টেকসই খাদ্য নিরাপত্তায় করণীয়

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:৩৬ পিএম

কৃষি উৎপাদন, কৃষি গবেষণা, কৃষি উপকরণ বিতরণ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি বিস্তারে আমাদের দেশে যেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি বিস্তার ও ফলন বাড়ানোর জন্য দেশে ইউনিয়ন থেকে জাতীয় পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন। কিন্তু কৃষকের কষ্টার্জিত উৎপাদিত ফসল বিক্রি-সংক্রান্ত ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য দেশের তৃণমূল পর্যায়ে তেমন কর্মকাণ্ড আমাদের চোখে পড়ে না। আমাদের দেশে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার কর্মকাণ্ড জেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। কৃষক যদি তার পণ্য উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করে লোকসানের সম্মুখীন হন, ঋণে জর্জরিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন, তাহলে কৃষির আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে ফলন বৃদ্ধির উৎসাহ ও উদ্যম কোথা থেকে পাবেন কৃষক?

স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ। ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে আট গুণ। ডাল, তেলবীজ, মসলা ফসলসহ শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির এ সুফল ভোক্তা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা ভোগ করলেও হাড়ভাঙা পরিশ্রমী কৃষকের ঘরে তা এখনো পৌঁছায়নি। বরং ভোক্তামূল্যে কৃষকের অংশ ৬৫ থেকে বর্তমানে ৪১ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। আমাদের দেশে কৃষকের জমি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত কৃষিপণ্যের ৪ থেকে ৫ বার হাতবদল হয়। এ কারণে ভোক্তাকে কৃষকের বিক্রীত মূল্যের ৫ থেকে ৬ গুণ দামে কৃষিপণ্য কিনতে হয়। কৃষিপণ্যের এই ত্রুটিপূর্ণ বাজার ব্যবস্থার কারণে কৃষক যেমন পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, তেমনি ভোক্তাকেও বেশি দামে পণ্য কিনে আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হতে হয়।

বর্তমানে দিনাজপুর ও বগুড়ায় যে আলু প্রতি কেজি ৬ টাকা দরে বিক্রি করে কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না, সেই আলু রাজধানী ঢাকা ও ময়মনসিংহের হাটবাজারে চাষি, পাইকারি বিক্রেতা, আড়তদার ও খুচরা ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে ভোক্তার কাছে বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকায়।

মিলমালিকদের খেয়ালখুশির কাছে ধান উৎপাদনকারী কৃষক যে কত অসহায় তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৯ সালে প্রকাশিত খাদ্য নীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থার এক গবেষণা প্রতিবেদনে। ওই সময় বোরো ধানের বাম্পার ফলনের কারণে বাজারে ধানের মূল্যের পতন ঘটে। মিলমালিকরা ১৪ টাকা কেজি দরে বাজার থেকে হাইব্রিড ধান কেনে চাল তৈরি করে সরকারি গুদামে ৩৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে প্রচুর লাভবান হন। আর দুর্ভাগা কৃষক উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হন। এ কারণে কখনো কখনো কৃষক মনের দুঃখে রাস্তায় কৃষিপণ্য ফেলে প্রতিবাদ জানান। কখনো পাকা ফসলের ক্ষেতে আগুন দিয়ে মনের অশান্ত আগুন নেভান। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! মূল্য পতনের কারণে কখনো কৃষক আলু, মুলা, লালশাক, টমেটোর মতো সবজি চাষ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে জৈব সার তৈরি করেন ।

এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে নামসর্বস্ব কিছু কৃষক সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে পত্রপত্রিকায় বিবৃতি প্রদান করেন। এ দেশে তে-ভাগা আন্দোলন ও টংক বিদ্রোহের মতো সফল দৃষ্টান্ত থাকা সত্ত্বেও ভারতের মতো মোদি সরকার কাঁপানোর কৃষক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধান চাষকে লাভজনক করতে না পারলে কৃষক ধান উৎপাদনে, আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন। ফলন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না। খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। বিদেশ থেকে উচ্চদামে চাল আমদানি করতে হবে। এসব কারণে মিলমালিক, মজুদদারসহ মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের জন্য কৃষিমূল্য কমিশন গঠন করা এখন সময়ে দাবি।

সরকার নানাভাবে কৃষকদের সহায়তা করে। কৃষিতে সহায়তা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো ন্যূনতম সহায়ক (এমএসপি) মূল্য প্রদান। এর মাধ্যমে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান। ভোক্তারাও যৌক্তিক মূল্যে মানসম্মত কৃষিপণ্য কিনতে পারেন। ভারতে এই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের ঘোষণা দেওয়া হয় ফসল রোপণের আগে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষকের কষ্টের কথা জানতেন। তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীনতার পর ধান, গম, পাট, আখ ও তুলার সরকারি মূল্য ঘোষণা করেন। এখনো দেশের গরিব জনগোষ্ঠী তাদের উপার্জিত আয়ের প্রায় ৬০ ভাগ ব্যয় করেন খাদ্য কেনার কাজে। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবিকা নির্বাহের জন্য দেশের সিংহভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জিডিপির ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। রপ্তানি ও শিল্পের কাঁচামাল জোগাতে কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। তাই উৎপাদকারী কৃষক ও ভোক্তা উভয়ের জন্যই একটি ইতিবাচক ও গ্রহণযোগ্য মূল্যনীতি প্রয়োজন। এ নীতির মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য ওঠানামা সীমিত রাখা এবং পণ্যের উৎপাদন ও গুণগতমান বাড়িয়ে রপ্তানি বৃদ্ধি ও আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করার কোনো বিকল্প নেই। এ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও মূল্য নীতিমালার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ ও সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের জন্য রয়েছে ‘কৃষিমূল্য কমিশন’। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভারতে কৃষিমূল্য কমিশন কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থে ১৯৬৫ সাল থেকে সফলতার সঙ্গে কাজ করে আসছে। ১৯৮৫ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘কৃষি খরচ ও মূল্য কমিশন’ ।

ভারত প্রতি বছর ২৩টি কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করে। এগুলোর মধ্যে ৭টি দানাদার শস্য। যেমন : ধান, গম, ভুট্টা, জোয়ার, বাজরা, বার্লি ও রাগী। ৭টি তেলবীজ। যেমন : চীনাবাদাম, রাই সরিষা, সয়াবিন, তিল, সূর্যমুখী, কুসুম এবং নাইজার বীজ। ৫টি ডালবীজ, যেমন : ছোলা, মুগ, মসুর, অড়হর ও তুর। এ ছাড়া রয়েছে ৪টি অর্থকরী ফসল, যেমন : আখ, তুলা, কাঁচাপাট ও নারকেলের শুষ্ক শাঁস। আর বাংলাদেশে সরকার ধান, গম, আখ ও তুলার প্রতি বছর সরকারি মূল্য ঘোষণা করে। সরকার উৎপাদিত ধান-চালের চার ভাগ সরকারি দামে সংগ্রহ করে। সরকার কর্র্তৃক সংগৃহীত চালের শতকরা ৮২ ভাগ কেনে মিলমালিকদের কাছে থেকে এবং ১৯ ভাগ কেনে কৃষকদের কাছ থেকে, কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে যা মোটেও সহায়ক নয়।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশেও একটি জাতীয় কৃষিপণ্যের মূল্য কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছেন দেশের কৃষক সংগঠন ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা। আমাদের জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৯-এ জাতীয় মূল্য কমিশনের কথা বলা হলেও তার প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান নয়। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রদান, কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে এ ব্যাপারে সাহসী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

সরকারিভাবে প্রতি বছর কৃষকের কাছে থেকে যৎসামান্য ধান, গম কেনা হলেও, তার সুফল কৃষকের ঘর পর্যন্ত পৌঁছায় না। মধ্যস্বত্বভোগী ও ক্রয়কাজের নিয়োজিতরাই তাতে লাভবান হন। দেখা গেছে, দেশে উৎপাদন খরচের ওপর ৬ থেকে ১০ শতাংশ মুনাফা দেখিয়ে কৃষিপণ্যের সরকারি মূল্য নির্ধারিত হয়। আবার উৎপাদিত ধানের শতকরা ৯৬ ভাগ ক্রয় করেন মিলমালিক, ব্যবসায়ী ও মজুদদাররা তাদের মনগড়া দামে। সরকারিভাবে কেনা হয় মাত্র ৪ শতাংশ খাদ্যপণ্য, যার প্রভাব বাজারে নেই বললেই চলে।

ভারতে তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে প্রায় দেড় বছর ধরে আন্দোলনে উত্তাল ছিল রাজধানী নয়াদিল্লি। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থানে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে দিল্লির বাইরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করে আসছিলেন কৃষক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ১৯ নভেম্বর কৃষকের আন্দোলনের কাছে নতি-স্বীকার করে বিতর্কিত তিনটি

কৃষি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। ২৪ নভেম্বর, ২০২১ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কৃষি আইন প্রত্যাহারের বিল অনুমোদন করা হয়। আইন তিনটি হলো : ১. কৃষকের উৎপাদন ব্যবসা ও বাণিজ্য (প্রচার ও সুবিধাদি) বিল-২০২২। ২. কৃষকের (ক্ষমতায়ন এবং সুরক্ষা) মূল্য আশ্বাস এবং খামার পরিষেবার চুক্তির বিল-২০২২। ৩. অত্যাবশ্যক পণ্য (সংশোধনী বিল) ।

ভারতের কৃষক আন্দোলনের সফলতার কথা বিবেচনা করে আমাদের কৃষকদের ‘কৃষিমূল্য কমিশন’ ও ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দাবিতে কর্মসূচিভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন কৃষি সংগঠনের নেতারা, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষিবিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকেও এ ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত