বিশ্বের উদ্বেগ ও পরিকল্পনায় জলবায়ু

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১১:৩৭ পিএম

জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের কাছেই একটা হুমকি। তেমনই রিপোর্ট প্রকাশ করল রাষ্ট্রসংঘ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ড যেভাবে দ্রুত বিশ্বের জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, লাখ লাখ বছর ধরে তেমনটা হয়নি। বিশ্বের তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াল বেড়েছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গবেষকরা। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, এখনই কিছু করুন না হলে সংকটের ঝুঁকিতে থাকুন!

গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের গ্রহটি ১২ বছরের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির চূড়ান্ত সীমা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। যেটা কি না প্রাক-শিল্পযুগের মাত্রার থেকেও বেশি। এতে করে আবহাওয়া পরিস্থিতি অস্বাভাবিক রূপ নেবে বিশেষ করে চরম দুর্ভিক্ষ, দাবানল, বন্যা সেই সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের খাদ্য সংকটের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। তাপমাত্রার এই সীমা অতিক্রম এড়াতে, বিশ্বের উচিত, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্রুত, সুদূরপ্রসারী ও নজিরবিহীন পরিবর্তন আনা। কথা হচ্ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে পর্যবেক্ষক হিসেবে আসা পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মী কেট রবিনসনের সঙ্গে। জলবায়ু আলোচনায় করপোরেট খাতের এই সরব গতিবিধিতে খুবই ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, জাতিসংঘের একটি আয়োজন করপোরেট খাত দখল করে নিয়েছে। এটা সত্যিই বিস্ময়কর। এ ছাড়া আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো দাবি তুলেছে যে, ২০৩০ সাল নাগাদ জলবায়ু সংকট নিরসনে বছরে তাদের জন্য ১,৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল করতে হবে। বছরে ১৩০০ না হয়ে ৩০০ বিলিয়ন হলেও তাতে ব্যবসার বড় সুযোগ দেখছে পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। পশ্চিমা সরকারগুলোও যে সেটাই চাইছে তা বুঝতে জ্যোতিষী হতে হয় না। এ নিয়ে অবশ্য তেমন একটা রাখঢাকও করা হচ্ছে না। জলবায়ু তহবিল সম্পর্কিত মীমাংসা আলোচনাগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারি প্রতিনিধিরা বেসরকারি খাতকে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করার কথা বলছেন। কেন গরিব দেশগুলো ভয় পাচ্ছে, সংকট কোথায়? ব্রিটেনের গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল স্টিল বলেন, মিটিগেশন অর্থাৎ কার্বন নিঃসরণ কমানোর পেছনে পয়সা দেওয়ার ব্যাপারেই পশ্চিমা দেশের আগ্রহ বেশি। তাহলেই পশ্চিমা দেশের বেসরকারি খাত ব্যবসা পাবে। জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে বছরে ১৩০ ট্রিলিয়ন ডলার তহবিলের কথা উঠছে। এর সিংহভাগই আসলে খরচ হবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কাজে। কারণ এটি ভবিষ্যতে একটি বড় ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে।

আমরা আশা করেছিলাম, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোর কপ-২৬ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় এমন কিছু সিদ্ধান্ত আসবে, যা প্যারিসের কপ-২১-এর মতোই স্মরণীয় করে রাখবে গ্লাসগোর কপ-২৬ সম্মেলনকে। এটা ঠিক, যত বড় আশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। তবে যতটা হয়েছে, তা কিন্তু মোটেই কম নয়। কপ-২৬ সম্মেলনের ওয়ার্ল্ড লিডারস সামিটে ১২০টিরও বেশি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশগ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন আলোচনায় অত্যন্ত জোরালো ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। লিডারস সামিটে প্রদত্ত ভাষণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধনী দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু লক্ষ্য উত্থাপন করেছেন। ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত কপ-২১ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত হয়েছিল প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট। তারপর থেকে প্রায় প্রতিটি সম্মেলনেরই মূল লক্ষ্য ছিল প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট ও প্যারিস রুল বুক পুরোপুরি বাস্তবায়নের সমন্বিত সিদ্ধান্তে পৌঁছা। যুক্তরাজ্যের গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত কপ-২৬ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল তা-ই। অর্থাৎ প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট বাস্তবায়নের অপূরণীয় অংশটুকু পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা। একটু পেছন ফিরে দেখলে দেখা যায়, কার্বন নির্গমনে বিশ্বব্যাপী প্রচেষ্টার সার্বিক অগ্রগতি কতটুকু। পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর কাতোভিচে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২৪। ১৯৬টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন ওই সম্মেলনে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত কপ-২১-এর প্রতিশ্রুতি কতটা পূরণ করা যায়, সেটাই ছিল কপ-২৪-এর টান টান উত্তেজনা আর দুশ্চিন্তার বিষয়। কিন্তু সফলতা তেমন পাওয়া যায়নি। ২০১৯ সালে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত কপ-২৫ সম্মেলন থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অর্জন আসেনি। সে হিসেবে কপ-২৬-এর অর্জন অনেক বেশি। বৈশ্বিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এবারের জলবায়ু সম্মেলনের মূল আলোচনার বিষয় ছিল অভিযোজন কার্যক্রম প্রশমনের তুলনায় আনুপাতিক হারে বাড়ানো, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২১০০ সাল নাগাদ শিল্পবিপ্লব সময়ের তুলনায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখা, লস অ্যান্ড ড্যামেজের বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্যারিস রুল বুক চূড়ান্তকরণ এবং জলবায়ু অর্থায়ন।

কপ-২৬-এ আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী যথাযথ প্রাপ্তি না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। বনভূমি উজাড় হয়ে যাওয়া রোধ এবং বনভূমি সংরক্ষণের বিষয়ে এবারের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। কপ-২৬ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ১৪১টি দেশ গ্লাসগো লিডারস ডিক্লারেশন অন ফরেস্ট অ্যান্ড ল্যান্ড ইউজ অনুমোদন করেছে। বিশ্বব্যাপী বনভূমি ধ্বংস রোধ এবং বনভূমি সংরক্ষণে এই সিদ্ধান্তটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কপ-২৬-এর সিদ্ধান্তে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার লক্ষ্যে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসে সদস্য দেশগুলোকে উচ্চাভিলাষী ও শক্তিশালী পরিকল্পনা প্রকাশ করতে বলা হয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলো কর্র্তৃক অভিযোজন অর্থায়ন দ্বিগুণ করার পাশাপাশি কপ-২৬-এর বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অভিযোজন ও প্রশমন অর্থায়নের মধ্যে পঞ্চাশ বাই পঞ্চাশ অনুপাত নির্ধারণ করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া উন্নত দেশগুলো কর্র্তৃক জলবায়ু অর্থায়নে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নিমিত্তে ২০২২-২৪ সময়ের জন্য একটি অ্যাডহক ওয়ার্ক প্রোগ্রাম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে জলবায়ু তহবিলে অর্থ বরাদ্দের পরিমাণ অন্তত দ্বিগুণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে ধনী দেশগুলোকে। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে বিশ্বের উষ্ণতা বাড়ছে। মূলত কল-কারখানা, যানবাহনে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বাতাসে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত ১০০ বছরে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন সারা বিশ্বের চিন্তা, উদ্বেগ ও পরিকল্পনা এ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারাকে দেড় ডিগ্রি থেকে দুই ডিগ্রির মধ্যে আটকে রাখা। এই সংকল্প পূরণে অনেকটা পথ অগ্রসর হয়েছে কপ-২৬ এবং আগামী বছরে কপ-২৭-এ আমাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।  ক্রমবর্ধমান সংকট সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে তরুণ জনগোষ্ঠী তাদের আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় অধিকমাত্রায় বিশ্বাস করে যে, বিশ্ব আরও ভালো একটি স্থান হয়ে উঠছে। এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ধীরে ধীরে উষ্ণতা বাড়ছে। বিশ্বের উষ্ণতা যদি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যায় তাহলে আরও বড় ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। আর্কটিক সাগরে হিমবাহের ক্ষতি হবে। তবে বিশ্বের তাপমাত্রাকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব বলেও দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী নিঃসরণ কমিয়ে শূন্যে নিয়ে এলেই বিপদ কাটতে পারে বলেও দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি অক্সিজেনের বৃদ্ধি জরুরি। তাই প্রকৃতিরক্ষা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ এ দুই বিষয়েই সবুজায়নের বিকল্প নেই।

লেখক : গবেষক ও কলামনিস্ট

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত