(পঞ্চম কিস্তির পর)
জ্ঞান বাবুর পুনর্বহালের রায় দিলাম ১৯৯৬-এর ২৭ মে। ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাল। রায় গেছে আইন-বিচার মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ডেপুটি কমিশনারেরও বিরুদ্ধে। ১৯৯৪ ছিল নির্বাচিত সরকারের কাল। সে বছর নীলফামারীতে এক ভায়োলেশন মামলায় ডেপুটি কমিশনারের সিভিল জেলের রায় দিয়ে পড়েছিলাম খোদ আইনমন্ত্রীর কোপে। হাতিয়ায় দ্বীপান্তর প্রায় দিয়েই ফেলেছিলেন, সে-যাত্রা রক্ষা হয় তেপান্তরের এই নড়াইলে নিক্ষিপ্ত হয়ে (থাকার সরকারি কোয়ার্টারটা ছিল গোচরে)। সে বিড়ম্বনা কিছু বিবৃত আছে আমার ‘টেলিফোন বিলোপন’-এ। ১৯৯৫-এর শেষভাগে জ্ঞান বাবুর সাক্ষী শেষে মন্ত্রণালয়ের সময় নেওয়া শুরু হলে সে দুঃস্মৃতি ভেসে উঠল মনে। রায় যদি যায় খোদ আইন সচিবের বিরুদ্ধে মন্ত্রী এবার দ্বীপান্তরটা দিয়েই ছাড়বেন! সেই তিনিই তখনো গদিতে। সামনেই নির্বাচন, আন্দোলনও চলছে। গদি উল্টাতেও পারে! আমার ‘অশুভস্য কাল হরণ’ হয় সরকারেরই সময় নেওয়ায়। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেই তার গদি গেল, সরকার গেল ৩০ মার্চে। এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সরকারের সাক্ষীও এলো জ্ঞান বাবুর মামলায়। রায় লিখলাম বেশ খাটনি করে, থাকলাম বহাল তবিয়তে।
পুনর্বহাল হলো না জ্ঞান বাবুর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ১২ জুনের পরে দিয়ে গেল নির্বাচিত সরকার। হায় খোদা! পুনর্বহাল না করে জেলা জজে আপিল করে বসল সেই সরকার ১৯৯৬-তেই। আচম্বিতে ১৯৯৭-এর মে-র পহেলায় আমার বদলি হয়ে গেল আরেক তেপান্তর সাতক্ষীরায়। সেই রায়ের কোনো দায় ছিল কি না জানা হয়নি, মাস সাতেক আরও বাকি ছিল বদলির স্বাভাবিক সময় তিন বছর পুরতে। পরে এক দিন খবর পেলাম, আমার খাটনি মারা গেছে নড়াইলের সাব জজ প্রথম আদালতে। সরকারের যুক্তিই মনে ধরে হুজুর বাহাদুরের, সেই আপিল (জেলা জজের কাছ থেকে পেয়ে) মঞ্জুর করে আমার রায় উল্টে দিয়েছেন ১৯৯৯-তে, খারিজ করে দিয়েছেন জ্ঞান বাবুর মামলাটাই। বেচারা জ্ঞান বাবু! ১৯৭৮-এ সামরিক সরকারের কোপে ছাঁটাই হলেন বিনা দোষে, আশার আলো যা-ও দেখেছিলেন ১৮ বছর পরে মামলাখানায় জিতে, সলতেখানাই পুড়ে গেল আপিলে তিন বছর লড়ে। আর কী করবে! খেতে হবে ওকালতি করেই! সিনিয়র সহকারী জজ থেকে সাব-জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ হয়ে জেলা জজ হতে আমার কেটে গেল আরও ১৪ বছর। এ-প্রান্তর সে-প্রান্তর ঘুরে পড়েছি সিলেটে। নড়াইলে আমার জেলা জজ বহু আগেই গেছেন অবসরে। কুশলাদি বিনিময় চলত ফোনে। ২০১৩ সালে এক দিন বললেন, তোমার রায় তো টিকে গেছে হাইকোর্টে। কোনটা স্যার? সেই যে, জ্ঞানেন্দ্র নাথ বাঁড়ৈ-এর। জ্ঞান বাবু তবে রিভিশনেও গিয়েছিলেন! বলিহারি ধৈর্য, ভরসা ছাড়েননি বিচারে! হাইকোর্টের রায়টা তবে তো দেখতে হয়, জানতে হয় কী অবস্থা তার পুনর্বহালের! নম্বর জোগাড় করে ধরলাম তাকে মোবাইল ফোনে। এই প্রথম আলাপ ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে, কাছেও ঘেঁষেননি আমার বিচারকালে। ফরিদপুরেই আছেন দেখি ওকালতিতে। জানালেন, আপিলে হেরে রিভিশনে গিয়েছিলেন আমার রায়ের জোরে। কতজনে কতভাবে সেই রায়ের প্রশংসা করেছেন হাইকোর্টের শুনানিতে। হাইকোর্টের রায়ের কপি চাইলে জানালেন, রিপোর্টেড হয়েছে ২১ (২০১৩) বিএলটি (এইচসিডি) ৩ পৃষ্ঠায়। পুনর্বহালের কী খবর? জানালেন, হাইকোর্টের রায়ের কপি পেয়েই দরখাস্ত দিয়েছেন আইন-বিচার মন্ত্রণালয়ে। ফাইল উঠছে ওপরে, সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে। আপিল বিভাগে যাওয়ার তো গ্রাউন্ড নেই মন্ত্রণালয়ের। হাইকোর্টের রায়টা দেখলাম বিএলটিতে। জ্ঞান বাবু রিভিশনটা করেছিলেন ১৯৯৯-তেই। শুনানির সিরিয়াল পায় ১৩ বছর পরে, রায় হয়েছে ২০১২-এর ৮ আগস্টে। দাঁত কামড়ে এত দিন পড়েছিলেন জ্ঞান বাবু অজ্ঞান না হয়ে! যাক, তবু যদি আশা পুরে!
আমার অবসরের সময় ঘনিয়ে এলো। দরখাস্তের কাগজপত্র গোছাচ্ছি ২০১৯-এর শুরুতে। এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-১-এর এক কর্মকর্তা ফোন করে বললেন, জ্ঞান বাবুর পুনর্বহালের রায় দিয়ে আমি নাকি ঝামেলা বাধিয়েছি। ওরে বাবা! ধরা খেলাম এসে চাকরির শেষকালে! পেনশন আর হয়েছে! টেনশনে মরি। জিজ্ঞেস করলাম, কেন ভাই, কী হয়েছে? বললেন, বাস্তবায়ন হবে কীভাবে? বললাম, এত দিন পরে? হাইকোর্টে আমার রায় বহাল হয়েছে তো ২০১২-তে! জানা গেল, ২০১৪-তে মন্ত্রণালয় লিভ পিটিশন করেছিল। ৫১৭ দিন (প্রায় দেড় বছর) দেরি করায় তামাদিদোষে আপিল বিভাগ খারিজ করেছে ২ বছর চলার পরে ২০১৬-এর নভেম্বরে। তারও ২ বছর পার হয়েছে। এখন তাই রায় বাস্তবায়নের কথা হচ্ছে। তাহলে আর সমস্যা কী? বললেন, জ্ঞান বাবুর অবসরের বয়সটা তো পার হয়ে গেছে ২০০৬-এর জানুয়ারিতে। পুনর্বহাল আর হবে কী করে! বললাম, সে কথা তো হাইকোর্টের ২০১২ সালের রায়ে থাকার কথা! জানালেন, আমার দেওয়া রায়টা বহাল ছাড়া আর কোনো নির্দেশনা নেই তাতে। ভারি মুশকিল তো! তখন যদি জানতাম পুনর্বহালের এই হাল করে বাস্তবায়ন করবেন ২০১৯-এ তাহলে, নির্দেশনাটাও দিয়ে দিতাম ১৯৯৬-এর রায়ে। বিচারের আসল ফল পচিয়ে দিলেন আইন-বিচার মন্ত্রণালয়ে! আঁটিটুকু ফেরত দেন! পুনর্বহাল তো মারা গেল আইন-বিচার মন্ত্রণালয়ে! তার জ্যেষ্ঠতা, চাকরির সুযোগ-সুবিধাসহ বকেয়া বেতন-ভাতা দেওয়ার আদেশও তো ছিল আমার রায়ে। সেগুলো তো দেবেন! অবসর দেখিয়ে পেনশনটা তো দেবেন!
তারপর আর খবর নেই। জ্ঞান বাবুর তবে আঁটিটা জুটেছে! ২০১৯-এর জুনের শুরুতে আমার অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) হয়ে গেল। সবেতন নতুন এ-বেকার জীবন সয়ে উঠতে উঠতে বছর গেল প্রায় গড়িয়ে। ২০২০-এর মার্চের শেষদিকে পড়ে গেল করোনা-ছুটি। বাইরে বেরোলেই করোনার আগে ধরবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে পুলিশে! ঘরে থাকুন, ঘরে থাকুন! পত্রিকা-টিভি আর ফেইসবুক-ইউটিউবে আক্রান্ত আর নিষ্ক্রান্তের হিসাব! সহন না যায়! অবসরোত্তর ছুটিও শেষ হয়ে আসছে, পেনশনের দরখাস্ত দিতে হবে। অফিস-আদালত সব আছে করোনা-ছুটিতে। ছুটির একটু ফাঁক হতেই পহেলা দিনেই (৩১ মে) দরখাস্ত দিয়ে এলাম মন্ত্রণালয়ে। আরও মাসখানেক গেল মন্ত্রণালয় থেকে এজি অফিস হয়ে গ্র্যাচুইটির চেক আর পেনশন বেরোতে। স্বস্তির শ্বাস নিয়েই মনে হলো, সাবেক মুন্সেফ জ্ঞান বাবুরও তো এই মন্ত্রণালয় থেকে এসব পাওয়ার কথা। পচা ফলের আঁটি কত বড় পেলেন! নম্বরটা খুঁজে বের করে ফোন করলাম। বললেন, কিছুই পাননি। কেন? জানা গেল, আইন-বিচার মন্ত্রণালয় ২০১৯-এর ৪ মার্চে তাকে নড়াইলের সাবেক মুন্সেফ বলে ১৯৭৮-এর ১ মে (ছাঁটাইয়ের দিন) থেকে ২০০৬-এর ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চাকরিরত গণ্য করে বকেয়া বেতন-ভাতা ও আর্থিক সব সুবিধা দেওয়ার আদেশ জারি করে। সেই আদেশ নিয়ে নড়াইলে ছুটলেন পুনর্বহাল না পাওয়া নাজেহাল সাবেক মুন্সেফ। ফরিদপুর-নড়াইল করে করে দেখা দিল নতুন ভেজাল! চলে যাওয়া ২৮ বছরের ফিক্সেশন হবে কীভাবে! শুরু হলো চিঠি চালাচালি, হিসাবরক্ষণ কার্যালয়, জেলা জজ অফিস আর মন্ত্রণালয়ে। বহুদিন বাদে ব্যাখ্যা মিলল মন্ত্রণালয়ের। বহুদিন ধরে হিসাব-নিকাশ করে বিল বানিয়ে দেখা গেল সেই টাকার বরাদ্দ নেই নড়াইল জজ কোর্টের বাজেটে। বাজেট বরাদ্দের জন্য মন্ত্রণালয়ে লেখা হলো তো করোনা পড়ে গেল। করোনার এই মহামারীকালে আর পারছেন না মন্ত্রণালয়ে ছুটতে, বাহাত্তরে বুড়ো অসুস্থ শরীরে পড়ে আছেন ঘরে। চেয়ে আছেন ঈশ্বরের পানে। কি আর বলি! কী হয় জানাবেন বলে ছাড়লাম।
বছর ঘুরে ২০২১-এরও অর্ধেক যায়, কোনো খবর নেই জ্ঞান বাবুর। ভয়ে ভয়ে রিং দিলাম মোবাইল ফোন নম্বরে। না, আছেন এখনো। জানালেন, ২৮ বছরের বকেয়া বেতন-ভাতার টাকাটা পেয়েছেন মাত্র কিছুদিন আগে। পেনশন, গ্র্যাচুইটি? এখনো হয়নি। দরখাস্ত করেছেন, প্রক্রিয়া চলছে মন্ত্রণালয়ে। পেলে জানাবেন, বলে ফোন রাখলাম। ২০২১ প্রায় যায় যায়, জানাচ্ছেন না কিছু। ফোন করলাম ২৫ নভেম্বর সকালে। রিং হলো, ধরলেন না। কিছুক্ষণ পরে রিং ব্যাক হলো, ধরলাম। মহিলা কণ্ঠ! জিজ্ঞেস করলাম, এটা তো জ্ঞান বাবুর নম্বর! উনি নেই! না, উনি মারা গেছেন। জবাব এলো কান্নাভেজা কণ্ঠে। কবে? গত ২২ তারিখ রাতে। মিসেস জ্ঞান বাবুর কাছে জানা গেল, নানা জটিল রোগ বাসা বেঁধেছিল জ্ঞান বাবুর শরীরে। ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। করোনাকালে ওকালতি বন্ধ রেখে ঘরে থেকে থেকে বেড়ে যায় আরও। ফরিদপুরের চিকিৎসা ফুরিয়ে বেগতিক দেখে কিছুদিন আগে আনা হয় ঢাকার এক হাসপাতালে। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে গেছেন একেবারেই চলে। মৃত্যুর আগে গ্র্যাচুইটির চেকটা পাওয়া গেছে হাসপাতালে আসার পরে। সেটা আর জেনে যাওয়া হয়নি মৃত্যুপথযাত্রী জ্ঞান বাবুর। পেনশন লাগানো বাকিই থেকে গেছে। বিচারের ফল এই তো পেলেন! আইন-বিচার মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে বিচার চেয়ে চেয়ে বিনা দোষে বিচারকের চাকরি খোয়ানো সাবেক মুন্সেফের ৪৩ বছর ছোটার কাণ্ড গেল। সেনাতন্ত্র, গণতন্ত্র কত আমল এলো-গেল। সরকারের স্বভাব থাকল সরকারের মতো! আইন-বিচারের কতজন মন্ত্রী হয়ে, কতজন সচিব হয়ে এলো-গেল। আইন-বিচার মন্ত্রণালয় থাকল মন্ত্রণালয়ের মতো! গোড়া থেকে একবারে শেষ পর্যন্ত সবকটা আদালত ঘুরতে হলো। বিচার চলল আপন গতিতে! বিচারের বাণী কাঁদে কি শুধু বিচারালয়ে! মার খায় আরও কত কতখানে! বিচারের কতখানি ফল দিতে পারে শুধু একা রায় দেওয়া বিচারক! বিচারকের প্রাণও কাঁদে! (সমাপ্ত)
লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক
