রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থী মাহমুদ হাবিব হিমেল ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারানোর চার বছর আগে তার বাবা-মাও ভয়াবহ এক সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিলেন। ওই দুর্ঘটনা-পরবর্তী জটিলতায় হিমেলের বাবা আহসান হাবীবের মৃত্যু হয়। আর মা মুনিরা আক্তার দীর্ঘ চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলেও অনেকটাই মানসিক ভারসাম্যহীন তিনি। এছাড়া তিন বছর আগে হিমেলের দাদি আমেনা বেওয়াও মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। ফের আরেক সড়ক দুর্ঘটনায় একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্বামীহারা মা মনিরা আক্তার। একটার পর একটা সড়ক দুর্ঘটনা তার জীবন দুর্বিষহ করে ফেলেছে।
গত মঙ্গলবার রাতে রাবির শহীদ হবিবুর রহমান হলের সামনে মালবাহী ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ হারানো হিমেলকে গতকাল বুধবার তার নানার বাড়ি নাটোরে দাফন করা হয়েছে। এর আগে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল সকালে মরদেহ রাবি ক্যাম্পাসে আনা হলে চোখের জলে তাকে বিদায় জানান সহপাঠী, বন্ধু, শিক্ষক ও শুভাকাক্সক্ষীরা।
এদিকে হিমেলকে চাপা দেওয়া ট্রাকচালক ও তার সহকারীকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া হিমেলের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে রাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরকে প্রত্যাহার করে নতুন প্রক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাকচাপায় নিহত মাহমুদ হাবিব হিমেল রাবির চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি রাবির কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। এছাড়াও স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধন-এর রাবি জোনের শহীদ শামসুজ্জোহা হল ইউনিটের সহসভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। কয়েক বছর আগে তার বাবা মারা গেলে মায়ের সঙ্গে নানা বাড়ি নাটোরের কাপড়পট্টি এলাকায় থাকা শুরু করেন।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে হিমেলের জানাজা হয়। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হিমেলের মরদেহ প্রথমে চারুকলা অনুষদে আনা হয়। সেখানে কিছুক্ষণ রাখার পর মরদেহ নেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার মুক্তমঞ্চে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সহপাঠীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেখানে বিভিন্ন সংগঠন হিমেলের মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এ সময় কয়েকশ’ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর মরদেহ জানাজার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। জানাজা শেষে বেলা ১১টার দিকে হিমেলের মরদেহ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাশবাহী পিকআপ ভ্যানে করে তার মায়ের বাড়ি নাটোরের কাপুড়িয়াপট্টির উদ্দেশে নেওয়া হয়। ওই ভ্যানে তার কয়েকজন সহপাঠীও ছিলেন। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িতে ছিলেন উপাচার্য গোলাম সাব্বির সাত্তারসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টি বাসে করে শিক্ষার্থীরাও হিমেলের মরদেহবাহী গাড়িবহরের সঙ্গে নাটোরে যান।
হিমেলের মরদেহ দুপুর ১২টার পরপর নাটোর শহরে নানাবাড়িতে পৌঁছায়। এ সময় স্কুল-কলেজের সহপাঠী ও প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন হিমেলকে একনজর দেখার জন্য। কিন্তু ভিড় ঠেলে কফিনের কাছে এসে প্রিয় হিমেলের মুখখানা শেষবারের মতো দেখতে না পেয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন সবাই। ফুলে ঢাকা কফিনের কোথাও হিমেলের শরীরের এতটুকু দেখা যায়নি। দুর্ঘটনায় তার মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় মরদেহ বাক্সবন্দি করে রাখা হয়েছিল। ছেলের কফিনবন্দি মরদেহের পাশে মা মুনিরা আক্তারকে নির্বাক নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখা যায়। সবার বুকফাটা কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও মা মুনিরা আক্তার ছিলেন একদম নিশ্চুপ। কফিনের খুব কাছাকাছি একটা চেয়ারে বসে শুধুই ছেলের কফিনের দিকে চেয়ে ছিলেন। পাশে খালা, নানি, সহপাঠীরাসহ অন্য স্বজনদের চোখে অঝোরে ঝরছিল অশ্রু। দুপুর দেড়টার দিকে বন্ধু-স্বজনরা হিমেলের কফিন কাঁধে রওনা হন বাসস্ট্যান্ড মসজিদের মাঠে। সেখানে জানাজা শেষে নানাবাড়ির অদূরে গাড়িখানা কবরস্থানে দাফন করা হয় হিমেলকে।
বাবা-দাদির পর সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল হিমেলকেও : চার বছর আগে হিমেলের বাবা আহসান হাবীব ও মা মুনিরা আক্তার সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। দুর্ঘটনা-পরবর্তী জটিলতায় তার বাবার মৃত্যু হয়। তিন বছর আগে দাদি আমেনা বেওয়াও মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। স্বজনরা জানান, চার বছর আগে বগুড়ার শেরপুর থেকে মোটরসাইকেলে করে নাটোরে আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন হিমেলের বাবা-মা। সেই জটিলতায় বছরখানেক ভুগে মারা যান আহসান হাবীব। মুনিরা প্রাণে রক্ষা পেলেও মানসিক রোগীতে পরিণত হন। এখনো তার চিকিৎসা চলছে।
নিজের খরচ জুগিয়ে মাকেও টাকা পাঠাতেন হিমেল : রাবির শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ২১২ নম্বর কক্ষে থাকতেন হিমেল। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছেন। মা আর ছেলের সংসারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি মায়ের জন্যও টাকা পাঠাতেন তিনি। বন্ধু-সহপাঠীরা তার মৃত্যুর পর এমন তথ্য জানিয়েছেন।
বন্ধু ও সহপাঠীরা জানান, ছবি এঁকে ও কাঠ দিয়ে নানা শিল্পকর্ম বানিয়ে সেগুলো বিক্রি করতেন হিমেল। নিজের শিল্পকর্ম বিক্রি করে যে টাকা পেতেন, তা দিয়ে নিজের খরচ চালানোর পর উদ্বৃত্ত টাকা মাকে পাঠাতেন তিনি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবারও মাকে টাকা পাঠিয়েছিলেন।
সহকারীসহ ট্রাকচালক গ্রেপ্তার : হিমেলকে চাপা দেওয়া ট্রাকচালক মো. টিটু (৪২) ও তার সহকারী (হেলপার) হামিম হোসেন ওরফে কালুকে (২০) আটক করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুর ১টার দিকে নগরীর কাশিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। তারা দুজনই কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা। গতকাল দুপুরে রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার আবু কালাম সিদ্দিক সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টি জানান। হিমেলকে চাপা দেওয়ায় রাবির সহকারী প্রক্টর আরিফুর রহমান বাদী হয়ে নগরীর মতিহার থানায় মামলা করেছেন। সেই মামলায় আটক দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
হিমেলের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকার চেক : হিমেলের মরদেহ দাফন শেষে তার পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক হস্তান্তর করে রাবি প্রশাসন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘হিমেলের পরিবারকে ধাপে ধাপে আরও সহযোগিতা করা হবে। তার মায়ের আজীবন চিকিৎসা খরচ বিশ্ববিদ্যালয় বহন করবে।’
এছাড়া হিমেলের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণসহ শিক্ষার্থীদের ছয়টি দাবির সবক’টি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাবি উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার। হিমেলের জানাজায় উপাচার্য এ ঘোষণা দেন।
দায়িত্বে ‘অবহেলায়’ প্রক্টর প্রত্যাহার : হিমেলের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা প্রক্টর লিয়াকত আলীকে প্রত্যাহারের দাবি জানান। ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতেই প্রক্টরকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়। তার জায়গায় গতকাল দুপুরে গণিত বিভাগের অধ্যাপক আসাবুল হককে প্রক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পাসের ২০ তলা বিজ্ঞান ভবনের নাম হবে হিমেলের নামে : গতকাল বিকেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুক্ত আলোচনায় বসেন রাবি উপাচার্য গোলাম সাব্বির সাত্তার। শিক্ষার্থীরা নানা দাবি জানালে উপাচার্য সব দাবি মেনে নিয়ে হিমেলের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত ২০ তলা বিজ্ঞান ভবনের নামকরণের ঘোষণা দেন।
রাবিতে দুটি আবাসিক হল ও একটি বিশতলা অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। বিশতলা অ্যাকাডেমিক ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছে শহীদ হবিবুর রহমান হলের দক্ষিণ পাশে। মঙ্গলবার রাতে শহীদ হবিবুর রহমান হলের দিক থেকে মোটরসাইকেলে ক্যাম্পাসের দিকে যাচ্ছিলেন নিহত হিমেল ও তার বন্ধু রায়হান রিমেল। নির্মাণাধীন বিশতলা অ্যাকাডেমিক ভবনের গেটের সামনে পৌঁছলে নির্মাণ সামগ্রী বহনের একটি ট্রাক তাদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই হিমেল মারা যান। আহত হন রিমেল। তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রিমেল রাবির সিরামিক ও ভাস্কর্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
হিমেলের মৃত্যুর পর রাস্তায় জ্বলল আলো : রাবির শহীদ হবিবুর রহমান হলের সামনের রাস্তায় লাগানো হয়েছে নতুন লাইট। প্রায় ১৬ ঘণ্টা আগে এই রাস্তাতেই ট্রাকচাপায় প্রাণ হারান হিমেল। হলটির সামনের রাস্তায় গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এলইডি লাইট লাগানো হয়। সেই সঙ্গে পরিবর্তন করা হয়েছে আশপাশের নষ্ট হয়ে যাওয়া লাইটগুলোও।
এ প্রসঙ্গে হবিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী হাসান আহমেদ বলেন, ‘কাল রাতে চেঁচামেচি শুনে হলের বাইরে এসে দেখি রাস্তা অন্ধকার। রাস্তার পাশের লাইটগুলো বন্ধ। কাছে গিয়ে দেখি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। এখন দেখছি নতুন লাইট লাগানো হয়েছে। তাই মনে হচ্ছে হিমেলের জীবনের বিনিময়ে হলের রাস্তায় আলো জ্বলল।’
