মুসকানকে সমর্থন জানাচ্ছি, কিন্তু কেন?

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১০:৩১ এএম

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কর্নাটকের হিজাব বিতর্ক এখন আর দেশটির গণ্ডিতে নেই। বিশেষ করে কর্নাটকের মান্ডা জেলার একটি প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজের বি.কম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুসকান খানকে হিজাব পরায় গেরুয়া হিন্দুত্ববাদীদের ধাওয়ার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কল্যাণে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

নোবেল বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মীরা মুসকানের হিজাব পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি সমর্থন ও সংহতি জানাচ্ছেন।

মুসকানের হিজাব পরার এবং শিক্ষার অধিকারের আধুনিক গণতান্ত্রিক দাবির প্রতি সমর্থন ও সংহতি জানিয়েছেন বাংলাদেশের নারী নেত্রী ফরিদা আখতারও। তার ফেসবুকে আইডিতে দেওয়া বক্তব্যটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো-

“বাংলাদেশে আমরা নারী আন্দোলন থেকে মুসকানকে সমর্থন জানাচ্ছি, সংহতি প্রকাশ করছি। কিন্তু কেন?

মুসকানকে যখন প্রশ্ন করা হচ্ছে সে কি চায়, তার উত্তর হচ্ছে সে হিজাব পরার এবং শিক্ষার অধিকার পেতে চায়। দুটোই লিবারেল বা আধুনিক গণতান্ত্রিক দাবি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিশ্রুতি এবং নৈতিক বৈধতার শর্ত হচ্ছে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তির বিকাশ নিশ্চিত করা। মুসকান ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক হিশাবে তার নিজের উন্নতি বা বিকাশের জন্যই লড়ছে। গণতন্ত্র ও ব্যক্তির অধিকার বিরোধী রাষ্ট্র শুধু তার অধিকার হরণ করে ক্ষান্ত হয় নি, দল বেঁধে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে তাকে দমন করতে উদ্যত হয়েছে। এখানে ব্যক্তির বিরুদ্ধে উগ্র গুণ্ডাবৃত্তিও আমরা দেখছি। মুসকান খানের ‘আল্লাহু আকবর’ অতএব স্পষ্টতই ধর্ম বা বিশ্বাস নির্বিশেষে যারা গণতন্ত্র, ব্যক্তির অধিকার এবং ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরোধী তাদের বিপুল সমর্থন পেয়েছে। একে ধর্মীয় শ্লোগান হিশাবে বোঝা বা ধর্মীয় তর্কে পর্যবসিত করার অর্থ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক পরিস্থিতি, হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র এবং ব্যক্তির উপর নিত্যদিনের ফ্যাসিস্ট জুলুমকে অস্বীকার করা। যারা একে ধর্মীয় তর্কে পর্যবসিত করছেন তার অতএব ভেবে দেখবেন।

একা একজন নারী যখন ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি তুলে তার নাগরিক অধিকার এবং শিক্ষার অধিকারের জন্য লড়াই করছে তখন ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বিপুল জনগণ তাকে সমর্থন করছে। তাদেরও একই কথা। ধর্মীয় স্বাধীনতা চাই, ব্যক্তির অধিকার চাই – ভারতের শাসক শ্রেণির সেই অধিকার নিশ্চিত করবার কথা, কিন্তু গণতন্ত্র বিরোধী বিজেপি সেটা ধ্বংস করছে। হিজাব পরতে গিয়ে শিক্ষার অধিকার থেকে কেউই বঞ্চিত হতে চায় না।

অতএব যারা মুসকান খানের ‘আল্লাহু আকবর’-এর মধ্যে ধর্মের গন্ধ পাচ্ছেন তারা ভুল করছেন। তাকে সমর্থন করছে ধর্ম নির্বিশেষে ভারতের হিন্দু-মুসলিম সব নারী। জয় শ্রীরাম ধ্বনি যারা তুলেছে তারা বরং ধর্মীয় উগ্রতার পরিচয় দিয়ে ফেলেছে। তারা নগ্নভাবে ধরা পড়ে গেছে। তারা নারী শিক্ষার বিরোধী হিশেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে।

ভারতে মুসকান সংখ্যালঘু। কিন্তু বাংলাদেশে হাজার হাজার মুসকান আছে, যারা মুসলিম হয়েও সংখ্যালঘুর মতো থাকতে হয়। এখানে হিজাব পরার বিষয় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামুলকভাবে নতুন বিষয়। স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম সব ধর্মের জন্য এক। সেই ক্ষেত্রে ধর্মীয় অধিকার – যা গণতান্ত্রিক বা ব্যক্তির অধিকারের অন্তর্গত—তাকে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এই ক্ষেত্রে সংবেদনার চরম অভাবও দেখা যায়। কিন্তু এখন অনেক মেয়ে পড়াশোনায় এগিয়ে আসছে, তারা ইউনিফর্মের ওপর হিজাব পরছে, বা স্কার্ফ পরছে। অর্থাৎ মাথার চুল ঢাকছে। এভাবে অনেক মেয়ে গ্রাম থেকে শিক্ষার জন্যে ঢাকায় আসছে, হিজাব পরছে এবং লেখা পড়ায় এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও তাদের হয়তো 'জয় শ্রীরাম' শুনতে হয় না, বা তাদের দিকে ৪০-৫০ জন তেড়েও আসে না; কিন্তু তাদের দিকে একটু বাঁকা চোখ থাকে বৈ কি। হিজাব পরা মেয়েরা মিছিল-মিটিংয়েও অংশ নিচ্ছে, কিন্তু তবুও তাদের হিজাব নিয়ে অনেকের উৎকন্ঠিত হতে দেখা যায়। ছাত্রদের কাওয়ালী যেমন সহ্য করা হয় না, তেমনি মেয়েদের হিজাব নিয়েও অস্বস্তি দেখা যায়। কোন মেয়ে এভাবে 'আল্লাহু আকবর' বলে প্রতিবাদ করলে কয়জন তার সাথে সুর মেলাবে আমার সন্দেহ আছে ।

লিবারেলিজম, আধুনিকতা কিম্বা গণতন্ত্রের স্ববিরোধিতা উপলব্ধি করা এবং তার যথাযথ মীমাংসা জরুরি। গণতন্ত্রের অর্থ মানুষকে ধর্মহীন করা কিম্বা ব্যক্তি অধিকার হরণ করা হতে পারে না।

তাই 'আল্লাহু আকবর' বলেই আমি বাংলাদেশের হিজাব পরা মেয়েরা যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখা পড়া করতে আসছে তাদের লেখাপড়া করার পুর্ণ অধিকার এবং সে পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে আহবান জানাই। হিজাব পরে হোক বা না পরে, অন্য যে কোন ধর্মের মেয়েরা তাদের মতো করে যেন সর্বোচ্চ শিক্ষা নিতে পারে, সব ধরণের কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে, সমাজের সবখানে তা্রা যেন সুযোগ পায় - আমাদের এই চেষ্টাই করে যেতে হবে। মুসকান তার প্রতিবাদ দিয়ে হিজাব নিয়ে অস্বস্তি ভেঙ্গে দিয়েছে। সাহস যুগিয়েছে সবাইকে।

তাই মুসকানের সাহসিকতায় যারা মুগ্ধ তাদের বলি নিজের দেশের হিজাব পরা মেয়েদেরও বুঝতে শিখুন।”

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত