মালয়েশিয়ায় অভিবাসনসংক্রান্ত একটি আইনে দেশটির ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে গত বুধবার বাংলাদেশের সাবেক সেনা কর্মকর্তা, হাইকমিশনার এবং পলাতক মো. খায়রুজ্জামান গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি এখন অভিবাসন সেলে রয়েছেন। খায়রুজ্জামানের গ্রেপ্তারের পর সামনে এসেছে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বরের জেলহত্যা মামলার বিষয়টি। এর আগে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খায়রুজ্জামান জেলহত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এরপর বিএনপি জামায়াত-জোট সরকারের সময় তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে চাকরিতে যুক্ত হন। সর্বশেষ ২০০৭ সালের আগস্টে তিনি মালয়েশিয়ায় প্রথম শ্রেণির হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে মালয়েশিয়া থেকে ফেরার নির্দেশ দিলেও তিনি ফিরে আসেননি।
খায়রুজ্জামানকে মালয়েশিয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের তরফ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকায় কীভাবে তাকে ফিরিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে কূটনৈতিক ও আইনি বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সরকারপক্ষ থেকে চলতি সপ্তাহেই খায়রুজ্জামানকে দেশে ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। তারা বলছেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি না থাকায় কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তাই সরকার দ্রুত মালয়েশিয়ার সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি ও দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির কথা ভাবছে। পাশাপাশি চেষ্টা চলছে খায়রুজ্জামান যেহেতু মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করেছেন, ফলে সেই দেশের অভিবাসন আইন অনুসারে কোনো প্রবাসী অপরাধ করলে কীভাবে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো যায় সেই পদ্ধতিতে তাকে ফেরত আনার।
এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খায়রুজ্জামানকে কী প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে সেটি নিয়ে কাজ চলছে।’ আইন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, কাল (আজ রবিবার) আইনমন্ত্রী এ বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, খায়রুজ্জামানকে আটকের বিষয়টি মালয়েশিয়ার অভিবাসন দপ্তর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। মালয়েশিয়ার অভিবাসন দপ্তর ওই চিঠিতে বলেছে, দেশটির অভিবাসন আইন লঙ্ঘন করায় বাংলাদেশের সাবেক এ কূটনীতিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। খায়রুজ্জামানকে মালয়েশিয়ার অভিবাসন সেলে রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আশা করছি মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে আইনি প্রক্রিয়া শেষে খায়রুজ্জামানকে দ্রুত ফিরিয়ে আনা হবে। দুই পক্ষ এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে।’ এর আগে গত বৃহস্পতিবার প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বাংলাদেশের অনুরোধেই খায়রুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এক সপ্তাহের মধ্যেই খায়রুজ্জামানকে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা হচ্ছে। তবে শনিবার ও রবিবার দেশটিতে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় বাংলাদেশের হিসাবে দুদিন সময় বেশি লাগবে। কাল সোমবার বিষয়টি নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের বক্তব্য পাওয়া যাবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করছে। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ওয়ালি উর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু মালয়েশিয়ার সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই, ফলে দেশটির সঙ্গে পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাধ্যমে খায়রুজ্জামানকে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুনেছি এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার এনসিবি উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার পুলিশের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।’
গত বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি হামজাহ জায়নুদিন দেশটির গণমাধ্যমকর্মীদের বলেন, আইন মেনেই বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে তার দেশেরও (বাংলাদেশ) অনুরোধ ছিল।
জানা গেছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর এবং জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। এরপর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জেলহত্যা মামলা পুনরুজ্জীবিত করে। আদালতের রায়ে ২০০৪ সালে পলাতক তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বাকি দুজনকে খালাস দেয়। এরপর আওয়ামী লীগ আবারও ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিলে ২০১৩ সালে আপিল বিভাগের রায়ে তিনজনকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে পলাতক থাকায় তাদের একজনেরও সাজা কার্যকর করা যায়নি।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেনা কর্মকর্তা মো. খায়রুজ্জামানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকার তাকে কূটনৈতিক দায়িত্ব দিয়ে বিদেশে একাধিক মিশনে পাঠায়। ২০০৫ সালে খায়রুজ্জামান বাংলাদেশের পক্ষে মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালে তাকে মালয়েশিয়ায় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সময়ও তিনি মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার ছিলেন। তখন দেশে ফিরে আসার আদেশ দিলেও তিনি আসেননি। তখন থেকে বাংলাদেশ সরকারের নথিতে খায়রুজ্জামান পলাতক ছিলেন।
খায়রুজ্জামানের স্ত্রী রিটা রহমান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। রিটা রহমান এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে এখন তৎপরতা চালানো হচ্ছে যেন কোনোভাবেই তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো না হয়। রিটা গত শুক্রবার মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার স্বামী বাংলাদেশে নিরাপদ নয়। তিনি মালয়েশিয়ার সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। রিটা রহমান টেলিফোনে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, এই কারণেই খায়রুজ্জামান মালয়েশিয়াতে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। তিনি (খায়রুজ্জামান) নিজের সুরক্ষা হিসেবে শরাণার্থী মর্যাদা নিয়েছিলেন। প্রতি দুই বছর পরপর তিনি মালয়েশিয়ার ভিসা নবায়ন করে আসছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্র্তৃপক্ষ খায়রুজ্জামানের আবেদন না-মঞ্জুর করে।
রিটা রহমানের বাবা মশিউর রহমান যাদু মিয়া ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী। রিটা বিএনপির জোটসঙ্গী ন্যাশনাল পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশের প্রধান ছিলেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি নিজের দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন। তিনি ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন।
