রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ায় সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হয়েছেন রোগীরা। গতকাল বুধবার ঢাকা কিডনি হাসপাতালের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন রোগী ও তার স্বজনরা। রোগীর স্বজনদের দাবি, কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ডায়ালাইসিস হবে না বলে জানানো হয়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে মুমূর্ষু রোগী নিয়ে এসে বিপদে পড়েন তারা। আবার কবে থেকে ডায়ালাইসিস দেওয়া হবে সেটিও নিশ্চিত করছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে সরব হন তারা।
পরে রোগী ও স্বজনদের সড়ক থেকে সরিয়ে হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করে ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্ডর। বৈঠকে সেন্ডরের বকেয়া পরিশোধের আশ^াস দিলে গতকালই আবার ডায়ালাইসিস সেবা চালু করে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।
এ ব্যাপারে জাতীয় কিডনি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সকাল ৮টা থেকে ৮ ঘণ্টার মতো ডায়ালাইসিস বন্ধ ছিল। বেলা ২টার দিকে আবার তা চালু হয়।
আর ৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর বকেয়া পরিশোধের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল থেকেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা পুনরায় চালু করা হয়।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ভিত্তিতে ডায়ালাইসিস কার্যক্রম পরিচালনা করছে ভারতীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্ডর। দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধ না করায় বিনা ঘোষণায় গতকাল বুধবার সকাল থেকে সেবা বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।
জানা যায়, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত প্রকল্পের মাধ্যমে সেন্ডর কোম্পানি স্বল্প খরচে রোগীদের ডায়ালাইসিস দিয়ে যাচ্ছে। এ কাজে বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় অর্থসহায়তা দেওয়া বন্ধ রেখেছে।
জাতীয় কিডনি হাসপাতালের ডায়ালাইসিস ইউনিটের ইনচার্জ মহিতুন বেগম বলেন, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের কাছে পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য সেন্ডর বেশ কয়েকবার আলোচনা করেছে। গত ৫ জানুয়ারির পর তারা ডায়ালাইসিস করতে পারবে না বলেও জানিয়েছিল। সর্বশেষ তারা (সেন্ডর) অর্থসংকটের কারণে গত মঙ্গলবার ডায়ালাইসিস বন্ধের একটি নোটিসও দেয়। তাতেও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন, এখানে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী ডায়ালাইসিস সেবা নেন। কিন্তু হাসপাতালের কাছে কিছু টাকা বকেয়া থাকায় আদায়ের কৌশল হিসেবে সেবা বন্ধ করে দিয়েছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারতীয় প্রতিষ্ঠান সেন্ডর।
এ বিষয়ে জাতীয় কিডনি হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান বলেন, সেন্ডর নামের কোম্পানিটি ডায়ালাইসিস সেবা দিয়ে আসছে। কিছু টাকা বকেয়া থাকায় আজ (গতকাল) সকাল থেকে ৬০০ রোগীকে তারা জিম্মি করেছে। কোম্পানিটির ওপর আমরাও বিরক্ত। তবে আশা করি এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে।
পরিচালক বলেন, ‘করোনার কারণে অন্যান্য হাসপাতাল থেকে বাড়তি যে রোগী এসেছে কিডনি হাসপাতালে, সেই রোগীর ডায়ালাসিসের টাকা বাকি রয়েছে। তবে আমাদের হাসপাতালের যেসব রোগীর ডায়ালাইসিস হয়েছে সেই টাকা পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য হাসপাতাল থেকে করোনার কারণে বাড়তি যে রোগী এসেছে, সেই রোগীর ডায়ালাইসিসের খরচ আমরা দিতে পারিনি। এই টাকা দিতে হলেও সময়ের ব্যাপার। কারণ এটার একটা প্রক্রিয়া আছে সরকারের। অথচ আমাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেবা বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। আমি শুধু হাসপাতালের পরিচালক নয়, একজন ডাক্তারও। আমি কি চাইব একজন কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস বন্ধ থাক।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারে লাগানো ৩১ জানুয়ারির একটি নোটিসে বলা হয়, ডায়ালাইসিসের মতো জরুরি সেবা বন্ধ করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। কিন্তু সেবা চালিয়ে যাওয়ার কোনো সক্ষমতাও তাদের নেই। ২ বছরের বেশি সময়ের বকেয়া জটিলতা অমীমাংসিত থাকায় বর্তমানে তাদের কার্যকরী তহবিল শূন্য। তাই কাঁচামাল কিনতে না পারায় এই জরুরি সেবা দুয়েক দিনের বেশি চলমান রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। নোটিসে বলা হয়, প্রতিদিন ডায়ালাইসিসের জন্য ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকার কাঁচামাল প্রয়োজন হয়, যা বাকিতে কিনতে হয়। কিন্তু সরকারের কাছে প্রায় ২৩ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় কাঁচামাল কিনে সেবা অব্যাহত রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
বিষয়টি স্বীকার করে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘বকেয়া টাকার জন্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ রাখে। পরে ঢাকায় ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার পরিপেক্ষিতে প্রায় ৮ ঘণ্টা পর পুনরায় ডায়ালাইসিস সেবা চালু করা হয়েছে।
