন্য অশুভ। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যে প্রশাসনকাঠামো তা শেকলের মতো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এর যে কোনো একটি স্তরে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হলে পুরো প্রশাসনেই তার প্রভাব পড়ে। প্রশাসনের আদর্শ মডেল যেটি পিরামিড মডেল বলে পরিচিত, তার বদলে এখন তৈরি হয়েছে পেটমোটা মডেল।

বিশ^ব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীতে চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ হয়ে গেলেও এই সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি আগের তুলনায় বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও অধিদপ্তরের নিয়োগ ও পদোন্নতিসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেকারদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করার চেয়ে নিজেদের পদোন্নতি নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। করোনা মহামারীর মধ্যে অফিস-আদালত থেকে সেবাপ্রার্থীদের সেবা না দেওয়া হলেও তারা নিজেদের পদোন্নতি নিশ্চিত করেছেন। গত ১০ বছরের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকার সব সময়ই নিয়োগ বেশি দিয়েছে। গত বছরের নিয়োগ ও পদোন্নতির অনুপাত ছিল দশমিক ৭৫:১। এর আগের চার বছরে নিয়োগ ও পদোন্নতির গড় অনুপাত ২:১। করোনা মহামারীর মধ্যে যুগ্ম সচিব পদে দুই দফায় পদোন্নতি দেওয়া হয়। প্রথম দফায় ২০২০ সালের ৫ জুন ১২৩ জন উপসচিবকে পদোন্নতি দিয়ে যুগ্ম সচিব করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ২৯ অক্টোবর ২০তম বিসিএস ব্যাচের ২০৩ জন কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব করা হয়। একইভাবে ২৭তম বিসিএস ক্যাডারদের মধ্য থেকে পদোন্নতি হিসেবে ৩৩৭ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব করা হয়েছে, ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সচিব করা হয় ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। এ ব্যাচকে মূল ব্যাচ বিবেচনায় ধরে ৯২ জন কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি  দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিলুপ্ত অর্থনৈতিক ক্যাডার থেকে প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত হওয়া ২২০ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরের দিন ২ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক ক্যাডারের ১৪৩ কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। ৩ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক ক্যাডারের ২৫ জনকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৮ সালের ১৩ নভেম্বর অর্থনৈতিক ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত করা হয়। ২৭ বিসিএসের ৬৩ কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ২০২১ সালের ২ মে। গত বছরের ১৩ জানুয়ারি ২০ ব্যাচের ১৯ কর্মকর্তা পুলিশ সুপার  থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন। ১২ ব্যাচের কর্মকর্তারা ডিআইজি থেকে অ্যাডিশনাল আইজিপি হয়েছেন। করোনাভাইরাস মহামারীর বিস্তার ঠেকাতে ২০২০ সালের ২৫ মার্চ থেকে ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল সরকার। এসময় সব নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত হলেও সচল ছিল সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি। প্রশাসন ক্যাডারের মতো নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন পুলিশ, কাস্টমস, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যসব ক্যাডার কর্মকর্তারা। এর বাইরে প্রথম শ্রেণির সব কর্মকর্তাও পদোন্নতি পেয়েছেন। বাদ যাননি দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। সিনিয়র স্কেলের পদোন্নতি পরীক্ষাও হয়েছে এ সময়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারীর তান্ডবে দেশের সাধারণ মানুষ যখন এক বড় সংকটে নিপতিত, ঠিক তখনই পদোন্নতি দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা। এর ফলে যেসব করদাতার টাকায় এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দেওয়া হয় তাদের কষ্ট বেড়েছে। ভয়ংকর এ সময়টাতে পৃথিবীর সব দেশের মানুষ মানবিক হয়েছে। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের পদোন্নতি নিশ্চিত করেছেন। যা হওয়ার নয়, তাই হয়ে গেছে। সরকারের লাখ লাখ পদ খালি। এসব পদে দ্রুত নিয়োগ দিয়ে  বেকারদের কষ্ট লাঘব করতে হবে।

পদ সৃষ্টি না করেই পদোন্নতিকে দলীয়করণ ছাড়া আর কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এতে দলীয় সরকার উপকৃত হলেও রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অঙ্গ প্রশাসনের গতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। ভারসাম্য নষ্ট হলে দক্ষতাও হ্রাস পায়। এভাবে যারা পদোন্নতি পাচ্ছেন ও পাবেন, তাদের সবাইকে প্রাধিকার অনুসারে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যাবে না। পদোন্নতি  পেলেও ওপরের পদাধিকারীরা অবসরে যাওয়া পর্যন্ত এদের অনেকেই আগের পদে কাজ করে যেতে বাধ্য হবেন। দ্রুত অনেককে পদোন্নতি দেওয়ায় নিম্নস্তরেও ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রশাসনে গতিশীলতা কমে যায় এবং বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়াও অস্বাভাবিক নয়। পদোন্নতির এই সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনকে জনবান্ধব করতে হলে সরকারি কর্মকর্তাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। ঢালাও পদোন্নতি দেওয়া বন্ধ করে সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের স্বার্থেই এ ধরনের পদোন্নতি বন্ধ হোক, প্রশাসনিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার জন্য সম্ভব সবকিছু করা হোক। সুশাসনের পথে এটাও সরকারের চ্যালেঞ্জ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত