কীসের নেশায় আমরা শহরকেন্দ্রিক

আপডেট : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:২৬ পিএম

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেও গ্রামগুলো ঠিক ততটা উন্নত ছিল না। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতিতে প্রায় পুরোপুরি শহরের প্রতি নির্ভরশীল ছিলাম আমরা। একটা ভালো পোশাক কিনতে, শিক্ষা অর্জনের জন্য, সুচিকিৎসার জন্য এমনকি ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের জন্যও তখন শহরের বিকল্প ছিল না বললেই চলে। কিন্তু আজ এই একবিংশ শতাব্দীর দুই যুগ পেরিয়েও কি এর পরিবর্তন হয়নি? একটা সময় ছিল, দৈনন্দিন বাজার করতে হেঁটে যেতে হতো মাইলের পর মাইল! সারা দেশের যোগাযোগব্যবস্থা অর্থাৎ যানবাহন আর রাস্তাঘাট যাই বলুন না, কোনোটাই তেমন সন্তোষজনক ছিল না। কালক্রমে দুম করেই যেন আমূল পরিবর্তন হয়ে গেল সবকিছু!

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেও গ্রামবাংলা বলতে যে ছবিটি চোখে ভাসত তা হলো গ্রামজুড়ে অন্তত প্রতিটি বাড়িতে একটি বাইসাইকেল, জমি চাষাবাদের জন্য নিদেনপক্ষে এক জোড়া হালের গরু বা মহিষ; এ ছাড়া পণ্যসামগ্রী স্থানান্তরিত করতে গরু বা মহিষের গাড়ির প্রতি নির্ভরশীলতার সংখ্যাটি একেবারেই কম নয়। কমসংখ্যক মানুষের মোটরবাইক ছিল। পুরো গ্রামে একটি বা দুটি! রাখাল দল বেঁধে বাঁশিতে সুর তোলে, গবাদি পশুদের সঙ্গে নিখাদ সখ্যও যেন চোখে পড়ার মতো ছিল! তখনো প্রতিটি গ্রামে ইলেকট্রিসিটি নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। কালে-ভদ্রে দু-একটি রঙিন টেলিভিশন চোখে পড়ত! আকাশ সংস্কৃতির বিষয়টি ছিল শুধু শহুরে সভ্যতার অংশবিশেষ! অর্থনৈতিক অভাবের মধ্যেও গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের হইচই করে করে বেড়ানো ছিল নিত্য ঘটনা! দল বেঁধে ধুলো উড়িয়ে স্কুলে গমন, গাঁয়ের মেঠোপথ ধরে শস্যক্ষেতের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারা কিংবা বিকেলবেলায় স্কুলমাঠে হরেক রকম আনন্দ! এসবই যেন গ্রামীণ চিত্র! অনেকে আবার চানাচুর মাখানো ঝালমুড়ি, নাড়–, ঘিয়ে ভাজা শনপাপড়ি, পাঁপড় ভাজা ইত্যাদি খাবার আনন্দে বাবার সঙ্গে বাইসাইকেলের লোহার রডে চেপে গাঁয়ের ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে হাটে যেত! কত সহজেই কেরোসিনের উটকো গন্ধ আর হারিকেনের আলোয় নিজেকে মানিয়ে নিত তখনকার শিশুরা! সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই টিউবওয়েল কিংবা কুয়ার পানিতে হাত-মুখ ধুয়েই নিয়মিত পড়াশোনায় মনোনিবেশ করাটা বাধ্যতামূলক ছিল প্রতিটি ছাত্রের জন্য! ১০টা বাজার আগেই রাতের খাবার খেয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ত সবাই! মশা-মাছিদের উপদ্রব আর ৪০ ডিগ্রিরও ওপরের তাপমাত্রাকে তোয়াক্কা না করেই কী প্রশান্তির ঘুম হতো তাদের! রোজকার মতো সুবহে সাদিকেই আবারও ঘুম ভেঙে আপন আপন পাঠে মনোনিবেশ চলত! তখনো প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন সকাল! উদীয়মান সূর্যের সাক্ষী কৃষক লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে ছুটে যেতেন দূর দিগন্তে! ফসল ফলিয়ে দেশকে বাঁচানোটা ছিল তাদের দৃঢ় প্রত্যয়! সীমিত সম্পদ আর সীমাহীন অভাবকে সঙ্গে নিয়েও প্রায় প্রতিটি পরিবারেই জনসংখ্যার আধিক্যের কথা মনে পড়লে বর্তমানে অবাক লাগে! মজার ব্যাপার, কোনো না কোনোভাবে পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থাটা ঠিক হয়েই যেত! বড় ভাই-বোনের কাপড় পরিধান করে ছোট ভাই-বোনরা বেড়ে উঠবে এটি ছিল যেন একটি অলিখিত নিয়ম! তখনকার পরিবারের সদস্যরা একটি ছোট ডিমকে দুভাগ করে খেত! পুরো সপ্তাহে প্রায় নিরামিষনির্ভর মানুষদের আত্মাগুলো একটি স্বাদযুক্ত খাবারের অপেক্ষায় থাকত! কালে-ভদ্রে তারা আমিষের সন্ধান পেত! গ্রাম্য সমাজে রেফ্রিজারেটরের প্রচলন ছিল না বললেই চলে! তাই মাছ-মাংস জমিয়ে রাখার কোনো উপায়ও ছিল না। গ্রামপর্যায়ে নিয়মিত বাজারের প্রচলন না থাকায় মেহমান এলে বাপ-বেটা মিলে শুরু হতো বাড়ির পোষা মুরগি ধরার চেষ্টা! কেউ কেউ নেমে পড়ত পুকুরে, খালে-বিলে, নদীতে! লটারি ভাগ্যের মতো যেসব মাছ পেত, তা নিয়েই খুশি থাকতে হতো; উপস্থিত মেহমানকে লটারির মাছ অথবা মুরগি যেকোনো এক ধরনের আমিষ দিয়েই আপ্যায়ন করা হতো! মেহমানকে আপ্যায়ন শেষে অবশিষ্ট যা থাকত সেদিকে প্রায় আমিষ বুভুক্ষু মানুষদের চোখ চকচক করে উঠত!

তখনো গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা সেকেন্ড ডিভিশনে (কমপক্ষে ৪৫ শতাংশ নম্বরপ্রাপ্ত) কিংবা সংখ্যায় কম হলেও ফার্স্ট ডিভিশনে (কমপক্ষে ৬০ শতাংশ নম্বরপ্রাপ্ত) স্কুল-কলেজ পাস করত! খুব অবলীলায় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার চান্স পেত; আজ যারা পুরো দেশের প্রায় সিংহভাগ সেক্টরের/বিভাগের ১ম শ্রেণির কর্মকর্তা! সময়ের প্রয়োজনে আজ অনেকে শহরে পাড়ি জমিয়েছেন। কালের বিবর্তনে নতুন কিছু উদ্ভাবনের নেশায় তারা স্বপ্নবাজ সেজেছেন! স্বার্থের টানেই গাঁয়ের মাটির সোঁদা গন্ধটিও হয়তো তারা ভুলে গেছেন!

তাদের শৈশবের আজ অকালমৃত্যু ঘটেছে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার কঠিন সময়ে। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অর্থনীতি এমনকি সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ঘটাতেই কি না স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষরা আজ বয়সের ভাড়ে নুয়ে পড়া অসহায় মা-বাবাকে সেই গাঁয়ে একা ফেলে রেখে বিলাসবহুল শহুরে জীবনযাপন করছে। একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে প্রবীণ মা-বাবা যেন এক মধুর সমস্যায় পড়েছেন! সেই আমলের তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব যেন এ যুগের নবীনদের কাছে অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে! ডিজিটাল ব্যবস্থা এমনকি ইন্টারনেটনির্ভর নতুন প্রজন্মের কাছে ২৫-৩০ বছর আগের এই বাংলার রীতিনীতি, সংস্কৃতি যেন আদিকালের আদিখ্যেতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বাঙালির ঐতিহ্যে পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে আজকাল। নাতি-নাতনিদের ঘুম পড়ানোর জন্য দাদা-দাদিদের রূপকথার গল্প শোনানোর কোনো প্রয়োজন পড়ে না এখন। ইন্টারনেটনির্ভর শিশুরা রোবটিক লাইফেই যেন বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে! আধুনিক মায়েদের প্রত্যাশাটিও অনেকাংশে তাই! শৈশব থেকেই প্রিয় সন্তানদের প্রতিযোগিতার এই যুগে টিকে থাকতে স্কুল, কোচিং, হোম টিউটর এমনকি ইন্টারনেটভিত্তিক অধ্যয়নে বাধ্য করে তোলে স্বয়ং মা-বাবা! গ্রামের সরকারি স্কুলে যেখানে একটি ক্লাসে ২০-২৫ ছাত্রছাত্রী; শহরের যেকোনো স্কুলে সেখানে ৩০০-৪০০ জন! হ্যামিল্টনের বাঁশিওয়ালার মতো কোনো এক মোহিনী বাঁশির সুরে মোহিত হয়ে গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছে সিংহভাগ শিশুসহ তাদের মা-বাবারা! তথাকথিত গাঁয়ের ডাক্তারের পরামর্শ যেন বড্ড বেমানান আজকাল! বাহারি পরিবেশনায় আহারের বাড়াবাড়ি; নিদেনপক্ষে মেন্যু লিস্টে আইটেম প্রদর্শনের অলিখিত নিয়মের প্রতিযোগিতা আজ শুরু হয়েছে খুব সচেতনভাবেই!

দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার বাইরেও মন খুলে বাজার করতে, পেট ভরে খেতে ও খাওয়াতে, ভালো স্কুল-কোচিং পেতে, উন্নত চিকিৎসা পেতে, অত্যাধুনিক নাগরিক সুবিধায় জীবনকে উপভোগ করতে শহরের যেন কোনো বিকল্পই নেই আজ! অথচ ডিজিটাল সভ্যতার গ্রামগুলোতেও বলতে গেলে নাগরিক সুবিধার কোনো কমতিই নেই; ইন্টারনেটের উন্মত্ততায় ছেয়ে গেছে গ্রামীণ চারপাশ! তবু কেন ছুটছে মানুষ ইটপাথরের নির্মমতায় গড়ে ওঠা ব্যস্ততম শহরে? কীসের টানে চার দেয়ালে বন্দি করে রাখা হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের? কোন অপরাধে নিষ্পাপ শিশুর সুন্দর শৈশবকে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে? আজকের জাতির কর্ণধাররা কি চুপটি মেরে থাকবেন? নাকি লজ্জায়-অপরাধে নিজেকে গুটিয়ে রাখবেন? এ যুগের অনেক জ্ঞানী মানুষ তাদের শ্রদ্ধাভাজন মা-বাবাকে শুধু স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ পাহারা দিতে আর একবারে সেকেলে মানুষ ভেবে সেই গ্রামে এক প্রকার ফেলে রেখে পুরোদস্তুর শহুরে ভদ্রলোক সেজেছেন! কোনো এক দিন এমনি করেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মও হয়তো পাড়ি জমাবে অন্য কোনো শহরে, দেশ হতে দেশান্তরে! তবু কি আমরা মা-বাবাদের একা ফেলে রেখে শহরের দিকেই ছুটে চলব?

লেখক : উন্নয়নকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত