ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা

গ্রেপ্তার হয়নি সাতকানিয়ার অস্ত্রধারীরা

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:৫৬ এএম

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট অশান্তির দাবানল চলছেই। নির্বাচনের দিন প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি ও সহিংসতায় দুজন নিহতের তিন দিন পার হলেও গ্রেপ্তার হয়নি কেউ। এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে কাঞ্চনা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যানের ওপর হামলা হয়েছে। এতে নতুন করে এলাকায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। ফের সহিংসতার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে নির্বাচনের দিন চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যকার সংঘর্ষে দুজন নিহতের ঘটনায় সাতকানিয়া থানায় গতকাল বুধবার পৃথক হত্যা মামলা হয়েছে।

অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার এসএম রশিদুল হক। গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের দিন অস্ত্রবাজিতে জড়িত বেশ কয়েকজন শনাক্ত হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। বাকিদেরও ধরা হবে। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতি শান্ত রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।’

শেষ ও সপ্তম ধাপে গত সোমবার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয়। এ নির্বাচন ঘিরে আগে থেকেই কয়েকটি ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে হুমকি-পাল্টা হুমকি, হামলা-পাল্টা হামলায় উত্তেজনা দেখা দেয়। নির্বাচনে আধিপত্য বিস্তারের জন্য অনেক প্রার্থী বহিরাগত অস্ত্রধারী জড়ো করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ফলে নির্বাচনের দিন বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা ছিল। নির্বাচন কমিশনও (ইসি) ১৬টির মধ্যে ছয়টি ইউনিয়নকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছিল।

তবে ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গৃহীত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে মাঠে অবস্থান নেয় স্থানীয় ও বহিরাগতরা। এরই জেরে উপজেলার নলুয়া, বাজালিয়া, সোনাকানিয়া, ঢেমশা, চরতি, খাগরিয়া, কালিয়াইশ, ছদাহাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজি করতেও দেখা যায়।

পুলিশ জানায়, নলুয়া ইউনিয়নের মরফলা বোর্ড ভোটকেন্দ্র এলাকায় দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে মো. তাসিব (১৩) নিহত হয়। সে মরফলা এলাকার জসিম উদ্দিনের ছেলে এবং স্থানীয় মরফলা আরএমএন উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল। তাসিবকে প্রতিপক্ষের লোক মনে করে নৌকা প্রতীকের সমর্থকরা কুপিয়ে হত্যা করে জানান তার স্বজনরা।

এ হত্যাকাণ্ডের আগে কেন্দ্রটিতে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী লিয়াকত আলীর লোকজন অবস্থান নিলে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মিজানুর রহমানের অনুসারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়ানো তাসিবকে কুপিয়ে চলে যায় কয়েকজন। তাসিবের চাচা মিজানুর রহমান নলুয়া ইউপি নির্বাচনে সদস্য প্রার্থী ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, কেন্দ্রের বাইরে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর অনুসারীরা মারামারি করছিল। একপক্ষ তাসিবকে কারও সমর্থক মনে করে কুপিয়ে জখম করে। অনেকের মতো ভোটগ্রহণ দেখতে এসেছিল সে। কিন্তু তাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে।

অন্যদিকে বাজালিয়া ইউনিয়নে বোর্ড অফিস ভোটকেন্দ্রের বাইরে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী চেয়ারম্যান প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আবদুস শুক্কুর (৩৫)। তিনি ওই ইউপিতে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী তাপস কান্তি দত্তের অনুসারী ছিলেন এবং নগরীর শুল্কবহর এলাকা থেকে ভোট করতেই বাজালিয়া গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আনারস প্রতীকের মো. শহিদুল্লাহ চৌধুরীর সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন শুক্কুর। এসব হত্যাকাণ্ডের তিন দিনের মাথায় গতকাল সাতকানিয়া থানায় পৃথক হত্যা মামলা করা হয়।

এদিকে নির্বাচনের দুদিনের মাথায় গত মঙ্গলবার রাতে হামলার শিকার হয়েছেন কাঞ্চনা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান রমজান আলী। পরে তিনি দেশ রূপান্তরকে জানান, মঙ্গলবার রাতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে কয়েকজন কর্মী-সমর্থকসহ বাড়ি ফিরছিলেন। পথে কাঞ্চনা মাদ্রাসার সামনে একদল অস্ত্রধারী তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তিনি রক্ষা পেলেও তিন সমর্থক গুলিবিদ্ধ হয়। এ ঘটনায় এক ইউপি মেম্বারসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাতকানিয়া থানার ওসি আবদুল জলিল।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনের দিন সংঘটিত বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনার জেরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

এদিকে আগে থেকে সতর্ক করার পরও নির্বাচনের দিন সহিংসতার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের গাফিলতিকে দায়ী করছেন অনেকে। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন।

গতকাল দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘সাতকানিয়ার ইউপি নির্বাচন আসলেই চ্যালেঞ্জিং ছিল। সংঘাত-সহিংসতা কাম্য নয়। তবে নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা দেখভাল করে পুলিশ প্রশাসন। আমরা নির্বাচনের আগেই সংঘাতের আশঙ্কা পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। সেই অনুযায়ী নির্বাচনে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছিল। ১৬ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও রাখা হয়েছিল।’

সংঘাতের বিষয়ে এ নির্বাচন বাতিলের কোনো সম্ভাবনা আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল রিটার্নিং কর্মকর্তারা এরই মধ্যে কমিশনে পাঠিয়েছেন। আমরা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে কাজ করি। এ বিষয়ে যা করার কমিশনই করবে। নির্বাচন বাতিলের কোনো এখতিয়ার আমাদের নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত