বাংলাদেশিদের ইউক্রেন ছাড়ার পরামর্শ

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:০৬ এএম

ইউক্রেন সীমান্তে রুশ সেনাদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনায় বাংলাদেশ কারও পক্ষেই প্রকাশ্য অবস্থান নেবে না। তবে বাংলাদেশ চায় আলোচনার মাধ্যমে সুষ্ঠু সমাধান। ইউক্রেন সংকট আরও ঘনীভূত হলে এবং এই ইস্যুতে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকলে শুধু ইউরোপ নয়, বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ উত্তেজনা আরও বাড়লে রাশিয়ার ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করতে পারে পশ্চিমা দেশগুলো। এতে দেশটির সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য নিয়ে দেখা দেবে জটিলতা;বিশেষ করে এই উত্তজনার মধ্যে রাশিয়া জ্বালানি তেল সরবরাহের পাইপলাইন বন্ধ করে দিতে পারে বলে যে আলোচনা জোরালো হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেন ইস্যুতে প্রকাশ্যে কোনো কথা না বললেও বাংলাদেশ এই সংকটের সুষ্ঠু সমাধান চায়।

এদিকে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইউক্রেনের পাশর্^বর্তী দেশ পোল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাস এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ পরামর্শ দিয়েছে। ইউক্রেনে অবস্থানরত কোনো বাংলাদেশি দেশে ফিরতে চাইলে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাশিয়া ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন বন্ধ করে দিলে বিশ^জুড়ে তেলের দাম অনেক বাড়বে। আর তখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে চড়া দামে তেল কিনতে হবে বাংলাদেশকে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ইউক্রেন পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ। কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে এ সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় ঢাকা। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে ওই অঞ্চলের সংকট একটি শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান হতে পারে। তাই সংলাপ ও সহযোগিতার চেতনাকে সমুন্নত রেখে এই সংকট নিরসনে সব পক্ষকে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পক্ষেই বাংলাদেশের অবস্থান।

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় না ইউক্রেন ইস্যু পূর্ণ যুদ্ধে রূপ নেবে। হুমকি-ধমকি ও নিজস্ব নিরাপত্তা শঙ্কায় যে যার প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এটি যে কেউ তার নিজের জন্য করতে পারে। সমস্যা হলো আতঙ্ক যখন ছাপিয়ে যায়, তখন দুর্ঘটনা ঘটে যায়। যদি এমন কিছু ঘটে তার প্রভাব তো বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাশিয়া জ¦ালানির পাইপলাইন বন্ধ করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বিকল্প জ্বালানির উৎস বের করতে হবে। ইউরোপ যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সংগ্রহ করে তাহলে জ¦ালানি সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ¦ালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে।’

ইউক্রেন ইস্যু বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউক্রেন ইস্যুটি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো ধরনের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও সংঘাতের সৃষ্টি হয় এমন কিছুকে সমর্থন করবে না বাংলাদেশ। ইউক্রেন ইস্যুতে আমরা কারও পক্ষে-বিপক্ষে যেতে পারি না। কারণ সব দেশই আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। নীতিগতভাবেই এটি আমাদের অবস্থান। আমরা আশা করছি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দুই পক্ষ আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ একটি সমাধানে পৌঁছাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই সংঘাত আঞ্চলিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য হুমকি হলে এর প্রভাব বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও ইউক্রেনে কোনো সংঘাত দেখা দিলে দেশের বাণিজ্যে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বর্তমানে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে রাশিয়ায় ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। একই সময়ে দেশটি থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে ৪৬ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের পণ্য।

এ প্রসঙ্গে টিপু মুনশি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন সমস্যা ও শুল্ক জটিলতা না থাকলে উভয় দেশের বাণিজ্য আরও বাড়ত। দেশটিতে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে। কিছু জটিলতার কারণে অন্য দেশের মাধ্যমে রাশিয়ায় তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে হচ্ছে। এগুলো সমাধানেরও চেষ্টা চলছে।’

২০১৫ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর থেকে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি ব্যাংকিং সুবিধা বন্ধ আছে। বর্তমানে রাশিয়ায় ব্যবসা করা গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলো হংকং ও সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশের আমদানি মূল্য পরিশোধ করছে। বাংলাদেশের জন্য রাশিয়ার বাজারকে বেশ সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে টিপু মুনশি বলেন, ‘রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে মাছ, সবজি, আলু ও ফলমূল নেওয়ার বিষয়ে অলোচনা হয়। এ ছাড়া তৈরি পোশাক, ওষুধ ও চিংড়িরও ভালো চাহিদা রয়েছে।’

বাংলাদেশিদের ইউক্রেন ছাড়ার পরামর্শ : ইউক্রেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অবিলম্বে দেশটি ত্যাগের পরামর্শ দিয়ে পোল্যান্ডের ওয়ারশতে বাংলাদেশ দূতাবাস অন্য কোনো দেশে যেতে না পারলে প্রবাসীদের দেশে ফিরতে বলেছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরে দূতাবাসের পক্ষ থেকে পরামর্শ হালনাগাদ করা হবে। একই সঙ্গে সব বাংলাদেশিকে অত্যাবশ্যকীয় না হলে ইউক্রেনে সব ধরনের ভ্রমণ বাতিলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে দূতাবাস যাতে ইউক্রেনে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে, সে জন্য সবার অবস্থানের তথ্য দূতাবাসকে জানিয়ে রাখার অনুরোধ করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।

এ প্রসঙ্গে গতকাল নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপাকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো দেশ বা অঞ্চলে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হলে আমরা আমাদের নাগরিকদের সাবধান করে থাকি। ইউক্রেনে চলমান উত্তেজনার কারণে একই ধরনের সাবধান করা হয়েছে। তবে আমরা কাউকে বাধ্য করতে পারি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দেশের নাগরিক ইউক্রেন ছেড়ে চলে গেছেন, এখনো যাচ্ছেন। আমাদের কেউ ফেরত আসতে চাইলে পোল্যান্ড বা অন্য কোনো দূতাবাস থেকে সহায়তা করা হবে।’

ইয়েমেন ও লিবিয়ার প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে ইয়েমেনে সংকট দেখা দিলে আমরা বলার পর বেশিরভাগ নাগরিক চলে আসতে সম্মত হন। যেটি লিবিয়ার ক্ষেত্রে নোটিস করার পরও অনেকে আসেননি। এসব ক্ষেত্রে জোর করা যায় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত