তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:১২ এএম

রাজধানীর ডেমরা এলাকায় ড্রাম ট্রাকচালক সাইফুল ইসলাম (৩০) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা গুরুত্ব পাচ্ছে। খুনের রহস্য উদঘাটনে হুডিগেঞ্জি পরা সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে খুঁজছে পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সাইফুলের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ছিনতাই ও জঙ্গিসংশ্লিষ্টতাকে সন্দেহে রেখে খুনের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাইফুল ইসলামের স্থায়ী বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মোড়াপাড়া দড়িকান্দি গ্রামে। প্রায় ৩০ বছর ধরে ডেমরার মেন্দিপুর মিঞাবাড়ি এলাকায় নিজেদের বাড়িতে বসবাস করছিলেন। এইচএসসি পাস করার পর এমরান হোসেন নামে এক বন্ধুর সঙ্গে ২০১০ সালে তিনি আফগানিস্তানে যান। ২০১৪ সালে দেশে ফিরে বিয়ে করেন।

সাইফুল ইসলামের পরিবারের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, আফগানিস্তান থেকে ফিরে আসার পর তিনি পরিবারের সদস্য ও বাইরের অনেককেই বলেছেন, তিনি সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সৈনিকদের গাড়ি চালাতেন। তার সঙ্গে এমরান নামে আরও একজন ছিলেন, যিনি আফগানিস্তানের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ক্যাশিয়ার পদে চাকরি করেছেন। সাইফুল নিয়মিত নামাজ পড়তেন এবং পরিচিতজনদের দ্বীনের পথে চলতে বলতেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাইফুলের সঙ্গে এলাকার কারও সঙ্গে তেমন কোনো ঝামেলা ছিল না। কথাও কম বলতেন। নিজের ট্রাকটি কিছুদিন এক চালককে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চালক টাকা ঠিকমতো না দেওয়ায় তার কাছ থেকে ট্রাকটি নিয়ে তিনি নিজেই চালাচ্ছিলেন। মাটি ও বালু বহনের কাজ করতেন তিনি।

গত ২৮ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে ট্রাক নিয়ে বের হন। সেদিন রাতে কামারগোপ এলাকায় জনৈক আমির হোসেনের জমিতে বালু ফেলার কাজ শুরু করেন। আমির হোসেন কাজ দেখতে গিয়ে রাত সাড়ে ৩টার দিকে ট্রাকচালক সাইফুলকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসু কাউন্সিলের বাড়ির সামনের রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাত ৩টা ২ মিনিটে সাবেক কাউন্সিলর হাসুর বাড়ির সামনের রাস্তায় সাইফুলকে ছুরিকাঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় আশপাশের বাড়ির গেটে নক করেও সাড়া পাননি। কিছুক্ষণ পর নিস্তেজ হয়ে সেখানেই পড়ে থাকেন। ঘণ্টাখানেক পর স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে পুলিশ খবর পেয়ে সাইফুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভোরের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাইফুলকে যে ব্যক্তি ছুরিকাঘাত করেছে, সেই ব্যক্তি হুডিগেঞ্জি পরে ঘটনাস্থলের আশপাশেই অপেক্ষা করছিল। মোবাইল ফোনে পাবজি গেম খেলতে দেখা গেছে তাকে। বালু ফেলার জন্য সাইফুল ট্রাক থামানোর পরপরই চালকের আসন থেকে তাকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে ছুরিকাঘাত করা হয়। রাতে যখন তাকে উদ্ধার করা হয় তখনো ট্রাকের ইঞ্জিন সচল ছিল। হেডলাইট জ¦লছিল।

এ ঘটনায় ডেমরা থানায় করা মামলায় সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার আদালতের মাধ্যমে তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।

তদন্তকারীরা জানান, ঘটনাস্থলে একটি ছোট আকৃতির জুতা, অ্যানালগ ফোনসেট ও ছুরি পাওয়া গেছে। ছুরিতে রক্তের দাগ ছিল না। সাইফুলের পরিবার জানিয়েছে, তিনি দুটি ফোনসেট ব্যবহার করতেন। একটি অ্যানালগ আরেকটি স্মার্ট ফোন। তদন্তকারীরা বলছেন, খুনি সাইফুলের স্মার্ট ফোনটি নিয়ে গেছে। কারণে সেখানে এমন কিছু থাকতে পারে যা জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসবে। এ ফোনসেটটি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন তারা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলছেন, তাদের ধারণা যে আফগানিস্তানে গিয়ে কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সাইফুলের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে দেশে ফিরে এখানকার কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ হয়। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরে আসায় ওই জঙ্গিদের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে থাকতে পারেন তিনি। ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলে, ছিনতাইকারীরা তার দুটি মোবাইল ফোনই নিয়ে যেত। এছাড়া ট্রাকও ফেলে রেখে যেত না। যে ব্যক্তি তাকে খুন করেছে, সেই ব্যক্তি ঘটনাস্থলের আশপাশে দীর্ঘক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেছিল। রাত ২টা থেকে ৩টা ২ মিনিট পর্যন্ত ঘটনাস্থলেই ছিল। প্রযুক্তির সহায়তায় ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সন্দেহভাজন হিসেবে যে ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে, তার পরিচয় এখনো জানতে পারেনি পুলিশ ও গোয়েন্দারা।

তদন্তকারীদের ধারণা, সাইফুল ছিলেন সুঠামদেহী, তাকে কোনোভাবেই চালকের আসন থেকে একজনের পক্ষে টেনেহিঁচড়ে নামানো সম্ভব নয়। এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে।

সাইফুলের বন্ধু এমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাইফুল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আফগানিস্তানে আমি হেরাতে ছিলাম। আর সাইফুল ছিলেন কান্দাহারে আমেরিকান সৈন্যদের আস্তানায়। ২০১৪ সালে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হলে সেখান থেকে দুবাই হয়ে আমরা দেশে ফিরি।

আফগানিস্তান যাওয়ার আগে এমরান একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে থাকাকালে আমরা আমাদের দাড়ি কেটে ফেলি। নামাজও ঠিকমতো পড়তাম না। পরে দেশে ফিরে এসে দুজনই নিয়মিত নামাজ পড়ি। তবে সেখানকার নিষিদ্ধঘোষিত কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক ছিল না, এখনো নেই। দেশে আসার পর দুজনই একসঙ্গে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতকে ভর্তি হই। তারপর দুজন যৌথভাবে গাড়ির ব্যবসায় নামি। দুজনই ২০১৮ সালে বিয়ে করি। গাড়ি পুরনো হওয়ায় বিক্রি করে দিই। এরপর সাইফুল নিজেই ড্রামট্রাক কিনে নিজেই চালাত।’

এমরান বলেন, সাইফুলকে মারার এক ঘণ্টা পরই একজন ফোন করে আমাকে জানান, ‘সাইফুলকে ডাকাতরা মেরেছে’। দুজন বন্ধুকে নিয়ে পরদিন ঘটনাস্থলে ও হাসপাতালে যাই।

পুলিশের ওয়ারী জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার দ্বীন মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সন্দেহভাজন তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু তথ্য মিলেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত