হজ দলে ১১ মন্ত্রণালয় অন্যদের আপত্তি

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:০৯ এএম

হজের প্রশাসনিক দলে ১১টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা বিধিমালার খসড়া প্রকাশের পর আপত্তি ও ক্ষোভ জানিয়েছেন অন্যরা। ওই সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বাইরে থাকা অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন।

গত ১৮ জানুয়ারি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খসড়া বিধিমালায় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থবিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে হজ প্রশাসনিক দল গঠনের কথা বলা হয়েছে। সর্বোচ্চ উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা এ দলে থাকতে পারবেন। হজ চিকিৎসক দলের সহায়তাকারী সদস্যদের মেডিকেল ক্লিনিকে রোগীদের সৃষ্ট ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার, রোগীদের ওষুধ গ্রহণে সহায়তা করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

একাধিক মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হজ প্রশাসনিক দলের সদস্য কেবল ১১টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে বাছাই করা ঠিক নয়। এটা সব মন্ত্রণালয় বা বিভাগের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার। প্রায় সব মুসলমানের জীবনেই সৌদি আরব যাওয়ার বা হজ করার ইচ্ছা থাকে। কারও সাধ্যে কুলায়, কারও কুলায় না। চাকরি সূত্রে যদি যাওয়ার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তা সংশ্লিষ্টদের সবার জন্যই সমান সুযোগ রাখা দরকার। ওই সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অত্যন্ত সুকৌশলে বাছাই করা হয়েছে। যাতে করে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ওই সব মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আশীর্বাদ পেতে পারেন। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নামগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়।

অন্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হজ প্রশাসনিক দলে তাদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের নাম রাখার জন্য বিষয়টি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে এনেছেন।

বিধিমালায় সর্বোচ্চ উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের হজ প্রশাসনিক দলে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই দলের অংশ হয়ে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিবরাও যান। এসব উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রশাসনিক দলের অংশ হয়ে সৌদি আরব গেলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। নিচের ধাপের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রটোকল দিতে ব্যস্ত থাকেন। প্রশাসনিক দলের এক শ্রেণি প্রটোকল পেতে এবং আরেক শ্রেণি প্রটোকল দিতে ব্যস্ত থাকায় কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হন হাজিরা।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চিকিৎসক দলের সহায়তাকারী সদস্য বাছাইয়ে সবচেয়ে সমস্যার সৃষ্টি হয়। ২০ থেকে ১৪ গ্রেডে কর্মরতদের নিয়ে চিকিৎসক দলের সহায়তাকারী দল গঠনের কথা থাকলেও এ দলে নানা শ্রেণির ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভিআইপিদের দিয়ে তদবির করে এ দলে ঢুকে পড়েন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। চিকিৎসক দলের মোট সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ নিয়ে এ দল গঠন করার কথা। হজের চিকিৎসা দলে নার্স-ব্রাদার, ফার্মাসিস্ট থাকার কথা থাকলেও সেখানেও ভাগ বসান অন্যান্য পেশার প্রতিনিধিরা।

বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করার আগে বিষয়টি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকে প্রকৃত নার্স-ব্রাদার ও ফার্মাসিস্টদের দলে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। একই বৈঠকে সহায়তাকারী দলের নাম বদলে ‘ক্লিনার’ বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী দল রাখার সিদ্ধান্ত হয়।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে ওই বৈঠকের একজন অংশীজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সহায়ক দলের কাজ কী, তা পরিষ্কার নয়। নাম দেখে তা বোঝা যায় না। সৌদি আরবে যাওয়ার আগে সহায়ক দলের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়ে বা আত্মীয়-স্বজনদের জানান, সহায়ক দলের সদস্য হিসেবে সৌদি আরবে যাচ্ছেন তিনি। অথচ এই সহায়ক দলের সদস্যদের কাজ হচ্ছে যেসব হজযাত্রী সৌদি আরবে গিয়ে অসুস্থ হয়ে ক্লিনিকে ভর্তি হবেন, তাদের সেবা করা। তাদের সৃষ্ট ময়লা পরিষ্কার করতে হবে এবং ওষুধ খেতে সহায়তা করতে হবে। কাজেই সহায়ক দলের নাম বদলে যদি ক্লিনার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী দল রাখা হয়, তাহলে এ দলে অনেকেই অন্তর্ভুক্ত হতে চাইবেন না। তখন যারা প্রকৃত অর্থে হজযাত্রীদের সেবা করতে চান, তারাই যাবেন। আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সহায়ক দলের নাম ক্লিনার টিম বা পরিচ্ছন্নতাকর্মী দল রাখার সিদ্ধান্ত হলেও তা খসড়া বিধিমালায় রাখা হয়নি বলে তিনি জানিয়েছেন।

হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সভাপতি সাহাদাত হোসাইন তসলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সবার সঙ্গে কথা বলেই বিধিমালার খসড়া করেছে। আমরা বলেছি মেডিকেল টিমে নার্স এবং ব্রাদার হিসেবে যারা যাবে তাদের প্রকৃত অর্থেই নার্স এবং ব্রাদার হতে হবে। প্রশাসনিক দলেও হাবের প্রতিনিধিত্ব থাকা দরকার। এতে হজযাত্রীদের সেবা নিশ্চিত হবে।’

খসড়া অনুযায়ী, প্রতি দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার হজযাত্রীর সেবা তদারকির জন্য প্রশাসনিক দল গঠন করা হবে। দূতাবাসের কাউন্সেলর হজ প্রশাসনিক দলের সদস্যদের কার্যক্রম সম্পর্কে মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেবেন। এই প্রতিবেদনে কোনো বিরূপ মন্তব্য থাকলে ওই সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবে। প্রশাসনিক দলে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, কম্পিউটার অপারেটর, সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটররা থাকবেন। আর ঢাকার হজ অফিসের প্রধান সহকারী, উচ্চমান সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, অফিস সহকারীরা থাকবেন। প্রশাসনিক সহায়তাকারী দলের সদস্য সংখ্যা ২০ জনের বেশি হবে না।

চিকিৎসক দলের সদস্যরা সৌদি আরবে স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে অবস্থান করতে পারবেন না। চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট বা কর্মচারি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অনুমতি ছাড়া চিকিৎসক দল বা সমন্বিত হজ সহায়ক দলে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। হজ প্রশাসনিক দলের দলনেতা হজ চিকিৎসক দলের সার্বিক সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। হজ চিকিসক দলের সদস্যরা হজ পালন করতে পারবেন না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশাসনিক দল বা সহায়ক দলে এমন লোককে অন্তর্ভুক্ত করা হয় যারা জীবনেও মক্কা মদিনায় যায়নি। ওই সব দলের সদস্যদেরই মক্কা-মদিনা চেনাতে হয়। বাস্তবতা হচ্ছে তারা হাজিদের সহায়তা বা সেবা করতে নয়, ওখানে যান নিজেরা হজ করতে। তাতে চাকরিও করা হলো, পুণ্যলাভের চেষ্টাও হলো।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মতিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে করার জন্য “হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১” প্রণয়ন করা হয়েছে। এ আইনের বিধিমালা প্রণয়ন করে মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত নিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। আপাতত ১১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশাসনিক দলের সদস্য হতে পারবেন। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি উঠলে সংশ্লিষ্টরা নিশ্চয়ই বিবেচনা করবেন।’

ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, প্রতি বছর সরকার কিছু অসচ্ছল ব্যক্তিকে সরকারি খরচে হজ পালনের সুযোগ দেবে। বিধিমালায় এর কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। তারা সরকারঘোষিত সর্বনিম্ন খরচে হজ পালন করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত