ফেইসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ১৫টি মন্দির ও শতাধিক বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় হরিপুর ইউনিয়নের জেলে রসরাজ ও শংকরাদহ গ্রামের বাসিন্দা যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
পরিবারের দাবি, রসরাজ দাসের ফেইসবুক, মোবাইল ফোন কিংবা মেমোরি কার্ডে ধর্ম অবমাননাকর কোনো ছবি পায়নি পুলিশ। তবে পুলিশ বলছে, মোবাইল ফোন ও মেমোরি কার্ডে ছবি পাওয়া না গেলেও রসরাজ তার আইডি থেকে দেওয়া একটি পোস্টে ক্ষমা চেয়ে আবার সেটা ডিলিট করে দিয়েছিল। এমন পোস্টের অস্তিত্ব পেয়েছে ফরেনসিক বিভাগ।
আইনজীবী মো. নাসির মিয়া জানান, ওই মামলায় গত বছর ২৯ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন। পরদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলাটি বিচারের জন্য চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে বদলি করেন। এ বছর ১২ জানুয়ারি অভিযোগপত্রসহ মামলার নথি ডাকযোগে চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। গত ৩০ জানুয়ারি এ ট্রাইব্যুনালে রসরাজের মামলার শুনানির তারিখ ছিল। গতকাল শুক্রবার বিষয়টি জানাজানি হয়।
রসরাজের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রসরাজ দাসের ফেইসবুক, মোবাইল ফোন কিংবা মেমোরি কার্ডে ধর্ম অবমাননাকর কোনো ছবি পায়নি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগ। তবু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রধান আসামি করে রসরাজ বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন গতকাল বলেন, ‘মোবাইল ফোন ও মেমোরি কার্ডে ছবি পাওয়া না গেলেও রসরাজ তার আইডি থেকে দেওয়া একটি পোস্টে ক্ষমা চেয়ে আবার সেটা ডিলিট করে দিয়েছিল। এমন পোস্টের অস্তিত্ব পেয়েছে ফরেনসিক বিভাগ। ফরেনসিকের সব প্রতিবেদন পর্যালোচনা, সব ডিভাইস পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিশেষজ্ঞদের মতামত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক সবকিছুর ভিত্তিতে দুজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।’
রসরাজের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন (সংশোধনী-২০১৩) এর ৫৭(২) ধারায় মামলা হয়। পরবর্তীকালে আইনটি বাতিল হওয়ায় মামলাটি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় আনা হয়।
জানা যায়, ২০১৭ সালে পিবিআইয়ের জমা দেওয়া দুটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রসরাজ দাসের মোবাইল ফোন ও মেমোরি কার্ডে ধর্মীয় অবমাননাকর নমুনা ছবির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং গ্রেপ্তার হওয়া জাহাঙ্গীর আলমের মালিকানাধীন আল-আমিন সাইবার পয়েন্ট ও স্টুডিওতে ব্যবহৃত কম্পিউটারে ধর্মীয় অবমাননাকর সেই ছবিটি সংরক্ষণের পর এডিট এবং ছবিটি সেখানে কিছু সময় সংরক্ষণের পর মুছে ফেলা হয়। তবে ধর্মীয় অবমাননাকর ছবিটি জাহাঙ্গীরের কম্পিউটার ব্যবহার করে ফেইসবুকে পোস্ট করা হয়েছে কি নাÑ সে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাম্প্রদায়িক হামলার প্রায় এক মাস পর ২৮ নভেম্বর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কালাই শ্রীপাড়া থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ১০ দিনের রিমান্ডে জাহাঙ্গীর পুলিশকে জানান, নাসিরনগরে হামলার পেছনে ফেইসবুকের যে ছবিটি, সেটি ছাপিয়ে লিফলেট আকারে বিলি করেছিলেন তিনি।
মামলাটির তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইশতিয়াক আহমেদ জানান, ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম সুলতান সোহাগ উদ্দিনের আদালতে জাহাঙ্গীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পরে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এসআই ইশতিয়াক বলেন, ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর সকালে হরিপুর ইউনিয়নের হরিণবেড় বাজারে শংকরাদহ গ্রামের জুয়েল মিয়া নামে এক যুবকের কাছ থেকে ধর্মীয় অবমাননাকর ছবিটি ‘শেয়ারইট’ অ্যাপের মাধ্যমে নিজের মোবাইল ফোনে নেন বলে জাহাঙ্গীর তার জবানবন্দিতে জানিয়েছেন। এরপর ছবিটি প্রিন্ট করে ওইদিন সন্ধ্যায় লিফলেট আকারে বিলি করা হয়। রসরাজকে ধরে আনার জন্য হরিপুরের ফারুক মিয়া, হাজি বিল্লাল ও কাপ্তান মিয়া তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। রসরাজকে জাহাঙ্গীরই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
নাসিরনগরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আটটি মামলা হয়। এছাড়া পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থতার দায়ে প্রথমে নাসিরনগর থানার তৎকালীন ওসি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) প্রত্যাহার করা হয়।
