অপরাধ করে কেউ পার পাবে না এ কথা কি স্বস্তি আনে না প্রশ্ন জাগায়? কোন ধরনের অপরাধ, কার বিরুদ্ধে অপরাধ আর কে করেছে অপরাধ এ বিষয়গুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। সিনহা হত্যার দ্রুততম সময়ে বিচার হওয়ার পর ওসি প্রদীপের শাস্তি নিয়েও এই প্রশ্নই জাগছে সবার মনে। সিনহার আগে যারা নিহত হয়েছেন তাদের হত্যার বিচার, একরামের মেয়ের সেই যে জিজ্ঞাসা, বাবা তুমি কানতেছো কেন? তার উত্তর তো মেলেনি এখনো। প্রদীপ কি একাই অনেকের জীবন প্রদীপ নিভিয়েছে? তার পাশে এবং পেছনে কেউ কি ছিল না? মানুষের মৃত্যুর কথা তো বলা হচ্ছে, কিন্তু ক্রসফায়ারের নামে যে গণতান্ত্রিক নীতি নিহত হচ্ছে তা কি বহাল থাকবে? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে মতপ্রকাশের নিরাপত্তা বিঘিœত করা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন নিয়ে বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে দেশের প্রাণ, নদী হত্যার শত ঘটনা। বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা এবং সর্বংসহা ধরিত্রী কথা দুটো শুধু প্রচলিত তা-ই নয়, বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃতও বটে। দেশের নদী দখল ও দূষণের চিত্র দেখলে আর তার দখলদারদের চরিত্র দেখলে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। চোখে দেখার সঙ্গে সঙ্গে নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন দেখলে সন্দেহ সত্যে পরিণত হয়। এ কথা এখন সত্য যে, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক জনগণ কথাটি কাগজে লেখার বাইরে সমাজে ভিত্তি পায়নি। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সবচেয়ে বিপন্ন দশায় পড়েছে আমাদের নদীগুলো।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের গত ২০১৯ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, দেশের ৭৭০টি নদীর জমি দখল করেছে ৫৭ হাজার ৩৯০ ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান। তারা এটাও উল্লেখ করেছিলেন দখলদারদের অনেকেই স্থানীয় এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। সংসদীয় কমিটির কাছে জমা দেওয়া কমিশনের প্রতিবেদন এনআরসিসি জানায়, প্রতিটি বিভাগেই নদী ও নদীর তীরে বিশালাকার কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। দখলদাররা স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় সেগুলো ভেঙে ফেলা যায়নি। প্রতিবেদনে এনআরসিসি আরও বলেছে, বারবার চেষ্টা করেও বিভিন্ন সরকারি অবকাঠামোগুলোও সরানো যায়নি। একদিকে উচ্ছেদ, অন্যদিকে দখল সমানতালেই চলছে। ফলে ঢাকঢোল পিটিয়ে দখলদার উচ্ছেদ ও দখলমুক্ত করা হলেও ২০২০ সালে দেশের ৬৪ জেলায় নদী দখলদারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩ হাজার। এই হিসাব তুলে ধরা হয়েছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের পক্ষ থেকে, যা ২০১৮ সালের হিসাবে ছিল ৫০ হাজারের মতো। কমিশনের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে নদী দখলদারদের সংখ্যা ছিল ৫৭ হাজার। প্রতিবেদন অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি নদী দখলদার খুলনা বিভাগে। সেখানে সংখ্যাটি ১১ হাজার ২৪৫ জন। নদী দখলদারের সংখ্যা সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে ২ হাজার ৪৪ জন। ঢাকা বিভাগে নদী দখলদারের সংখ্যা ৮ হাজার ৮৯০ জন। ঢাকা জেলায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, ইছামতী, বালু, বংশী, গাজীখালী, কালীগঙ্গাসহ ১১টি নদী ও ২০১টি খালের উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে। ঢাকা জেলায় নদী দখলদারের সংখ্যা ৬ হাজার ৭৫৮ জন। নদী দখলের সঙ্গে যুক্তদের বেশির ভাগই রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে ৯টি নদী ও ২১৮টি খাল রয়েছে। সেখানে নদী ও খাল দখলদারের সংখ্যা ৭৮৫ জন। ছোট-বড় সব কটি নদী ও খাল দখল হয়েছে। বেশি দখল হয়েছে শিল্পায়নের নামে। সরাসরি নদীর জমি দখল করেই নির্মাণ করা হয়েছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
ফরিদপুর জেলায় ১৩টি নদী ও ১৫টি খাল রয়েছে। এখানে দখলদারের সংখ্যা ১ হাজার ৮৩৪ জন। টাঙ্গাইল জেলায় নদী দখলদারের সংখ্যা ১ হাজার ৭৮৮ জন। দখলদারের সংখ্যা ও নাম জানা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও সক্ষমতা না থাকার কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রত্যাশিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি বলে কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে গত বছর উচ্ছেদ অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
১ হাজার ৪৫৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন তাদের কার্যাবলি, দেশের নদ-নদী পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণ কার্যক্রম, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নদ-নদীর চিহ্নিত সমস্যা ও সমাধানে সুপারিশ, গৃহীত পদক্ষেপ ও অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এই প্রতিবেদনকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান হয়নি।
এরই মধ্যে তুরাগ নদী রক্ষা নিয়ে এক রিট মামলার রায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক নির্দেশনা দেয়। তুরাগ নদকে ‘লিগ্যাল পারসন, জুরিসটিক পারসন ও জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে দেশের নদ-নদী রক্ষায় প্রতিরোধমূলক বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে দেওয়া রায় দেশের ইতিহাসে এই প্রথম। এতে একজন মানুষের মতো নদীও আইনগত অধিকার পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক), ১৯ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জনগণের জানমাল, সম্পদ, স্বাস্থ্য, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই রায়ে ডকট্রিন অব পাবলিক ট্রাস্টকে ল’ অব দ্য ল্যান্ড ঘোষণা করে বেশ কটি সিদ্ধান্ত দিয়েছে আদালত। এতে বলা হয়েছে, দেশের সব নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রসৈকত, বন, খাল-বিল, জলাশয়-জলাধারের মালিক হিসেবে ট্রাস্টির দায়িত্ব পালন করবে রাষ্ট্র। নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় রক্ষার আইনগত অভিভাবক হবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের সুরক্ষা, সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শ্রীবৃদ্ধিসহ সব দায়িত্ব পালন করবে নদী রক্ষা কমিশন। অন্যদিকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নদী রক্ষা কমিশন যাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আদালতের রায়ে সরকারকে চার দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় দখলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর কঠিন সাজা ও জরিমানা নির্ধারণ করতে হবে। নদ-নদীর পাশে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অনাপত্তিপত্র নিতে হবে। বিষয়টি সরকারের সব বিভাগকে চিঠি দিয়ে জানাতে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আদালত বলছে, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবস্থান চিহ্নিত ও নির্ণয় করে একটি ডিজিটাল ডেটাবেইস তৈরি করতে হবে। সেই ডেটাবেইস দেশের সব ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। যেকোনো নাগরিক যেন নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নদ-নদীর ম্যাপ, তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে হবে।
নদী ও জলাশয়ের দখল বন্ধ করতে আদালত কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। এসবের মধ্যে আছে প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদকে নিজের এলাকার নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের নামের তালিকা জনসম্মুখে ও পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে। নদী বা জলাশয় দখলকারী বা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীরা ব্যাংক ঋণ পাওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হবেন। ঋণ আবেদনকারীর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে নদী দখলের অভিযোগ থাকলে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে এক ঘণ্টা নদী রক্ষা, সুরক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ, নদ-নদীর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। দেশের সব শিল্প-কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীর অংশগ্রহণে প্রতি দুই মাস এক দিন এক ঘণ্টা সচেতনতামূলক সভা বা বৈঠক করতে হবে। শিল্প মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে তিন মাসে একবার নদী বিষয়ে দিনব্যাপী সভা-সমাবেশ, সেমিনার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। আদালতের আরেক রায়ে বলা হয়েছে, নদীর সীমানার জায়গায় ক্রয়সূত্রে অন্যের মালিকানস্বত্ব সৃষ্টি হয় না। ঢাকার চার নদ-নদীর রিট মামলার রায়, সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ, পরিবেশ আইন, ১৯৯৫ ও জলাধার আইন, ২০০০-এর বিধান অনুযায়ী নদ-নদীর সীমানা দখল সম্পূর্ণ বেআইনি ও পরিবেশবিরোধী।
নদীর দেশ বাংলাদেশে একসময় ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ছিল। দখল, দূষণ ও ভরাটে হারিয়ে গেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। বর্তমানে ৫ হাজার কিলোমিটারেরও কম নদীপথে চলছে নৌযান। সারা দেশে ৫৩টি রুটের ১২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খননের জন্য ২০১২ সালে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প গ্রহণ করে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৪টি রুটে ১ হাজার ২৪ কিলোমিটার নৌপথ খননের কাজ ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল কিন্তু গত ৮ বছরে ৭৫ শতাংশ নদী খননকাজ শেষ হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্র থেকে জানা গেছে। বলা হচ্ছে, গোমতী ও ব্রহ্মপুত্রসহ আগামী ৪-৫ বছরে প্রায় ১০ হাজার নৌপথ উদ্ধার করা হবে। এসব আশাবাদের পাশাপাশি কয়েক দশকে চোখের সামনে নদীগুলো দখল হয়েছে এ কথা কেউ অস্বীকার করবেন না। সবাই আশাবাদ ব্যক্ত করেন, সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকলে দখলমুক্ত করা সম্ভব হবে। নদী ও পরিবেশ রক্ষায় যে আইন হয়েছে তা দিয়ে ক্ষমতাসীনদের নদী দখলের অভ্যাস দূর করা যাবে কি? আর্থিক ক্ষমতা আর রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছে নদী আর মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে দিন দিন। একদিকে ভারতের পানি আগ্রাসন, অন্যদিকে দেশে দখল দূষণ নদীকে বিপন্ন করে তুলছে।
খাবার পানি, গৃহস্থালি কাজ, মৎস্যসম্পদ আহরণ, কৃষিকাজ, শিল্প-কারখানায় ব্যবহার, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বনভূমি রক্ষাসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি সব কাজে যে পানি লাগে তার প্রধান উৎস নদী। নদী আমাদের বাঁচায় এখন দখল ও দূষণকারীর হাত থেকে নদীকে বাঁচাবে কে? গণতন্ত্রের উৎস শুকিয়ে গেলে রাজনীতি দূষিত হয় যেমন, পানির উৎস নদী দূষিত হলে জীবন, জীবিকা আর পরিবেশ যে বিপন্ন হয়ে যায় তা পানির দেশে আমরা উপলব্ধি করতে আর কত সময় লাগবে?
