বৃষ্টিতে বড় ক্ষতির মুখে আলুচাষিরা

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০৬:৫৩ এএম

মাঘ মাসের বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশায় আলুর ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়ায় ক্ষেতেই আলু পচে যাওয়ার ঝুঁকি আছে বলে মনে করছেন তারা। তাই কোনো কোনো এলাকার চাষিরা অপরিপক্ব আলু তুলতে শুরু করেছেন। তারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে একবার আলুর বীজের ক্ষতি হয়েছে। এবার ঝুঁকিতে পড়েছে ফসল। তবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, এ বৃষ্টিতে আলুর খুব বেশি ক্ষতির আশঙ্কা তারা করছেন না। তারা বলছেন, আলু ক্ষেতে পানি জমে না গেলে ভয়ের কোনো কারণ নেই; বরং কিছুটা আর্দ্রতা থাকলে তা আলুর জন্য ভালোই হবে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে ৯৫ শতাংশ আলু তোলা হয়ে গেছে। তাই পরে বাজারেও এর প্রভাব পড়ার শঙ্কা নেই। এরপরও যে আলু এখন মাঠে রয়েছে তার ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে যেসব এলাকায় বিএডিসির ফার্ম বা জোন রয়েছে, সেসব এলাকায় আলুর ক্ষতি হয়নি। কারণ এখানে আধুনিক টেকনোলজিসহ বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে আমাদের কাছে বিভিন্ন জেলা থেকে খবর আসছে। যারা দেরিতে আলু রোপণ করেছেন, তাদের আলু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, যেসব এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে গেছে, সেসব অঞ্চলে একটা ভালো খবর হলো মাটির তাপমাত্রা কম। এতে করে আলুর ক্ষতির আশঙ্কা কম। যদিও বৃষ্টির পর তাপমাত্রা বেড়ে গেলে অনেক সময় মাটির তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ সময় আলুর ক্ষতির শঙ্কা থাকে। কিন্তু এবার যেহেতু তাপমাত্রা এখনো কম আছে, তাই ক্ষতির বদলে ভালোই হবে আশা করছি।

তিনি আরও বলেন, এ বছর আমাদের আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ কোটি মেট্রিকটন। সামনে যদি বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয়, তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।

তবে দেশের বিভিন্ন এলাকার আলুচাষিরা বলছেন ভিন্ন কথা। অনেক কৃষকের দাবি, বৃষ্টিতে পানি জমে ক্ষেতেই নষ্ট হতে পারে কষ্টের ফসল। দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত:

রংপুর নগরীসহ বিভাগজুড়ে আকস্মিক বজ্রসহ ঝড়ো হাওয়া ও অবিরাম বৃষ্টি ও পরে ঘন কুয়াশায় আলুক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় কৃষকদের বরাতে জানিয়েছেন জেলাটির প্রতিনিধি। কৃষকরা বলছেন, শ্যালো মেশিনসহ অন্যান্য পন্থায় ক্ষেত থেকে সেচ সরালেও আবারও পানি জমা হচ্ছে। তাই অনেক কৃষক অল্প বয়সী ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন। অনেক কৃষকই চড়া সুদে ঋণ নিয়ে আলু চাষ করে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ ৫ জেলায় ৯৭ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন উন্নত জাতের আলুর আবাদ করা হয়েছে। আর লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৯৬ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রংপুর জেলায় ৫৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর। নীলফামারীতে ২২ হাজার ১০ হেক্টর, লালমনিরহাটে ৫ হাজার ৬২৫ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৬ হাজার ৫৯৫ হেক্টর এবং গাইবান্ধায় ৯ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ করা হয়েছে।

সরেজমিন রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু করে শনিবার পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে জেলার ৬টি উপজেলায় আলু, সরিষা ও ভুট্টাক্ষেত পানিতে ভরে গেছে। অনেক এলাকায় আলুক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। ফসল বাঁচাতে আলুক্ষেত থেকে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে পানি অপসারণ করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। তবে শনিবার পানি অপসারণ করলেও আশপাশের পানি এসে রবিবার সকালে আলুক্ষেতে আবারও জমা হয়।

রংপুর নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজপাড়া এলাকার আলুচাষি আলম মিয়া বলেন, ‘মোর ১৬-১৭ বছরের অভিজ্ঞতা মাটি হয়া গেল। দুই দিনের ব্যবধানে মোড় সউগ আলু পচি গেল। মোর সউগ শেষ হয়া গেল।’

একই ওয়ার্ডের ডাক্তারপাড়া পশ্চিম কোবারু এলাকার কৃষক মোখলেছার রহমান জানান, তিনি ৪ দোন জমিতে আলুর আবাদ করেছেন। এর মধ্যে ৩ দোন ক্ষেতে পানি জমেছে। শ্যালো মেশিন দিয়ে অপসারণ করলেও ফের জমা হচ্ছে পানি।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওবায়দুর রহমান ম-ল দেশ রূপান্তরকে জানান, এবার রংপুর বিভাগে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। হঠাৎ দুই দিনের বৃষ্টির কারণে নিচু জমির আলুক্ষেতের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আলুচাষিদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

মুন্সীগঞ্জেও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার আলুক্ষেত। এতে আলু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। জেলার সদর ও টঙ্গীবাড়ি উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সরেজমিনে দেখা গেছে, কোদাল ও বালতি হাতে কৃষক জমির পানি সরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এক জমি থেকে অন্য জমিতে ঘুরে ঘুরে পানি নিষ্কাশনের চেষ্টা করছেন তারা।

এ বছর আলু রোপণ শুরুর মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে বীজ আলু নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ধারদেনা করে কৃষক পুনরায় আলু চাষ করেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এবার ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কম জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। তা ছাড়া বৃষ্টির কারণে অধিকাংশ জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে দেরিতে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৭ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে বৃষ্টির কারণে আবাদ হয়েছে ৩৫ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমিতে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খুরশীদ আলম বলেন, বৃষ্টিতে কী পরিমাণ জমি তলিয়েছে, তার সঠিক তথ্য আমাদের হাতে নেই। নিচু জমির কিছু আলু তলিয়ে গেলেও উঁচু জমিতে বৃষ্টি হওয়ায় আলুর জন্য ভালো হয়েছে। কৃষকের সেচের কাজটি হয়ে গেছে।

এদিকে অসময়ে বৃষ্টিতে ক্ষতির শঙ্কা করছেন জয়পুরহাটের আলুচাষিরাও। পানি ভরা জমি থেকে আলু তুলে বিক্রি করে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না তারা। এ অবস্থায় জেলার কৃষকরা সরকারি সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার জয়পুরহাটে ৪০ হাজার ২৮০ হেক্টর আলু, ১২ হাজার ৮৫৫ হেক্টর সরিষা ও ২ হাজার ৩৮৬ হেক্টর জমিতে গম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি বিভাগ। তবে হঠাৎ বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় এসব ফসলের জমিতে পানি জমে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শফিকুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টির কারণে কিছু আলুর জমিতে পানি জমে গেছে। কৃষকদের জমি থেকে পানি সেচে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত মনিটরিং করছেন।

অসময়ে বৃষ্টিতে গাইবান্ধায় আলুর ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাই প্রণোদনার দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাত উপজেলায় ১০ হাজার ৩১৮ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির আলু।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, দ্রুত আলুর জমি থেকে পানি নিষ্কাশন করতে হবে। পানি নিষ্কাশন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছত্রাকনাশক ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। বিষয়টি উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের জানানো হচ্ছে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন রংপুর, মুন্সীগঞ্জ, জয়পুরহাট ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত