সেই নবজাতক বিক্রি করেই বিল পরিশোধ

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৩৭ এএম

প্রসব বেদনা নিয়ে এক সপ্তাহ আগে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন এক সন্তানসম্ভবা মা। সেখানে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে এক ফুটফুটে ছেলে সন্তানের জন্ম হয় তার। কিন্তু চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার পালস-এইড জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিল পরিশোধ করতে নবজাতক সন্তাককে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভার বারোআনি গ্রামের বাসিন্দ তামান্না বেগম। সন্তান হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় সেই মা। সন্তানকে ফিরে পেতে সরকার ও বিত্তবান মানুষের সহায়তা চেয়েছেন তিনি।

ঘটনাটি গত ২৬ জানুয়ারির হলেও গত বুধবার রাতে হাসপাতালে শিশুটির অভিভাবকরা কান্নাকাটি করলে বিষয়টি জানাজানি হয়।

জানা গেছে, প্রেম করে ৫ বছর আগে তামান্না পার্শ্ববর্তী হানিরপাড় গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে আলমকে বিয়ে করেন। তবে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেনে না নেওয়ায় তারা আলাদা বাসায় ভাড়া থাকতেন। ইতিমধ্যে তাদের দুই সন্তান হয়েছে। গত সপ্তাহে তামান্নার প্রসববেদনা উঠলে আলম টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করেন। তবে না পেরে বাড়ি থেকে চলে যান তিনি। তামান্না তার এক স্বজনের থেকে কিছু টাকা নিয়ে ভর্তি হন ওই হাসপাতালে। 

তামান্না বেগম বলেন, প্রসববেদনা উঠলে আমার স্বামী টাকা জোগাড় করতে না পেরে মোবাইল বন্ধ করে ঘর থেকে চলে যায়। টাকা ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি না নেওয়ায় আমার খালা তার গহনা বন্ধক রেখে হাসপাতালে ভর্তি করায়। পরে সিজারের পরপরই টাকা চাওয়া হয় আমাদের কাছে। কিন্তু তখন টাকা পরিশোধ করার কোনো সামর্থ্য আমাদের ছিল না। তামান্নার অভিযোগ, হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ তাদের অবস্থা বিবেচনায় না নিয়ে টাকার জন্য চাপ দিতে থাকে। 

একজন আমাকে বিনামূল্যে রক্ত দিলেও রক্তের বিল দুই হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে অপারেশন, ওষুধপত্র এবং আনুষঙ্গিক খরচ নিয়ে প্রায় ৪০ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। তখন কাউসার নামের একজন এসে ছেলেকে বিক্রির প্রস্তাব দেয়। পরে বিলের চাপ ও নিজের চিকিৎসার খরচের কথা চিন্তা করে ৫০ হাজার টাকায় ছেলেকে বিক্রি করতে রাজি হই।

তামান্না বলেন, ছেলেকে বিক্রি করে বাড়ি ফেরার পর থেকে স্বামী তাকে সন্তান ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দেন। তাকে জানিয়ে দেন, ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে তার সঙ্গে সংসার করবেন না। দয়া করে আমার মানিককে আমার বুকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন আপনারা।

তিনি বলেন, জানি না আমি আমার সন্তানকে পাব কিনা। কারণ তারা আমার কাছ থেকে স্ট্যাম্প করেছে এ সন্তান আমি আর কোনো দিন দাবি করতে পারব না। তার ওপর ৫০ হাজার টাকা আমার মতো গরিব মানুষ কীভাবে তাদের দেব।

তামান্না বেগমের মা সেফালী বেগম বলেন, টাকার অভাবে আমার নাতিকে বিক্রি করতে হয়েছে। সন্তান হারিয়ে আমার মেয়ে এখন পাগলপ্রায়। আমরা গরিব মানুষ, এই টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। কেউ যদি দয়া করে আমাদের, তবেই আমার মেয়ে তার সন্তান ফিরে পাবে।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের মালিক প্রতিনিধি লিমন সরকার বলেন, বাচ্চা বিক্রির বিষয়ে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ কিছুই জানে না। ওই নারী তার সন্তান কী করেছেন সেটা তিনি জানেন। এই ঘটনার সঙ্গে হাসপাতালের কেউ জড়িত নয়।

এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী শরিফুল হাসান বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ বা আবেদন করেনি। তবে আমি খোঁজ নিচ্ছি বিস্তারিত জেনে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত