নো ম্যানস ল্যান্ডে দেখা হয় দুই সম্রাজ্ঞীর

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:২০ পিএম

নূর জাহান ও লতা মঙ্গেশকর পাকিস্তান-ভারত দুই বৈরী প্রতিবেশী দেশের সংগীত আকাশের তারা; সম্রাজ্ঞী। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার ভাগাভাগির আগে তারা কাছাকাছি এসেছিলেন, সেই সম্পর্ক পরেও ছিল অমলিন। তাদের একবার দেখা হয় সীমান্তের ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’!

সুরেলা গায়কির পাশাপাশি নিখুঁত উর্দু উচ্চারণের মিশেলে চল্লিশের দশকে বলিউডে দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন নুর জাহান। স্বয়ং সাদাত হাসান মান্টো বই ‘মান্টো নামা’য় নুর জাহানের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। কিংবদন্তি শিল্পী গুলাম হায়দরের কাছে প্রশিক্ষিত এ শিল্পী তত দিনে ‘খানদান’, ‘নওকর’, ‘দোস্ত’ সিনেমায় গেয়ে ফেলেছেন। ‘বড়ী মা’, ‘আনমোল ঘড়ি’, ‘জুগনু’তে তাক লাগানো পারফরম্যান্সে অনুপ্রাণিত করছেন পরবর্তী প্রজন্মকে।

তেমন সময়েই ধীরে ধীরে নিজেকে মেলতে শুরু করেছেন লতা মঙ্গেশকর। তার প্রথম দিকের গান শুনে উস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খান, গুলাম হায়দারের মতো সংগীতশিল্পীও ভবিষ্যতের তারকাকে পড়ে ফেলেছিলেন। এ হেন উঠতি প্রতিভা প্রেরণা খুঁজতেন নুর জাহানের সংগীতে। শুরুর দিকে তাকে অনুসরণের চেষ্টাও করতেন বলে মনে করেন অনেকে। দিলীপ কুমার-রাজ কাপুর অভিনীত ‘আন্দাজ’ সিনেমায় লতার কণ্ঠে ‘উঠায়ে যা উনকে সিতম’ গানে তো অনেকেই নুর জাহানের ছায়া দেখেছিলেন।

এমন দুই শিল্পী ‘বড়ী মা’ (১৯৪৫) সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। পরে লতা বলেছিলেন, ‘বলতে দ্বিধা নেই, প্রত্যেকের যেমন রোল মডেল থাকে, আমার আদর্শ ছিলেন নুর জাহান। ছোটবেলা থেকে ওনার গান শুনে বড় হয়েছি। তার গানের নোটস মনে গেঁথে গিয়েছিল।’

অন্য দিকে নুর জাহানও বারবার স্বীকার করেছেন, লতার প্রতিভায় তিনি মুগ্ধ। নিছক প্রশংসা নয়, একে অপরের সম্পর্কও ছিল মধুর।

ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার তখন বছর চারেক কেটে গেছে। এমন সময়ে একবার অমৃতসরে গানের রেকর্ডিংয়ে যাচ্ছিলেন লতা। মুখ্য উদ্দেশ্য সংগীত হলেও নুর জাহানের সঙ্গে একবার দেখা করতেও উন্মুখ ছিলেন।

তখন নুর জাহান থাকতেন লাহোরে। অমৃতসর থেকে সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছতে লাগে কয়েক ঘণ্টা। আবেগপ্রবণ হয়ে লতা ফোন করেন নুর জাহানকে। তখন টেলি যোগাযোগ এত সহজলভ্য ছিল না। কিন্তু দুই সম্রাজ্ঞী যখন কথা বলেন তখন সময়ের হিসাব আর কে-ই বা রাখে! একে অপরের খোঁজ নেওয়া তো বটেই ফোনে গল্পও জুড়ে দেন দুজনে। অনেক দিন পরে খুব আপন মানুষের কণ্ঠস্বর শুনলে যেমনটা হয় আর কী। শুধু সংগীত নয়, ব্যক্তি জীবনের সুখ-দুঃখও বিনিময় করেন দুজনে।

দীর্ঘ ফোনালাপে সাক্ষাতের ইচ্ছে যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। এত কাছে থেকে ফিরে যেতে চাননি লতা। তা হলে উপায়? ঘনিষ্ঠ বন্ধু তথা সুরকার সি রামচন্দ্রের দ্বারস্থ হন।

নিজস্ব যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে দুই কিংবদন্তি শিল্পীর সাক্ষাতের বন্দোবস্ত করেন রামচন্দ্রই। কিন্তু এত কম সময়ে সীমান্ত পেরোবেন কীভাবে! তার জন্য যে নানা আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য কাউকেই সীমান্ত পেরোতে হয়নি। কিন্তু সফল হয়েছিল ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষাটুকু। ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’ উপস্থিত হন দুজনেই। এমনভাবে গোটা বিষয়টি আয়োজন করা হয়েছিল, যাতে কোনো দেশের সরকারকেই বিব্রত হতে না হয়।

রামচন্দ্র তার জীবনীগ্রন্থে লিখেছেন, লতাকে দেখে নুর জাহান ছুটে আসেন। জড়িয়ে ধরেন একে অপরকে। যেন বহু দিন বিচ্ছিন্ন দুই বন্ধুর মেলবন্ধন। আবেগের অশ্রুজলে সিক্ত হয়ে যান দু’জনেই। রামচন্দ্র লিখছেন, ‘তারা ছাড়াও অকুস্থলে উপস্থিত সকলেই ওই দৃশ্য দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। এমনকি দু-দেশের সেনাদেরও চোখ ভিজে যায় আবেগে।’

রামচন্দ্রের কথায়, ‘আমরা মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলাম। ওরাও লাহোরের থেকে এনেছিলেন। নুর জাহানের স্বামীও ছিলেন সেখানে। সেই স্মৃতি কখনো ভুলব না।’ কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফের নিজেদের গন্তব্যে ফিরে যান লতা-নুর জাহান।

এর অনেক বছর পরে ১৯৮২ সালে কনসার্টের জন্য তৎকালীন বম্বে আসেন নুর জাহান, পারফর্ম করেন লতাও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত