একবার শিবরাম চক্রবর্তী পুকুর থেকে জল তুলছিলেন। এক ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি এত বড় বংশের সন্তান। আপনার বাপ, ঠাকুরদা এত বড় বংশের আর আপনি কি না গামছা পরে জল তুলছেন? হাসির সম্রাট বেশ গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, ‘বাপ, ঠাকুরদা, বংশ সব তুললেন তাতেও হলো না? শেষ পর্যন্ত গামছা তুলে কথা বললেন?’
উইকিপিডিয়া লিখেছে, ‘গামছা একটি পাতলা সুতির তোয়ালে। ভারতের পূর্বাঞ্চল যেমন পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশায় গামছা জনপ্রিয়। বাংলাদেশের বহুল ব্যবহৃত পোশাক।’ অভিধান অনুয়ায়ী গামছা শব্দের অর্থ গা মোছার জন্য ব্যবহার করা হয় এমন এক ধরনের কাপড়ের টুকরো। ইতিহাসবিদ ড. লীলা গৈগে লিখেছেন, অহোমের রাজার আমল (একাদশ শতক) থেকেই গামছার চল হয়। ‘আ হিস্ট্রি অব আসাম’ বইতে অ্যাডওয়ার্ড গেইটর জানিয়েছেন, ১৭৩৯ সালে একটি গামছার দাম ছিল ছয় পয়সা। এ থেকে বোঝা যায়, গামছার পেছনে রয়েছে কয়েকশ বছরের ইতিহাস।
আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় সস্তা একটি বস্ত্রখ- গামছা। শুধু গ্রামীণ নয়, শহুরে মানুষও গামছা ব্যবহার করে। একসময় ধনী-গরিব সবার ঘরে গামছার অবাধ বিচরণ ও কদর ছিল। গামছা সামান্য এক টুকরো বস্ত্রখন্ড হলেও এর উপযোগিতা এখনো অনেক। যে গামছা দিয়ে হাত-মুখ-শরীর মোছে। সেই গামছা পরে আবার গোসলও করে। এই গামছায় বেঁধে হাট থেকে বাজার করে নিয়ে আসে। কর্মক্লান্ত শ্রমিক গামছা বিছিয়ে এখানে-সেখানে শুয়ে বিশ্রাম নেন। গামছার বিড়া মাথায় রেখে মুটে বোঝা বহন করে। গামছা থাকে রাখালের মাথায়, কৃষকের ঘাড়ে-কোমরে। ক্ষেত-খামারে চাষি যখন তৃষার্ত থাকে তখন বউ-ঝি কিংবা পুত্র খাবারের থালা-বাটি গামছা দিয়ে আঁটসাঁট করে বেঁধে নিয়ে যায় মাঠে। গাঁয়ের বউ-ঝিরা শাড়ির ওপর গায়ে গামছা জড়িয়ে কলসি কাঁখে ঘাটে পানি আনতে যায়। প্রয়োজনে জেলেরা গামছা দিয়ে মাছও ধরে। সমাজে দরিদ্র শ্রমিক শ্রেণির মানুষরা পরিধেয় বস্ত্র হিসেবেও গামছা ব্যবহার করেন। ছোট বাচ্চারা কানামাছি খেলতেও চোখ বাঁধতে গামছার সাহায্য নেয়। কোনো কাজে সফল হতে আমাদের দেশে বলা হয় কোমরে গামছা বেঁধে নামতে। আবার কাউকে ধরে আনতে বলা হলেও বলা হয় গলায় গামছা বেঁধে ধরে আনতে। এ দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষরা গামছা ছাড়া একটা সুন্দর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জীবন ভাবতে পারেন না। আর এভাবেই এ দেশের মানুষের কাছে গামছা হয়ে উঠেছে আদরের পোশাক।
সহজ সরল গ্রামের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার বন্ধনকে মজবুত করেছে এই গামছা। ও কি ও বন্ধু পাগল ভোমরারে... যদি বন্ধু যাওয়ার চাও ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাও রে...। বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় এই ভাওয়াইয়া গানটির মধ্য দিয়ে গ্রামবাংলার নিখাদ ভালোবাসার অসাধারণ চিত্র ফুটে উঠেছে। আমাদের পল্লী কবি জসীমউদদীন ভালোবাসার মানুষটিকে গামছাবাঁধা দই দিয়ে আপ্যায়ন করতে চেয়েছেন। গামছা আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এবং বাংলার শাশ্বত রূপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। গামছা সব সময় হাতের কাছেই পাওয়া যায়। বিয়ে অনুষ্ঠান বা দেবতার পুজো, গামছা লাগে সর্বত্র। গামছা ছাড়া এসব অনুষ্ঠান একেবারে অচল। কোনো উৎসবে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজনে রান্না করেন বাবুর্চিরা। তারা নতুন গামছা ছাড়া রান্না করতেই বসবেন না। এটা পুরনো রেওয়াজ। অনুষ্ঠানের মঞ্চ সাজানোর কাজেও গামছা ব্যবহার হচ্ছে। বিছানার চাদর হিসেবেও বিছানো হচ্ছে। কয়েকটা বড় বড় গামছা দিয়ে হতে পারে জানালার পর্দা। আমাদের দেশে গামছার বহুবিধ ব্যবহার হয়। এখনো গামছার চাহিদা কমেনি। পথে-ঘাটে বের হলেই চোখে পড়ে রাস্তার পাশে মাল্টি-কালারের গামছা ঝুলছে। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার ইতিহাস।
সংগীতশিল্পীরাও গামছার প্রতি ঝুঁকেছেন। গামছা তাদের নিত্যব্যবহার্য কোনো বস্তু নয়। ভূষণও নয়, ফ্যাশন। ঢাকা ব্যান্ডের প্রধান গায়ক মাকসুদুল হক মাথায় গামছা বেঁধে দর্শক মাতিয়েছেন। নগর বাউল ব্যান্ডের গায়ক জেমস স্টেজ শো করার সময় কাঁধে গামছা রেখেছেন দীর্ঘদিন। আরও অনেকেই গামছাকে নানাভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। শিল্পের নামের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে গামছা। গামছা রাজনীতিতেও এসে গেছে। দল ও জাতীয় নির্বাচনের প্রতীকের মর্যাদা পেয়েছে।
যুগের হাওয়ায় গামছা পেয়েছে ভিন্নমাত্রা। গামছা জায়গা করে নিয়েছে পোশাকে। হেলাফেলার গামছা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল ও ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের হাত ধরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছেছে। উন্নতমানের গামছা তিনি বিদেশে পাঠাচ্ছেন। ফ্যাশন ডিজাইনার তাদের সুন্দরী মডেলদের গামছাকে পোশাক হিসেবে পরাতে দ্বিধাবোধ করেন না। বিবি প্রোডাকশনের ব্যবস্থাপক মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘বাঙালির পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে গামছা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নানা রূপ দেওয়া হচ্ছে। বানানো হচ্ছে শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, ব্লাউজ, স্কার্ট ও টুপি। এ ছাড়া বানানো হচ্ছে জুতা, ঝুড়ি সেট, ঝোলা ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ, পানির বোতল রাখার ব্যাগ, মোবাইল ব্যাগ, হাতের বালা ইত্যাদি। গামছা প্রিন্টের গহনাও বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
বান্টি আউর বাবলি ছবিতে অমিতাভ বচ্চনকে দেখা গেছে গামছা গলায় ঝুলিয়ে ধূমপান করছেন। সালমান খান গামছা গলায় দিয়ে গুলি ছুড়ছেন ‘এক খা টাইগার’ ছবিতে। ‘তাশান’ ছবিতে অক্ষয় গামছা বেঁধেছেন মাথায়। অনুরাগ কাশ্যপ তার গ্যাংগস অব ওয়াসিপুরের পাত্র-পাত্রীদের গলায় গামছা পরিয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে গামছামানব যদি কাউকে বলতে হয় তিনি গোবিন্দ। গলায়, মাথায়, হাতে কোমরে কোথায় গামছা বাঁধেননি তিনি। সুপারস্টার শাহরুখ খানের গায়েও গামছা শার্ট দেখা গেছে।
নব্বই দশকের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) প্রচারিত ‘শরীরটাকে সুস্থ রাখুন’ অনুষ্ঠানে দেখানো হয়েছে কীভাবে আমরা আধুনিক ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি ছাড়া শুধু একটা গামছা দিয়ে সেসব ব্যায়াম করতে পারি বিকল্প হিসেবে। কিন্তু আমাদের মেট্রোপলিটন মন গামছাকে আপন করে নিতে চায় না। তাই অভিজাত পরিবার থেকে গামছা বিদায় হয়েছে অনেক আগেই। আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি। তোয়ালে আর টিস্যুর দাপটে গামছা অনেকটাই কোণঠাসা। ভারতীয় উপমহাদেশে তোয়ালের তুলনায় গামছা জনপ্রিয়, কেননা এটা ইউরোপীয় ঘরানার তোয়ালের মতো মোটা নয়, পাতলা। যা এই উপমহাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই। এখন মধ্যবিত্ত, এমনকি নিম্নবিত্তের ঘরেও টিস্যু ঠাঁই করে নিয়েছে। অথচ সব কাজের কাজি গামছা। গামছা ব্যবহারের সুফলটা আমরা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলাম না।
মাল্টি ব্যবহারের কারণে গামছাকে তুলনা করা চলে আধুনিককালের মাল্টি ফাংশন মোবাইল ফোনের সঙ্গে। মোবাইল ব্যবহারে যত অপশন রয়েছে, তার চেয়ে বেশি অপশন রয়েছে গামছায়। গামছা পুরনো হয়ে গেলেও নানা কাজে ব্যবহার করি। অথচ সেই গামছাকে আমরা বিশ্ব দরবারে সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলাম না। আমরা ‘গামছা তুলে কথা’ বললাম না জোরালোভাবে। গামছার ‘ভৌগোলিক নির্দেশক’ বা ‘জিআই’ (জিওগ্রাফিকাল ইনডিকেশন) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিও আমাদের হাতে নেই। আর তাই বিশ্বায়নের পথেও এগিয়ে যেতে পারল না আমাদের গামছা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট
