‘জেল-করোনায় খালেদা জিয়ার সম্মাননায় দেরি’

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০১:৩৫ এএম

সম্প্রতি কানাডিয়ান হিউমান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দিয়েছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

কেন বিএনপি সাড়ে তিন বছর পর তাদের দলের চেয়ারপারসনকে দেওয়া এই সম্মাননার কথা জানাল। সিএইচআরআইও কেনইবা খালেদা জিয়াকে এই পুরস্কার দিয়েছে। এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।

এসব বিষয়ে কানাডা থেকে প্রকাশিত নতুন দেশ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক প্রবাসী শওগত আলী সাগর সিএইচআরআইও’র এশিয়া মিশনের প্রধান মমিনুল হকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। মমিনুল হকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইউটিউবে রয়েছে।

ওই সাক্ষাৎকারে মমিনুল হক দাবি করেছেন, খালেদা জিয়া জেলে যাওয়া এবং তারপর করোনা মহামারীর কারণে তাদের এই পুরস্কার দেওয়া পিছিয়ে যায়। এ ছাড়া সরকার পর্যায়ে প্রতিবন্ধকতা ও অসহযোগিতাও একটা বড় কারণ ছিল।

সিএইচআরআইও নামের ওই মানবাধিকার সংগঠনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে মমিনুল হক শওগত আলী সাগরকে বলেন, তাদের এই সংগঠনটি কানাডার টরন্টোভিত্তিক। কানাডার হলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তালিকাভুক্ত সংস্থা হিসেবে বিশ^ব্যাপী মানবাধিকার, গণতন্ত্র নিয়ে কাজ করে সংগঠনটি।

মমিনুল হক নিজের সম্পর্কে বলেছেন তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক। কানাডায় খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। তবে বিএনপির কোনো পদে নেই তিনি। তার অধীনে সিএইচআরআইওর এশিয়া মিশনে ২০-৩০ জন কাজ করলেও তাদের নিজস্ব বিষয়ে যা জানা গেলকোনো কার্যালয় নেই। কানাডায় প্রধান কার্যালয় যেটি সেটি একটি চার্চের পেছনে অবস্থিত পোর্টেবল কার্যালয়।

খালেদা জিয়াকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ পুরস্কার দেওয়ার কারণ সম্পর্কে মমিনুল সাক্ষাৎকারে জানান গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নারী অধিকার, রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের জন্য খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন। গণতন্ত্র ফিরে পেতে রাজপথে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ৯ বছর আন্দোলন করে আপসহীন নেতৃত্বে পরিণত হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির গণতন্ত্রে ফেরান বাংলাদেশকে। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কারাবরণ করেছিলেন খালেদা জিয়া। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে সরকারের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে নেওয়া হয়। ১৯৯২ সালে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ও নাগরিক অধিকার দেওয়ার বিষয়ে খালেদা জিয়া মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেন। এসব বিষয় পর্যালোচনা করে খালেদা জিয়াকে তারা এ সম্মাননা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

সম্মাননা দেরিতে দেওয়ার কারণ সম্পর্কে মমিনুল হক বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে খালেদা জিয়াকে সম্মাননা জানাতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন কানাডায় বাংলাদেশ হাইকমিশনার মিজানুর রহমান তাদেরকে জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়া এখন দুর্নীতির মামলায় জেলে আছেন। এখন এই পুরস্কার দেওয়া ঠিক হবে না। পরবর্তীতে খালেদা জিয়াকে পুরস্কার পৌঁছে দেওয়ার জন্য ঢাকায় কানাডিয়ান হাইকমিশনকে অনুরোধ করা হলে তারা জানায়, করোনার কারণে সব কিছু বন্ধ থাকায় এখন কিছুই করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া ঢাকায় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বৈঠক করে জানান, চেয়ারপারসন এখন জেলে। তার পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় নেই। তারা এটি গ্রহণ করতে পারবেন না। এসব কারণে পুরস্কার দিতে বিলম্ব হয়।

আগেও কাউকে ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ সম্মাননা দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে মমিনুল সাগরকে বলেন, ‘পুরস্কারটি প্রথম প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রথমেই খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয়েছে। আগামীতেও এই পুরস্কার দেওয়া হবে।’

কানাডার সংস্থা কর্তৃক খালেদা জিয়াকে সম্মাননা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে কানাডা বিএনপির সভাপতি মো. ফয়সাল  মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। মমিনুল হক বিএনপির কেউ নন।’

গত ৮ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় গিয়ে এই সম্মাননা তুলে দেন। এর আগে গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সিএইচআরআইওর দেওয়া সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন বিএনপি মহাসচিব। সে সময় তিনি বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাতে চাই, বেগম খালেদা জিয়ার গণতন্ত্রের প্রতি অসামান্য অবদান এবং তিনি যে এখনো গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য কারাবরণ করছেন, অসুস্থ হয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় আছেন, এসব কারণে কানাডিয়ান হিউম্যান রাইটস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (সিএইচআরআইও) খালেদা জিয়াকে ‘মাদার অব  ডেমোক্রেসি’ পুরস্কার দিয়েছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডিয়ান হাইকমিশনও সম্মাননা প্রদানকারী সিএইচআরআইওকে গ্রহণযোগ্য সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।’

কীভাবে এ সম্মাননা দেশে এলো সে সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক দায়িত্বশীল নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে ঢাকাস্থ কানাডিয়ান হাইকমিশন খালেদা জিয়ার এই সম্মাননা পৌঁছাতে পারেনি। তবে ব্যক্তিগত বাহকের মাধ্যমে এ সম্মাননা বিএনপির কাছে পাঠানো হয়েছে।’

গত শুক্রবার তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে যে প্রতিষ্ঠান সম্মাননা দিয়েছে সে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এ পুরস্কারের বিষয়টি নেই।’ এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে সম্মাননা দেওয়ার বিষয়টি সিএইচআরআইওর ওয়েবসাইটে নেই। তবে কানাডার অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে তিনি সম্মাননার বিষয়টি পেয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি এ সংক্রান্ত একটি লিঙ্ক দিয়েছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত